অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় লিখেছেন তানজিদ হাসান তামিম। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজের দ্বিতীয় টেস্টেই সেঞ্চুরি করেছেন এই ওপেনার। তার ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের বোলিংয়েও মুগ্ধ সাবেক কোচ ও অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা।
জাতীয় দলের হয়ে গত কয়েক বছর সাদা বলের ক্রিকেটে নিয়মিত তানজিদ। লাল বলের ক্রিকেটে সুযোগ পেয়েছেন মাত্র একবার। সেই তানজিদই অস্ট্রেলিয়ার কঠিন কন্ডিশনে প্রথমবার টেস্ট খেলতে নেমে দেখালেন ভিন্ন রূপ।
দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশনে ১৯৭ বলে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তানজিদ। শেষ পর্যন্ত ১০১ রানে থামেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল আটটি চার ও একটি ছক্কা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশী ব্যাটারও এখন তানজিদ।
সেঞ্চুরির পর অবশ্য বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি তিনি। নাথান লায়নের বলে সামনে এগিয়ে শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন তানজিদ। লং অফ থেকে দারুণভাবে ক্যাচটি নেন মিচেল স্টার্ক।
তবে ততক্ষণে নিজের কাজটা করে ফেলেছেন তানজিদ। তার ব্যাটিং মুগ্ধ করেছে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকে। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করা এই কোচ সরাসরি দেখেছেন ডারউইন টেস্ট।
ঢাকার একটি অনলাইন গণমাধ্যমকে হাথুরুসিংহে বলেন, ‘আমি খেলা দেখেছি, সবার দিকেই তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিলাম। কেবল ব্যাটারদের দেখেছি এমন না, বোলারদেরও দেখেছি। তানজিদ দারুণ ব্যাটিং করেছে, প্রশংসা পাওয়ার মতোই।’
বাংলাদেশের পেসারদের নিয়েও প্রশংসা করেছেন হাথুরুসিংহে। হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট ও তাসকিন আহমেদ-এবাদত হোসেনের বোলিংয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হাসানসহ বাকি দুই পেসার অসাধারণ বল করেছে, দেখার মতো। তাদের লাইন ও লেন্থ দেখলেই বুঝবেন কতটা দুর্দান্ত ছিল তারা।’
তানজিদের এমন ব্যাটিংয়ে খুশি বাংলাদেশের সাবেক নির্বাচক ও বর্তমান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রধান কোচ হান্নান সরকারও। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকেই তানজিদকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।
হান্নান বলেন, ‘তানজিদ সাদা বলের নিয়মিত পারফর্মার। অনেক বছর ধরে খেলে যাচ্ছে সে। তবে লাল বলের ক্রিকেটে তার সময়ের ব্যাপার ছিল, এতো তাড়াতাড়ি সবকিছু সে গ্রহণ করতে পারবে এটা চিন্তা করিনি।’
ঘরোয়া ক্রিকেটে তানজিদের লাল বলের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন হান্নান। তার ভাষায়, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটে তার লম্বা সময় ধরে লাল বলের ক্রিকেটে রান করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘জাতীয় দলে আসার আগে ঢাকা লিগে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে কাজ করেছিলাম তার সাথে। বগুড়াতে তখন আলাপ হয়েছিল, লাল বলে রান পাচ্ছিল, তবে সাদা বলে কঠিন সময় পার করছিল। লঙ্গার ভার্সনে সে ঘরোয়াতে নিয়মিত রান করেছে।’
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেঞ্চুরি করাটা যে কত বড় অর্জন, সেটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন হান্নান। তিনি বলেন, ‘তামিম অনেক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে। সেই দিক থেকে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যদিও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেঞ্চুরি অনেক বড় কিছু।’
‘এ ছাড়া ঘরোয়াতে কিন্তু সে চারদিনের ম্যাচে অনেক রান করেছে, সেই অভিজ্ঞতা তো তার ছিলই। সেই জায়গা থেকে এমন ইনিংস খেলা দারুণ ব্যাপার।’ তানজিদের ইনিংসকে নিজের দেখা অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবেও দেখছেন হান্নান।
তিনি বলেন, ‘তার ক্যারিয়ারের এটা সেরা ইনিংস কিনা এটা সেই বলতে পারবে। তবে আমার দেখা টপ ক্লাস ইনিংসের একটা হয়ে থাকবে। তামিমের সাথে অনেক কোচই কাজ করেছে, আমিও করেছি। যখন সেই খেলোয়াড় ভালো করে তখন কোচের আনন্দ থাকবে, ভালো লাগা থাকবে এটা স্বাভাবিক। আমারও ভালো লাগছে।’
তানজিদের ২০২০ যুব বিশ্বকাপজয়ী দলের প্রধান কোচ ছিলেন নাভিদ নেওয়াজ। সাবেক শিষ্যের এমন পারফরম্যান্সে তিনিও উচ্ছ্বসিত। নাভিদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়, সাদা বল থেকে লাল বলে এসে তানজিদের দ্রুত মানিয়ে নেয়া।
তিনি বলেন, ‘প্রথমত আমি বেশি খুশি সাদা বল থেকে লাল বলে সুযোগ পেয়ে দ্রুত মানিয়ে নেয়াটা। বড় বিষয় অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বের বড় একটি দলের বিপক্ষে সে যেভাবে ব্যাট করেছে, মনেই হয়নি যে এটি তার দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ।’
শুধু তানজিদের সেঞ্চুরি নয়, বাংলাদেশের বোলিংও প্রশংসা পেয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকাদের কাছ থেকে। হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট ও বাংলাদেশের পেসারদের দুর্দান্ত লাইন-লেন্থে প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
সাবেক অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার ক্যারি ও’কিফ বাংলাদেশের পারফরম্যান্সকে দেখছেন আরো বড়ভাবে। কায়ো স্পোর্টসে তিনি বলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটে এটা বাংলাদেশের অন্যতম সেরা দিন।’
দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট খেলা ডেভিড ওয়ার্নারও বাংলাদেশের বোলিংয়ে মুগ্ধ। এক যুগের বেশি সময়ের টেস্ট ক্যারিয়ারে ২৬টি সেঞ্চুরি করা সাবেক এই ওপেনার মনে করেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফরকারী কোনো দলের বোলারদের শুরু থেকেই এতটা নিয়ন্ত্রিত বোলিং করতে তিনি দেখেননি।
ডারউইন টেস্টে ফক্সের হয়ে ধারাভাষ্য দেয়া ওয়ার্নার বলেন, ‘আমি অনেক ক্রিকেট খেলেছি ও দেখছি। অনেক দলকেই অস্ট্রেলিয়া সফরে আসতে দেখেছি। তবে সত্যি বলতে, আমার দেখা প্রথম কোনো সফরকারী দল হিসেবে তাদের বোলাররা শুরু থেকেই একদম নিখুঁত জায়গায় বল করে গেছে। তারা কোনো ছাড় দেয়নি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কাজটা মোটেও সহজ নয়, কিন্তু তারা তা করে দেখিয়েছে।’
ওয়ার্নারের কথার সূত্র ধরে বাংলাদেশের লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করেছেন ও’কিফও। ফক্সের ধারাভাষ্যে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকদের জন্য এটা একটি পরিষ্কার বার্তা—বাংলাদেশ দল এখানে নিছক খেলতে আসেনি, লড়াই করতে এসেছে। অনেকেরই ধারণা ছিল ম্যাচটা বেশি দূর গড়াবে না। কিন্তু বাংলাদেশ স্পষ্টভাবেই এগিয়ে আছে।’



