দিয়াশলাই

অসাবধানতায় ঘটে যাওয়া ঘটনা যেভাবে মানবজাতির জন্য বড় উপকারী হয়ে ওঠে

ওয়াকার একজন প্রশিক্ষিত সার্জন ছিলেন, তবে ১৮০০ শতকের অপারেশন থিয়েটারের রক্তাক্ত পরিবেশে বিরক্ত হয়ে তিনি আবার প্রশিক্ষণ নিয়ে ‘ড্রাগিস্ট’ হন।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
স্টকটনের প্রেস্টন পার্ক মিউজিয়ামে ওয়াকারের ফ্রিকশন লাইটটের মতো দিয়াশলাই মানুষের দেখার জন্য রাখা আছে (ইনসেটে)
স্টকটনের প্রেস্টন পার্ক মিউজিয়ামে ওয়াকারের ফ্রিকশন লাইটটের মতো দিয়াশলাই মানুষের দেখার জন্য রাখা আছে (ইনসেটে) |বিবিসি

আজ থেকে ২০০ বছর আগে, ১৮২৬ সালে অসাবধানতায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা পরিণত হয়েছিল সৌভাগ্যে, যেটি পরে মানবজাতির আলো ও তাপ তৈরির পদ্ধতিকেই চিরতরে বদলে দেয়।

জন ওয়াকার নামের একজন ইংরেজ ফার্মাসিস্ট বিস্ফোরক তৈরির জন্য রাসায়নিকের মিশ্রণ করছিলেন। তখন মিশ্রণে ভেজানো একটি কাঠি ভুলবশত তার ফায়ারপ্লেসের সামনে একটি পাথরে আঘাত করলে হঠাৎ আগুন ধরে যায়।

ওয়াকারের জন্ম ১৭৮১ সালে, ডারহামের বন্দরনগরী স্টকটন-অন-টিস-এ, শিল্প বিপ্লবের মাঝামাঝি সময়ে। কাছাকাছি সময়েই, ১৭৭৬ সালে বাণিজ্যিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন।

এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহারকারী প্রথম পাবলিক রেলওয়ে ১৮২৫ সালে স্টকটনে পৌঁছায়।

চার বছর পর জর্জ স্টিফেনসনের ‘রকেট’, যেটি মূলত আরেকটু আধুনিক বাষ্পীয় ইঞ্জিন বা স্টিম লোকোমোটিভ, সেটি প্রমাণ করে যে এর ব্যবহারে ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে যাত্রীবাহী ট্রেন।

ঘোড়ায় চড়ে ১২ দিন পর যে গন্তব্যে পৌঁছানো যেত, সেটা মাত্র আট ঘণ্টায় সম্পন্ন হতে থাকে।

তবু এই শক্তির উৎস বা ইঞ্জিনে আগুন জ্বালাতে মানুষ তখনো চকমকি পাথর ও ইস্পাত ব্যবহার করছিল, অথবা সব সময়ই অঙ্গার বা কয়লা জ্বালিয়ে রাখতে হতো।

ওয়াকারের আকস্মিক আবিষ্কার আগুন তৈরির উৎপাদন, ব্যবহার ও বহনযোগ্যতায় বিপ্লব না আনা পর্যন্ত এই অবস্থা চলছিল।

ওয়াকার একজন প্রশিক্ষিত সার্জন ছিলেন, তবে ১৮০০ শতকের অপারেশন থিয়েটারের রক্তাক্ত পরিবেশে বিরক্ত হয়ে তিনি আবার প্রশিক্ষণ নিয়ে ‘ড্রাগিস্ট’ হন।

১৮২৬ সাল নাগাদ তিনি মানুষের পাশাপাশি ঘোড়া, গরু, এমনকি মুরগির জন্যও ওষুধ তৈরি করেছিলেন বলে লেখক অ্যালান মিডলটনের লেখায় উঠে আসে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়াকার রাসায়নিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করছিলেন।

‘ওয়াকার একজন বুদ্ধিমান ও খুবই সদয় মানুষ ছিলেন, কেউ কেউ তাকে একটু আলাদা ধরনের মানুষ বলেও মনে করেন,’ বলেন মিডলটন।

‘তার একটি বড় আগ্রহের জায়গা ছিল রসায়ন এবং তিনি তার কৃষক বন্ধুদের জন্য পারকাশন ক্যাপ (যে যন্ত্র বন্দুক ছুড়তে সাহায্য করে) তৈরি করতে রাসায়নিক মিশ্রণ করতেন। একদিন তিনি একটি নির্দিষ্ট মিশ্রণ তৈরি করে শুকোতে রাখেন। শুকিয়ে গেলে তিনি কাঠের টুকরাটি চুল্লির পাথরে আঘাত করেন এবং সেটিতে আগুন ধরে যায়।’

‘এটি ছিল এক অসাধারণ মুহূর্ত, যা তখন পর্যন্ত পৃথিবীর আর কেউ করেনি। তিনি এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বুঝতে পারেন। এটি ১৮২৬ সালের কোনো এক সময় ঘটে, সঠিক তারিখ আমরা জানি না, তবে প্রথম বিক্রি হয় ১৮২৭ সালের এপ্রিল মাসে।’

“তিনি এগুলোকে ‘ফ্রিকশন ম্যাচেস’ নাম দেন এবং এগুলো প্রথমে শতকে গণনা করে টিনের কৌটায় বিক্রি হতো।”

