অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট জিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনে স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ঐতিহাসিক এই জয়ের পর দলের পারফরম্যান্স, মানসিকতা ও সামনে সিরিজ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেছেন প্রধান কোচ ফিল সিমন্স।
সম্প্রতি রেভস্পোর্টসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সিমন্স জানিয়েছেন, দেশের বাইরেও বাংলাদেশ যে ভালো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারে, সেটিই এখন প্রমাণ করতে চান তারা। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পেস-বাউন্সের কন্ডিশনে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
সিমন্স বলেন, ‘এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের বাইরে আমরা ভালো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারি, এই বিষয়টি প্রমাণ করা। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো জায়গায়, যেখানে বাউন্স ও পেসের কারণে মানুষ মনে করে আমরা সমস্যায় পড়ব। ছেলেরা সত্যিই নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া যে এশিয়ার বাইরেও আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে সক্ষম।’
ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের সাফল্যের পেছনে ক্রিকেটারদের আবেগ নিয়ন্ত্রণও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন সিমন্স। ম্যাচের বিভিন্ন সময়ে সাফল্য বা ব্যর্থতার পর মানসিক অবস্থার ভারসাম্য ধরে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন তারা।
বাংলাদেশ কোচ বলেন, ‘এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা। অনেক সময় সকালে চার-পাঁচটি উইকেট পাওয়ার পর আমরা সেটার প্রভাবেই থেকে যাই। কিন্তু এবার আমরা চেষ্টা করেছি যেন লাঞ্চ কিংবা চা-বিরতিতে একই মানসিক অবস্থায় থাকতে পারি এবং বিরতির পরও আবেগ নিয়ন্ত্রণ রেখে মাঠে ফিরতে পারি।’
তিনি আরো বলেন, ‘উইকেট না পেলেও আবেগ যেন খুব বেশি নিচে নেমে না যায়, আবার উইকেট পেলেও যেন খুব বেশি ওপরে উঠে না যায়, এটা নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।’
প্রথম টেস্টে ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা মেহেদী হাসান মিরাজের পারফরম্যান্সও আলাদাভাবে প্রশংসা করেছেন সিমন্স। বিশেষ করে তার অফস্পিনের উন্নতিতে মুগ্ধ বাংলাদেশের প্রধান কোচ।
মিরাজকে নিয়ে সিমন্স বলেন, ‘(মিরাজ) দুর্দান্ত ছিল। অলরাউন্ডার হিসেবে তার মর্যাদা দিন দিন আরো বাড়ছে। ৫০ ওভারের ওয়ানডে ফরম্যাটে আমার মনে হয় সে (অলরাউন্ডারদের র্যাঙ্কিংয়ে) দুই নম্বরে আছে। টেস্টেও সে ক্রমেই ওপরে উঠছে।’
ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজের বোলিংয়ের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা তার বিশ্বমানের অফস্পিন বোলিং দেখেছি। স্টিভ স্মিথও যেমন বলেছে, তৃতীয় দিনেও উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো ছিল। তারপরও স্টিভের মতো ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করার যে ক্ষমতা সে দেখিয়েছে, তাতে বোঝা যায় তার অফস্পিনের মান ক্রমেই উন্নত হচ্ছে।’
অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এমন ঐতিহাসিক জয়ের পর বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে স্বাভাবিকভাবেই ছিল বাঁধভাঙা আনন্দ। সাধারণত ম্যাচ জয়ের পরও সামনে আরেকটি ম্যাচ থাকলে সিমন্স ক্রিকেটারদের অতিরিক্ত উদযাপন থেকে বিরত রাখেন। কিন্তু এবার দলের আনন্দের মুহূর্তে নিজেকেও আটকে রাখতে পারেননি তিনি।
সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে সিমন্স বলেন, ‘সাধারণত আমি থাকলে এত বড় উদযাপন করতে দিতাম না, কারণ আমাদের এখনো একটি ম্যাচ বাকি। কিন্তু এবার নিজেকে আটকাতে পারিনি। এমনকি ড্রেসিংরুমে আমাকেও বসে ছেলেদের উদযাপন দেখতে হয়েছে। কারণ জয়টা এতটাই বড়।’
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের হয়ে খেলে যাওয়া মুশফিকুর রহিমের মুখে এমন আনন্দ দেখতে পাওয়াটা সিমন্সের কাছে ছিল বিশেষ এক মুহূর্ত।
তিনি বলেন, ‘সাথে মুশফিকুর রহিমের মতো একজন খেলোয়াড়, যে কিনা এত দীর্ঘ সময় ধরে এখানে আছে ও অনেক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে, তার মুখে সেই আনন্দ দেখা সত্যিই দারুণ ছিল। তাদের উদযাপন এবং ম্যাচ জেতার আনন্দ উপভোগ করার মুহূর্তটা আমার সত্যিই ভালো লেগেছে।’
তবে ঐতিহাসিক জয় উদযাপনের পর বাংলাদেশের সামনে এখন আরো বড় লক্ষ্য—দ্বিতীয় টেস্ট জিতে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ জয়। সিমন্সের কথাতেও তাই পরিষ্কার, ডারউইনের জয় শুধু উদযাপনের জন্য নয়; বরং দেশের বাইরে বাংলাদেশের সামর্থ্য প্রমাণের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।



