শত্রুর এআই দিয়েই শত্রুকে নিশানা করছে ইরান?

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের নতুন এক প্রতিবেদন সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। কোম্পানিটির দাবি, ইরান-সংশ্লিষ্ট, ইয়েমেনি, চীনা ও রুশ বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি তাদের ‘ক্লড’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সামরিক প্রযুক্তি ও অস্ত্র উন্নয়নের চেষ্টা করেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
এআই দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযু্ক্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে কি হাউছিরা?
এআই দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযু্ক্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে কি হাউছিরা? |সংগৃহীত

মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ‘ক্লড’ ব্যবহার করে যুদ্ধপ্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা করেছে ইরান-সংশ্লিষ্ট, ইয়েমেনি, চীনা ও রুশ গোষ্ঠীগুলোর যোদ্ধারা।

গেরিলা যুদ্ধের একটি পুরোনো ও কার্যকর নীতি, শত্রুর কাছ থেকেই অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে তা আবার শত্রুর বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা। চে গুয়েভারা তাঁর গেরিলা যুদ্ধ বিষয়ক লেখায় গেরিলাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহের উৎস হিসেবে নিজ দুশমনকেই চিহ্নিত করেছিলেন। কিউবার বিপ্লবী যুদ্ধে এর সফল প্রয়োগ দেখা যায়। পাহাড়ে ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারাদের গেরিলাদের অস্ত্র ছিল অপ্রতুল। তাই তারা সরকারি সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে অস্ত্র দখল করত। একটি লড়াইয়ে শত্রুর ক্ষতি হতো, আবার সেই অস্ত্র হাতে পেয়ে গেরিলাদের শক্তিও বাড়ত। ভিয়েতনামেও ফরাসি বাহিনীর কাছ থেকে দখল করা অস্ত্র পরে আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামীদের কাছে পাঠানো হয়েছিল—সেই অস্ত্র আবার ব্যবহৃত হয়েছে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধেই। অর্থাৎ, শত্রুর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তার দিকেই তাক করা—গেরিলা যুদ্ধের এই কৌশল শুধু তত্ত্বে নয়, ইতিহাসের বহু যুদ্ধে সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে। এআই যুগে গেরিলা নয়, আধুনিক যুদ্ধেও একই খেলার নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের নতুন এক প্রতিবেদন সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। কোম্পানিটির দাবি, ইরান-সংশ্লিষ্ট, ইয়েমেনি, চীনা ও রুশ বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি তাদের ‘ক্লড’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সামরিক প্রযুক্তি ও অস্ত্র উন্নয়নের চেষ্টা করেছে। সামরিকবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ার জোন ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরেছে।

অ্যানথ্রপিকের ১৫৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আট মাসে ক্লডকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, সাইবার হামলা, প্রভাব বিস্তারের অভিযান এবং উদ্বেগজনক জৈব গবেষণার কাজেও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছে। কোম্পানিটির ভাষায়, এটি তাদের এ ধরনের অপব্যবহার নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজের খোঁজে ক্লড

প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ইরান-সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে নিয়ে। অ্যানথ্রপিকের দাবি, তারা প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য ক্লড ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সুপারিশ তৈরির চেষ্টা করেছিল।

ক্লডের সহায়তায় তৈরি একটি পাইথনভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা নৌযানের অবস্থান শনাক্ত ও অনুসরণের চেষ্টা করে। প্রকাশ্য সামরিক ছবির ক্যাপশন থেকে মার্কিন সেনাদের নামের তালিকা, জাহাজ ও বিমানের ট্রান্সপন্ডার শনাক্তকারী তথ্য, বাণিজ্যিক উপগ্রহচিত্র অনুসন্ধানের স্ক্রিপ্ট এবং মার্কিন নৌযানের গতিবিধি প্রকাশ করে এমন ওয়েবসাইটের তালিকাও সংগ্রহ করা হয়।