ওয়াকারের ‘ফ্রিকশন লাইটস’ ছিল খুব পাতলা চ্যাপ্টা কাঠির টুকরো, যার একপ্রান্ত পটাশিয়াম ক্লোরেট, অ্যান্টিমনি সালফাইড, গাম অ্যারাবিক বা উদ্ভিদ থেকে পাওয়া এক ধরনের আঠা ও পানির মিশ্রণে ডুবানো থাকত।

ভাঁজ করা স্যান্ডপেপার বা শিরিষ কাগজে ঘষা হলে দিয়াশলাইটি সাথে সাথে জ্বলে উঠত।

ওয়াকার তার সূত্রটি গোপন রেখেছিলেন, কখনো পেটেন্ট করেননি।

তার পণ্য ছিল সাশ্রয়ী এবং তিনি স্টকটনের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হন।

তবে ‘ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নাল’ অনুযায়ী, ‘ওয়াকারের দিয়াশলাই নিখুঁত ছিল না। জ্বলন্ত সালফারের আস্তরণ কখনো কখনো কাঠি থেকে পড়ে যেত, ফলে মেঝে বা ব্যবহারকারীর পোশাক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকত।’

১৮২৯ সালে লন্ডনের স্যামুয়েল জোন্স নিজের উদ্ভাবিত ‘লুসিফার’ বাজারে আনেন, যা ওয়াকারের ফ্রিকশন লাইটসের হুবহু অনুকরণ ছিল এবং প্রথমবারের মতো এর ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়।

ব্রিটিশ ম্যাচবক্স লেভেল অ্যান্ড বুকম্যাচ সোসাইটি বা বিএমএলঅ্যান্ডবিএসের সভাপতি ডেরেক জাড বিবিসি নিউজকে বলেন, এরপরই অন্যরা ম্যাচ তৈরির সূত্র আরো উন্নত করতে শুরু করে।

প্যাকেজিং টিনের আকার ও গঠনেও পরিবর্তন আসে, কিন্তু ১৮৪৪ সালের একটি সুইডিশ সংস্করণে আধুনিক দিয়াশলাই বাক্স জনপ্রিয় হয়।

‘এটাই প্রথম দিয়াশলাই বাক্স, যা আসলে পেটেন্ট করা হয়েছিল,’ বলেন জাড।

পরবর্তী সময়ে অনেক এলাকায় দিয়াশলাই তৈরি একটি গৃহভিত্তিক শিল্পে পরিণত হয়। ঘরে বসে উৎপাদন করার এই কাজটি পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তাদের অতিরিক্ত আয়ের উৎস হয়ে যায়।

‘কারখানার আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী নারী ও শিশুরা পিসওয়ার্ক পদ্ধতিতে (উৎপাদনের পরিমাণ অনুযায়ী পারিশ্রমিক) বাক্স তৈরি করত। পরে যন্ত্রপাতি এলে এটি বহু-মিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হয়,’ বলেন জাড।

তবে দিয়াশলাইয়ের পরবর্তী সময়ে আরেকটি আবিষ্কার, সিগারেট লাইটার, এই শিল্পে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটায়।

‘সময়ের সাথে সাথে ব্যবসাটি ছোট হয়ে গেছে।’ অনেক কোম্পানি হারিয়ে গেছে,’ বলেন জাড।

তবুও দিয়াশলাই আজও বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত এবং যদিও এটি এখনো একটি প্রয়োজনীয় সামগ্রী, মিডলটনের মতে, এখন এটি একটি ফ্যাশন উপকরণেও পরিণত হয়েছে, যেখানে কাস্টমাইজড প্যাকের দাম ২৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

তবে এর উদ্ভাবক এখনো তুলনামূলকভাবে অপ্রকাশিত এবং মিডলটন ও জাড উভয়েই একমত যে ২০০ বছর পর ওয়াকার আরো বড় স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।

জাড বলেন, ‘ওয়াকার এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি নিজের আবিষ্কারকে অনুসরণ করতে চাননি। যদি তিনি তা করতেন, তবে তিনি বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব হতে পারতেন।’

তবে সৌভাগ্যক্রমে স্টকটনের মানুষও জন ওয়াকারের অবদান একইভাবে মনে করেন।

অনেকেই আশা করছেন, এ বছরের এবং আগামী বছরের উদযাপন, যার সূচনা ২৯ মে, ওয়াকারের জন্মদিনে, অবশেষে এই অসাধারণ স্থানীয় উদ্ভাবককে প্রাপ্য স্বীকৃতি দেবে।

‘আমরা আশা করি যে চলতি বছর ও আগামী বছরে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আরো বেশি মানুষ দৈনন্দিন ব্যবহৃত দিয়াশলাইয়ের উন্নয়নে তার ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারবে,’ বলেন কাউন্সিল নেতা লিসা ইভান্স।

‘ফ্রিকশন ম্যাচের আবিষ্কারের ফলে খুব কম পরিশ্রমে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।’

‘দিয়াশলাইয়ের প্রবর্তন শিল্পক্ষেত্র ও দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজে অনেক সহজতা ও গতি এনে দেয়। তিনি যে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছিলেন, তা আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।’

সূত্র : বিবিসি