যেই জয় শুধুই মানজারুল ইসলাম রানার

২০০৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচের আগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন মানজারুল ইসলাম রানা; শোককে শক্তিতে পরিণত করে মাশরাফীরা সেদিন প্রথমবার বিশ্বকাপে ভারতকে হারায়। তামিম-সাকিব-মুশফিকের ব্যাটে আসা সেই ঐতিহাসিক জয় উৎসর্গ করা হয় রানাকেই।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মানজারুল ইসলাম রানা
মানজারুল ইসলাম রানা |সংগৃহীত

দিনটা ২০০৭ সালের ১৬ মার্চ। ওয়েস্ট ইন্ডিজে চলছে বিশ্বকাপ। পরেরদিন ১৭ মার্চ কুইন্স পার্কে নিজেদের প্রথম ম্যাচ, মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ, স্বপ্ন বুনছে ভারত বধের। এমন সময় একটা ফোন কল এলো, আর তাতেই যেন পুরো পৃথিবী এলোমেলো হয়ে গেল মাশরাফী-হাবিবুল বাশারদের।

রাসেল, রাজ্জাক চিৎকার করে উঠলেন। সিনিয়ররা সবাই হাউমাউ করে কাঁদছেন। মাশরাফী এক দৌড়ে বিছানায়। বাশার শুধু স্ফুটস্বরে বলে উঠলেন, ‘একি করলি রানা?’

মানজারুল ইসলাম রানা, জাতীয় দলের স্পিন অলরাউন্ডার। ২০০৪ সালে সম্ভাবনাময় এ ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার শুরু হয়। মাত্র তিন বছরেই নিজেকে ভালোভাবে চিনিয়েছিলেন খুলনার মুজগুন্নি পাড়ার ছেলেটি।

সম্ভাবনাময় রানা। জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ৬টি টেস্ট ও ২৫টি ওয়ানডে ম্যাচ। ছিলেন মাশরাফী-রাজ্জাক, রফিকদের খুব কাছের বন্ধু।

তবে জায়গা হয়নি ২০০৭ বিশ্বকাপের দলে, যা কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জীবনে। সতীর্থরা ক্যারিবীয় দ্বীপে ভারত বধের পরিকল্পনায় ব্যস্ত, তখন রানা সময় কাটাচ্ছিলেন বন্ধুদের সাথে, মোটরসাইকেল নিয়ে।

যে মোটরসাইকেল কেড়ে নেয় তার প্রাণ। যেদিন বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ, তার আগের দিনই পৃথিবীকে বিদায় জানান তিনি। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় শেষ হয় তার অধ্যায়।

দেশকে আরো অনেক কিছু দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথা রাখতে পারেননি রানা। মাত্র ২২ বছর ৩১৬ দিন সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট ক্রিকেটার হয়ে পাড়ি জমান পরপারে।

রানা আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পুরো দলে তখন শোকের ছায়া। বিষয়টা যেন মানতেই পারছিলেন না রফিক-রাজ্জাকরা। তরুণ সাকিব-তামিমরাও তখন মর্মাহত, কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

ভাইসম বন্ধুকে হারিয়ে তখন শোকবিহ্বল মাশরাফী, গায়ে তখন তার প্রচণ্ড জ্বর। এদিকে ঠিক পরদিন বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ, মাশরাফিকে অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের প্রশ্ন, ‘খেলতি পারবি?’ মাশরাফীর উত্তর ‘রানার জন্যি খেলতি হবি।’

যা নিয়ে পরবর্তীতে এক আলাপকালে মাশরাফি বলেছিলেন, ‘ম্যাচের আগের দিন রানা মারা গেল। আমরা তো দূরে, ওর জানাজাও পড়তে পারছিলাম না। ওর জন্য কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম।’

‘তখন আমরা সবাই আলোচনা করছিলাম ও এক হয়ে বলেছিলাম আমাদের ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটা জিততে হবে।’ অর্থাৎ সবাই চেয়েছিল সেদিন শোককে শক্তিতে পরিণত করতে, ম্যাচটি জয় করে রানাকে উৎসর্গ করতে।

পরদিন ১৭ মার্চ ভারতের বিপক্ষে মাঠেও দেখা মেলে সেই প্রতিচ্ছবি। ভারতের বিরুদ্ধে টসে হেরে ফিল্ডিং করতে নামা বাংলাদেশ হঠাৎ হয়ে উঠে আগ্রাসী। মাশরাফীর নেতৃত্বে বোলিং ইউনিট যেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের বেশ শক্তভাবেই চেপে ধরে।

ম্যাচের তৃতীয় ওভারেই বীরেন্দর শেবাগের স্ট্যাম্প ভেঙে দেন মাশরাফী। আর দলীয় ২১ রানে সাজঘরে ফেরেন রবিন উথাপ্পা। রবিন উথাপ্পা বিদায়ের পর ৪ রান যোগ হতেই শচীন টেন্ডুলকারকে ফেরান আব্দুর রাজ্জাক।

সেখান থেকে ভারত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, তবে তবে দলীয় ৭২ রানে ‘দ্যা ওয়াল’ খ্যাত দ্রাবিডের প্রাচীর ভেঙে দেন মোহাম্মদ রফিক। যুবরাজ সিং ও সৌরভ গাংগুলী দলকে সসম্মানজনক স্কোর এনে দেয়ার চেষ্টা করেন, তবে সফল হতে পারেননি।

নিজের ৬৬ রানে সৌরভ আউট হলে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ৩ বল বাকি থাকতেই অলআউট হয় ভারত। মাত্র ১৯১ রানেই ঘুটিয়ে যায় তারা। মাশরাফী একাই ৪টি, রফিক ও রাজ্জাক শিকার করেন ৩টি করে উইকেট।

বোলারদের গড়ে দেয়া ভিতের উপর দাঁড়িয়ে তিন তরুণ; তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে জয় আসে অনায়াসে। তামিম ৫১ ও সাকিব ৫৩ রান করে আউট হন।

তবে এরপর মুশফিক ও আশরাফুল মিলে জয় নিশ্চিত করেই মাঠ ছাড়েন। মুশফিক অপরাজিত থাকেন ৫৬ রানে। বাংলাদেশ লক্ষ্য পেরিয়ে যায় ৪৮.৩ ওভারে ৫ উইকেট হাতে রেখেই।

ম্যাচ সেরা যদিও নির্বাচিত হন মাশরাফী, তবে এই জয় কেবল মানজারুল ইসলাম রানার। না থেকেও যেই জয়ের নায়ক তিনি। তাকে স্মরণীয় করে রাখতেই লেখা হয় ভারত বধের মহাকাব্য।

আজ সেই দিন, ১৯ বছর আগে আজকের এই দিনেই বিশ্বকাপে প্রথমবার ভারতের বিপক্ষে জেতে বাংলাদেশ! তাক লাগিয়ে দেয় বিশ্বকে।