জাহাজে ব্যবহৃত স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, সিসকোর যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং শিল্প নিয়ন্ত্রণ পণ্যের পরিচিত দুর্বলতাগুলো নিয়েও গবেষণা করা হয়। অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে এবং বিষয়টি সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছে। তবে এসব তথ্য পরে মার্কিন বাহিনীর ওপর কোনো হামলায় সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা জানা যায়নি। ([Anthropic][1])

ইয়েমেনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রকৌশলী হিসেবে এআই

আরেক ঘটনায় উত্তর ইয়েমেনে অবস্থানরত একটি গোষ্ঠী ক্লড ব্যবহার করে তিনটি অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিতে কাজ করছিল বলে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে। এর মধ্যে ছিল শেষ পর্যায়ে লক্ষ্য খুঁজে নিতে সক্ষম নির্দেশিত রকেট, দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি পাল্লার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি বহুস্তরবিশিষ্ট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল সংস্করণসহ ‘আর-২০০০’ নামে ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সিরিজ।

গাইডেন্স, নেভিগেশন ও নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যার তৈরিতে তারা মানব সফটওয়্যার প্রকৌশলীর বদলে ক্লড কোড ব্যবহার করছিল। একটি ক্লড কোড লিখত, আরেকটি গবেষণা করত, তৃতীয়টি আগেরটির লেখা কোড পর্যালোচনা করত। এভাবে কয়েকটি ক্লডকে একসাথে ব্যবহার করে ছোট একটি প্রকৌশলী দলের মতো কাজ ভাগ করে দেয়া হয়েছিল।

অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা অনেক অনুরোধ আটকে দিলেও সবগুলো আটকাতে পারেনি। আসল উদ্দেশ্য গোপন করা এবং কাজকে বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে তারা নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। একটি নির্দেশিত রকেট পরীক্ষামূলকভাবে উৎক্ষেপণও করা হয়। কিন্তু পরীক্ষাটি ব্যর্থ হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা কেন ব্যর্থ হলো, তা বুঝতে আবার ক্লডের কাছে ফিরে যায়। তবে কোনো কার্যকর অস্ত্র সফলভাবে মোতায়েন করতে পেরেছে—এমন প্রমাণ অ্যানথ্রপিকের হাতে নেই।

অ্যানথ্রপিক হাউছিদের নাম সরাসরি উল্লেখ করেনি। তবে দ্য ওয়ার জোন বলছে, উত্তর ইয়েমেনে সক্রিয় ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে এমন প্রধান শক্তি হলো হাউছি গোষ্ঠী, যারা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পেয়ে থাকে।

চীনের টর্পেডোবিরোধী অস্ত্র থেকে তাইওয়ানের লক্ষ্যবস্তু

চীনের একটি গোষ্ঠীও ক্লড ব্যবহার করে নৌযুদ্ধে টর্পেডো ঠেকানোর অস্ত্রব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তারা চীনা ভাষায় একটি টর্পেডোবিরোধী ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেমের স্পেসিফিকেশন এবং দুই শতাধিক পৃষ্ঠার একটি কারিগরি প্রস্তাব তৈরি করে। প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে মার্কিন টর্পেডোবিরোধী ও সাবমেরিনবিরোধী কর্মসূচির সাথেও নিজেদের ব্যবস্থার তুলনা করা হয়। অ্যানথ্রপিকের ধারণা, ওই ব্যক্তি চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিল এবং পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির জন্য অস্ত্রের স্পেসিফিকেশন ও সংগ্রহ প্রস্তাব তৈরির চেষ্টা করছিল।

আরেক চীনা ব্যক্তি ক্লড ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দমনের জন্য প্রায় ১৬টি মডিউল নিয়ে একটি সফটওয়্যার ব্যবস্থা তৈরি করে। এতে রাডার, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান, কমান্ড পোস্ট ও যোগাযোগ কেন্দ্র বিশ্লেষণ করে কোন লক্ষ্যবস্তু আগে দমন করা উচিত, তা নির্ধারণের ব্যবস্থা ছিল। একপর্যায়ে পরীক্ষামূলক পরিস্থিতিতে তাইওয়ানের ১২টি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা হয়।

