একসময় হাতে ছিল ক্রিকেট বল। স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর। ফটিকছড়ি থেকে প্রতিদিন ছুটে যেতেন চট্টগ্রাম শহরে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটে ঘাম ঝরাতেন। বাঁহাতি চায়নাম্যান স্পিনে মুগ্ধ করতেন কোচদের।
স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন ‘পাগলা ইমুন্ন্যা’—ক্রিকেট ছাড়া যার যেন আর কোনো পৃথিবী ছিল না। সেই ছেলেটিই কয়েক বছরের ব্যবধানে হয়ে ওঠেন চট্টগ্রামে আতঙ্কের এক নাম—ডেভিড ইমন। দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন।
পুলিশের দাবি, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি ছিলেন তিনি। হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, আধিপত্য বিস্তার—একটির পর একটি অভিযোগে তার নাম উঠে আসে।
সম্প্রতি যশোর সীমান্তে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে থেমেছে তার দীর্ঘ পলাতক জীবন; কিন্তু শুরু হয়েছে নতুন প্রশ্ন—একজন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার কিভাবে অপরাধের অন্ধকার জগতে হারিয়ে গেলেন?
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম মোবারক হোসেন ইমনের। বাবা মোহাম্মদ মুসা একজন কৃষক, মা গৃহিণী। চার ভাইবোনের মধ্যে বড় ছিলেন তিনি। ইমন ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটপাগল ছিলেন। স্থানীয়রা তাকে ডাকতেন ‘পাগলা ইমুন্ন্যা’ নামে।
তবে এই নামের সাথে কোনো নেতিবাচক অর্থ ছিল না; বরং ক্রিকেটের প্রতি তার অদম্য ভালোবাসার কারণেই এমন পরিচিতি পেয়েছিলেন। নানা বাড়ির মাদরাসা মাঠ থেকে শুরু হয়েছিল তার ক্রিকেটযাত্রা। কখনো শিক্ষকদের বকা খেয়েছেন, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা অনুশীলন করেছেন।
পরে ব্রাদার্স ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়ে নিয়মিত চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি ও বাকলিয়া স্টেডিয়ামে অনুশীলন করেন। বাঁহাতি চায়নাম্যান স্পিনার হিসেবে দ্রুত নজর কাড়েন। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদব ছিলেন তার অনুপ্রেরণা।
জাতীয় দলের ক্রিকেটার ও বিদেশী দল চট্টগ্রামে অনুশীলনে এলে নেট বোলার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
কিন্তু মাঠের বাইরের জীবন ছিল কঠিন। পরিবারের আর্থিক সঙ্কট, বাবার অসুস্থতা এবং ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় বহন করতে না পারায় ধীরে ধীরে স্বপ্ন ফিকে হতে থাকে।
পরে পরিবারের উদ্যোগে ওমানে পাঠানো হয়। চাকরির ব্যবস্থাও হয়েছিল। কিন্তু বিদেশের চাকরি বেশিদিন টেকেনি। দেশে ফিরে আসেন তিনি। স্বজনদের ভাষ্য, এরপর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে তার জীবন। প্রবেশ হয় অপরাধচক্রে।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের দাবি, ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেন ইমন। অন্যদিকে পুলিশের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সাথে তার সম্পৃক্ততা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তদন্তকারীদের দাবি, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন তিনি। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে অপরাধচক্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।
পুলিশের অভিযোগ, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে বিদেশী নম্বর ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হতো। দাবি পূরণ না হলে চালানো হতো হামলা। তবে সবকিছু আড়ালেই ছিল এতোদিন।
কিন্তু সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে দুই কোটি টাকা এককালীন ও প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আনে ডেভিড ইমনকে। চাঁদা না দেয়ায় সশস্ত্র হামলা চালানো হয় ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে।
হামলার ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুখোশধারী অস্ত্রধারীদের তাণ্ডব, ভাঙচুর ও গুলির দৃশ্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এই হামলার নেপথ্যে ছিল বড় সাজ্জাদের চক্র ও মাঠপর্যায়ে পুরো অপারেশন সমন্বয় করেছিলেন ডেভিড ইমন।
এই হামলার পরই ডেভিড ইমনকে ঘিরে জনমনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ধামা ইলিয়াস গ্রেফতার হলে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ইমনের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
এরপর কয়েক জেলার সমন্বিত অভিযানে যশোরের ঝুমঝুমপুর সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তিনি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের দাবি, বিদেশী নম্বর, এনক্রিপটেড অ্যাপ এবং অস্ত্রধারী বাহিনী ব্যবহার করে তিনি চট্টগ্রামে একটি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। প্রায় ৫০ জন শুটারের সাথে তার সম্পৃক্ততা ছিল।
২০২৫ সাল থেকে চট্টগ্রামের আলোচিত একাধিক হত্যাকাণ্ডে তার নাম উঠে আসে। বাকলিয়ার জোড়া হত্যা, পতেঙ্গা সৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারী ও চান্দগাঁওয়ের হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে। হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৫টি মামলায় তার নাম রয়েছে।
এদিকে চাঁদাবাজির সেই ভিডিও ভাইরাল হতেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। আর এরপর আসে ২৯ জুলাই ভোর। চট্টগ্রাম, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, খুলনা, নড়াইল ঘুরে শেষ পর্যন্ত যশোরের ঝুমঝুমপুরে গিয়ে থামে পুলিশের অভিযান। আর সেখানেই মিলে ইমনের খোঁজ।
পুলিশের দাবি, ভারত পালানোর প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন ছিল তার। গ্রেফতারের সময় নিজের পরিচয় গোপন করে তিনি মিরাজ নাম বলেছিলেন। পরিচিত গোঁফ কেটে ফেলেছিলেন। সাথে ছিল ভারতীয় আধার কার্ড। কিন্তু কথাবার্তায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক টান ধরা পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েন।
পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়িতে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ফটিকছড়ির মানুষের কাছে আজও ইমন এক বিস্ময়ের নাম। যে ছেলেটিকে একসময় সবাই চিনত শান্ত, ভদ্র আর ক্রিকেটপাগল হিসেবে, সেই ছেলেই আজ দেশের আলোচিত অপরাধের খবরে শিরোনাম। ক্রিকেট মাঠে যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত হারিয়ে গেছে অপরাধের অন্ধকার গোলকধাঁধায়।
একজন প্রতিভাবান তরুণের এই উত্থান-পতনের গল্প শুধু একজন ব্যক্তির নয়; এটি ভুল সিদ্ধান্ত, খারাপ সঙ্গ, আর্থিক সঙ্কট এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের প্রভাব কিভাবে একটি সম্ভাবনাময় জীবনকে ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে পারে, তারও এক আলোচিত উদাহরণ।



