মঙ্গলের বুকে অদ্ভুত ডোরাকাটা পাথর: পানির খোঁজে কিউরিওসিটি

সৈয়দ মূসা রেজা
মঙ্গলের বুকে কিউরিওসিটি রোভারের তোলা ছবি
মঙ্গলের বুকে কিউরিওসিটি রোভারের তোলা ছবি |সংগৃহীত

ডেইলি গ্যালাক্সি জানিয়েছে, মহাশূন্যের অতল রহস্য ভেদ করতে করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার কিউরিওসিটি রোভার মঙ্গলের বুকে এক অদ্ভুত জগতের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। লাখো-কোটি বছর ধরে ধুলোবালি আর রুক্ষ পাথরের নিচে লুকিয়ে থাকা এক ডোরাকাটা অঞ্চলের সন্ধান পেয়েছে এই রোভার। অস্ট্রেলীয় জ্যোতির্বিদ 'ওয়াল্টার ফ্রেডরিক গেল'-এর নামানুসারে মঙ্গলের বিশাল এক গহ্বরের নামকরণ করা হয়েছে 'গেল ক্রেটার'। এই 'গেল ক্রেটার'-এর শেষ সীমানায় পৌঁছে কিউরিওসিটি এমন এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়েছে, যেখানে লাল গ্রহের দুটি ভিন্ন যুগের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। মসৃণ বালিময় পথ পেরিয়ে রোভারটি এখন প্রবেশ করেছে এক অত্যন্ত দুর্গম ও পাথুরে এলাকায়, যা বিজ্ঞানীদের কৌতূহলকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। লাল গ্রহের পানির রহস্য নিয়ে জানার আগে বরং গেলের কথা জেনে নেই।

দিনটা ছিল ১৮৯২ সালের শেষের দিক। সিডনির এক ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার বা নগদ টাকার ডেস্কে বসে খাতা-কলমে হিসাব মেলাচ্ছিলেন এক যুবক। তবে তাঁর মন পড়ে ছিল অন্য কোথাও। দিনশেষে যখনই রাতের আকাশ কালো হয়ে আসত, ব্যাংকের হিসাবের খাতা বন্ধ করে তিনি ছুটে যেতেন নিজের বাড়ির ছাদে। দূরবীন চোখে তাকাতেন মহাশূন্যের দিকে।

এই যুবকের নাম ওয়াল্টার ফ্রেডরিক গেল। পেশায় একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা। নেশায় তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন তুখোড় জ্যোতির্বিদ। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি তাঁর ছিল না, কিন্তু মহাবিশ্বের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর কৌতূহল ছিল যেকোনো বিজ্ঞানীর চেয়েও তীব্র। নিজের ঘরের ছাদেই তিনি বানিয়ে ফেলেছিলেন একটা আস্ত মানমন্দির।

গেল-এর জীবনের অন্যতম সেরা রোমাঞ্চ শুরু হয় মঙ্গলের প্রেমে পড়ার পর। ১৮৯২ সালে যখন মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর খুব কাছে চলে আসে, তখন তিনি নিজের তৈরি টেলিস্কোপ দিয়ে লাল গ্রহের বুকে এক রহস্যময় খালের মতো জালের সন্ধান পান। সে সময় তাঁর এই পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞান মহলে বেশ সাড়া ফেলেছিল। শুধু মঙ্গল নয়, মহাশূন্যের অন্ধকার চিরে ছুটে চলা সাত-সাতটি নতুন ধূমকেতু আবিষ্কার করেছিলেন তিনি, যার মধ্যে বেশ কয়েকটির নাম দেওয়া হয়েছিল তাঁরই নামানুসারে। নিজের তীব্র একাগ্রতায় তিনি পরবর্তীতে 'রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল Общество' বা 'রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি'র ফেলো নির্বাচিত হন এবং ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের নিউ সাউথ ওয়েলস শাখা প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৪৫ সালে সিডনির এক শান্ত বিকেলে ৭৯ বছর বয়সে এই নক্ষপ্রেমিক চিরবিদায় নেন। তিনি হয়তো চলে গেছেন, কিন্তু বিজ্ঞানজগৎ এই স্বশিক্ষিত স্বপ্নবাজ মানুষকে ভুলে যায়নি। আর তাই, লাল গ্রহের বুকে যে সুবিশাল ও রহস্যময় গহ্বরে আজ নাসার কিউরিওসিটি রোভার ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার নাম রাখা হয়েছে তাঁরই স্মৃতিতে— 'গেল ক্রেটার' বা 'গেল গহ্বর'।

পৃথিবীর এক কোণে বসে যে মানুষটি একদিন দূরবীন দিয়ে মঙ্গলের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, আজ তাঁরই নাম বুকে নিয়ে মঙ্গলের ধূলিকণায় চাকা ঘুরিয়ে চলেছে মানুষের তৈরি রোবট। এর চেয়ে সুন্দর শ্রদ্ধা জানানো আর কী-ই বা হতে পারে!