রাশিয়ার ড্রোনের ঝাঁক

রাশিয়াভিত্তিক কয়েকজন ব্যক্তি ক্লড ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় এফপিভি কামিকাজে ড্রোনের একটি ঝাঁক তৈরির কাজও করছিল বলে অ্যানথ্রপিকের দাবি। ড্রোনগুলোর মধ্যে সমন্বয়, যৌথ স্মৃতি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং আক্রমণের সফটওয়্যার তৈরিতে ক্লড ব্যবহার করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছিল, যেখানে ড্রোনের ভেতরের ভাষা মডেল মানুষকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শনাক্ত করতে পারবে এবং মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বিস্ফোরণের নির্দেশ দিতে পারবে। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের সংগ্রহ করা ভিডিও দিয়ে একটি কম্পিউটার ভিশন মডেলকেও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। অ্যানথ্রপিক বলছে, তারা নয়টি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে, যার আটটি অস্ত্রসংক্রান্ত নয়, সাধারণ ফ্রিল্যান্স কাজেও ব্যবহৃত হয়েছিল।

নিরাপত্তার দেয়াল কি যথেষ্ট?

অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনের মূল উদ্বেগ এখানেই। কোম্পানিটি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্লডের ব্যবহার সীমিত করা এবং অস্ত্র উন্নয়নের মতো কাজ ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু নতুন তথ্য বলছে, সেই দেয়াল এখনো পুরোপুরি অটুট নয়। ব্যবহারকারীরা উদ্দেশ্য গোপন করছে, বিভিন্ন সেশনে কাজ ভাগ করছে এবং অন্য কৌশল ব্যবহার করে নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

বিষয়টি নিয়ে অ্যানথ্রপিকের নিজের দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও বিতর্ক কম নয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে পেন্টাগনের সাথে গণনজরদারি ও পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থায় ক্লড ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কোম্পানিটির প্রকাশ্য বিরোধ চলছে। পরে অ্যানথ্রপিককে সরবরাহ চেইন ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং মার্কিন সামরিক ও সরকারি কিছু কাজে ক্লড ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। ১০ সেপ্টেম্বর পেন্টাগনের এক শীর্ষ প্রযুক্তি কর্মকর্তা জানান, গোপনীয় কাজে অ্যানথ্রপিকের পণ্যের ব্যবহার ৯০ শতাংশ কমানো হয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের নতুন প্রতিবেদনের অভিযোগ শুধু ক্লডের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি আরো বড়। বাজারে সহজলভ্য অন্যান্য এআই মডেলও একইভাবে ব্যবহার হতে পারে। প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, এক দেশের তৈরি মডেল অন্য দেশের কোম্পানি নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে, আবার সেই প্রযুক্তির নতুন সংস্করণও সবার জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে।

একসময় গেরিলারা শত্রুর রাইফেল কেড়ে নিয়ে সেই অস্ত্রই শত্রুর দিকে তাক করত। এখন যুদ্ধের নতুন ময়দানে রাইফেলের জায়গায় এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যে প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি, সেটিই ব্যবহার করে কেউ মার্কিন যুদ্ধজাহাজের অবস্থান খুঁজছে, কেউ ক্ষেপণাস্ত্রের পথনির্দেশনা তৈরি করছে, কেউ টর্পেডোবিরোধী অস্ত্রের নকশা করছে, আবার কেউ স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের ঝাঁক বানানোর চেষ্টা করছে।

অস্ত্র বদলেছে, যুদ্ধের ময়দান বদলেছে। কিন্তু পুরোনো সেই নীতিটি যেন নতুন রূপে ফিরে এসেছে—শত্রুর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তার দিকেই তাক করা।