'গেল ক্রেটার' বা 'গেল গহ্বর'-এ কিউরিওসিটি রোভারের রোমাঞ্চকর অভিযানের গতিশীল গল্পটি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন বিজ্ঞান-সাংবাদিক লিডিয়া আমাজুজ। আলজেরিয়ার তিজির আউজু অঞ্চলের মুলুদ মামেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে ইংরেজি এবং ২০২১ সালে ভাষা ও যোগাযোগ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া লিডিয়া জটিল বিজ্ঞানকে মানুষের মুখের ভাষায় রূপ দিতে ভালোবাসেন। তাঁর সেই চমত্কার লেখনীতেই উঠে এসেছে, কীভাবে মঙ্গলের রুক্ষ পাথরের খাঁজে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছরের ইতিহাস। রুক্ষ পাথুরে অঞ্চলের এই রূপান্তর বা ট্রানজিশন জোনে পৌঁছেই কিউরিওসিটি দেখতে পায় অদ্ভুত সব ডোরাকাটা পাথর, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। বিজ্ঞানীরা এগুলোকে 'পিনস্ট্রাইপড রক' বা সরু ডোরাকাটা পাথর বলে অভিহিত করছেন।

নাসার পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে মঙ্গলের মাটিতে নিজের ৪,৯৪২তম দিনে কিউরিওসিটি রোভার তার বাম নেভিগেশন ক্যামেরা দিয়ে 'সেরো কাস্তিলো' নামের এক পাথুরে এলাকার ছবি তোলে। ছবিটির একদম নিচের দিকে 'হরনিলোস' নামের একটি নির্দিষ্ট পাথুরে লক্ষ্যবস্তু দেখা যায়, যা বিজ্ঞানীদের মঙ্গলের মাটির স্তর বিন্যাস বুঝতে দারুণ সাহায্য করছে। গবেষকদের ধারণা, একসময় এই এলাকায় পানির তীব্র প্রবাহ ছিল। হ্রদ ও নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পলি জমে জমে তৈরি হয়েছে এই বিচিত্র স্তর। এটা আসলে মঙ্গলের আর্দ্র অতীত থেকে আজকের এই শুষ্ক ও প্রাণহীন মরুতে রূপান্তরের এক জীবন্ত ভূতাত্ত্বিক দলিল।

আধুনিক প্রযুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ"

এই মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে কিউরিওসিটি তার সাথে থাকা সবকটি আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্র একযোগে কাজে লাগিয়েছে। 'কেমক্যাম' নামের একটি বিশেষ যন্ত্র দিয়ে রোভারটি 'কুনটুরিরি' এবং 'তোকোন্সে' নামের পাথরে শক্তিশালী লেজার রশ্মি ছুড়ে রাসায়নিক পরীক্ষা চালিয়েছে। আবার নিজস্ব ধুলোবালি পরিষ্কার করার ব্রাশ বা ডাস্ট রিমুভাল টুল দিয়ে 'লাগুনা ফেয়া' আর 'লাগুনা লেজিয়া'র মতো জায়গায় একদম তাজা পাথরের স্তর উন্মোচন করেছে। পাথরগুলোর ভেতরে কী ধরনের খনিজ লুকিয়ে আছে এবং তাদের মধ্যে কী সূক্ষ্ম তারতম্য রয়েছে তা তুলনা করতে 'এপিএক্সএস' নামের এক্স-রে স্পেক্ট্রোমিটার ব্যবহার করে 'মালপারতিদা' এবং 'পিকো দেল তুনারি' নামের পাথুরে কণার নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আর একদম কাছ থেকে পাথরের কণা দেখার জন্য কাজ করছে 'মাহলি' নামের হ্যান্ড লেন্স ক্যামেরা।

লাল গ্রহের অতীত খোঁজার অবিরাম যাত্রা

পাথরের রহস্য ভেদের পাশাপাশি কিউরিওসিটি মঙ্গলের বুকে ঘুরে বেড়ানো কালো রঙের অদ্ভুত বোল্ডার বা পাথরগুলো নিয়েও গবেষণা করছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা , কর্ডিলেরা বুটের কাছাকাছি পড়ে থাকা এই বিশাল পাথরগুলো একসময় পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে নিচে নেমে এসেছে, যার সাথে প্রাচীন বরফ গলার সম্পর্ক থাকতে পারে। একই সাথে রোভারটি মঙ্গলের আকাশেও নজর রাখছে। সেখানকার ধূলিঝড়, মেঘের গতিবিধি এবং ঘূর্ণিবাতাস পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি রোভারটি একটি বড় অন্ধকার পাথরের দিকে এগোচ্ছে, যা হতে পারে কোনো মহাজাগতিক উল্কাপিণ্ড।

২০১২ সালে মঙ্গলের বুকে চাকা রাখার পর থেকে এই রোভারটি মানুষের কল্পনার সীমানা ছাড়িয়ে একের পর এক নতুন পথ দেখাচ্ছে। এই নতুন ডোরাকাটা পাথরগুলোর আবিষ্কার মঙ্গলের জলবায়ুর পরিবর্তন এবং কোটি কোটি বছরের বিবর্তনকে আরো স্পষ্ট করে তুলবে। লাল গ্রহের বুকে এখনো যে কত বিস্ময়কর রহস্য উন্মোচন করা বাকি, কিউরিওসিটির এই জয়যাত্রা আমাদের যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।