বেইজিংয়ে বিশ্বরেকর্ড গুঁড়িয়ে মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে হিউম্যানয়েড রোবট

চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি হিউম্যানয়েডগুলো প্রমাণ করেছে যে, তারা এখন পেশাদার অ্যাথলেটদের চেয়েও দ্রুত ছুটতে সক্ষম।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
হিউম্যানয়েড রোবট
হিউম্যানয়েড রোবট |সংগৃহীত

গত বছরের সেই হোঁচট খাওয়া আর জবুথবু শুরুর গল্প এখন সুদূর অতীত। বেইজিংয়ে এবার দেখা গেল যন্ত্রমানবের অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতা, যা আক্ষরিক অর্থেই দৌড়বিদদের পিলে চমকে দিয়েছে। রোবটিক্স প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ জানান দিয়ে রোববার (১৯ এপ্রিল) বেইজিং হাফ-ম্যারাথনে ডজনেরও বেশি চীনা হিউম্যানয়েড রোবট বাতাসের বেগে মানুষকে ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে মাত্র এক বছর আগেও ছাড়িয়ে যাওয়া তো দূরের কথা ফিনিশিং লাইন ছোঁয়াই ছিল রোবটের জন্য বড়সড় চ্যালেঞ্জ।

এবারের আসরে অনার কোম্পানির তৈরি বিজয়ী রোবটটি মাত্র ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে রেস শেষ করে রীতিমতো বিশ্ব কাঁপিয়ে দিয়েছে। গত মাসে লিসবনে জ্যাকব কিপ্লিমোর গড়া বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও কয়েক মিনিট দ্রুত রেস শেষ করে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। যদিও রোবটটি ফিনিশিং লাইনের কয়েক মিটার আগে রেলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ায় তাকে ফের টেনে তুলতে হয়েছিল, তবুও এর গতি ছিল অবিশ্বাস্য।

গতবার মাত্র ২০টি রোবট অংশ নিলেও এবার ১০০টিরও বেশি রোবট লড়েছে। তবে তারা মানুষের সাথে একই ট্রাকে দৌড়ায়নি, বরং মানুষের সাথে কোনো সংঘর্ষ না হয় সে জন্য সমান্তরাল ট্র্যাকে প্রতিদ্বন্দ্বতা করেছে।

এক বছর আগে যেখানে অধিকাংশ রোবট শুরুর দাগটাই পার হতে পারছিল না, সেখানে এবারের চিত্র ছিল অভাবনীয় রকমের উন্নত। গত আসরের চ্যাম্পিয়ন রোবটটি সময় নিয়েছিল দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিট, যা মানুষের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি মন্থর ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এই আসরে চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি হিউম্যানয়েডগুলো প্রমাণ করেছে যে, তারা এখন পেশাদার অ্যাথলেটদের চেয়েও দ্রুত ছুটতে সক্ষম।

এই দৌড় প্রতিযোগিতার সমান্তরাল ট্র্যাকে রোবটগুলোর শারীরিক সক্ষমতার এমন প্রদর্শন বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, বিপজ্জনক কাজ থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত সবখানেই তারা আমূল পরিবর্তন আনতে তৈরি। চীন এখন এই ফ্রন্টিয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে বিশ্বনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে এবং সেজন্য সরকারি ভর্তুকি থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করেছে।

চীনের এই প্রযুক্তির দাপট কেবল ম্যারাথনের ট্র্যাকেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশটির জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সিসিটিভি স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল গালা অনুষ্ঠানে ইউনিট্রির তৈরি ডজনেরও বেশি হিউম্যানয়েড রোবট শিশুদের সাথে তলোয়ার এবং নানচাকু নিয়ে নিখুঁত মার্শাল আর্ট প্রদর্শন করেছে।

ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ভবিষ্যতে চীনের আধিপত্যের আগাম বার্তা দিচ্ছে এই প্রদর্শনী। কিন্তু এই রোবটগুলোর অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগ এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে, তবুও বেইজিংয়ের এই হাফ-ম্যারাথন প্রমাণ করল যে, মানুষের রক্ত-মাংসের গতির চেয়ে যন্ত্রের ইলেকট্রিক পালস অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

এই অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে ভবিষ্যতে শ্রমবাজার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রোবটদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

হিউম্যানয়েড রোবট : যন্ত্রের শরীরে মানুষের আদল
হিউম্যানয়েড রোবট হলো এমন এক উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র, যা দেখতে এবং আচরণে অবিকল মানুষের মতো। এর শরীর মানুষের মতোই মাথা, ধড়, দু’টি হাত এবং দু’টি পা দিয়ে গঠিত। তবে এর বিশেষত্ব কেবল অবয়বে নয়, বরং এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সেন্সর প্রযুক্তিতে।

এই রোবটগুলো মানুষের মতো হাঁটতে, সিঁড়ি বাইতে, এমনকি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। মানুষের চলাফেরা ও ভারসাম্য রক্ষার জটিল প্রক্রিয়াকে যখন মেকানিক্যাল জয়েন্ট এবং মোটর দিয়ে নকল করা হয়, তখনই তা হয়ে ওঠে একটি হিউম্যানয়েড।

বর্তমানে এই রোবটগুলোতে এমন সব সেন্সর এবং ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা তাদের চারপাশের পরিবেশ বুঝতে সাহায্য করে। ফলে এরা মানুষের সাথে ধাক্কা না খেয়ে কাজ করতে পারে কিংবা কোনো বস্তুকে মানুষের মতোই হাত দিয়ে ধরতে পারে। বেইজিংয়ের ম্যারাথনে আমরা যে অভাবনীয় গতি দেখলাম, তা সম্ভব হয়েছে রোবটগুলোর উন্নত ‘ব্যালেন্সিং অ্যালগরিদম’ এবং শক্তিশালী ‘অ্যাকচুয়েটর’ বা যান্ত্রিক পেশির কারণে।

ভবিষ্যতে এই যন্ত্রমানবরা কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না থেকে কলকারখানা, গৃহস্থালি কাজ, এমনকি মহাকাশ অভিযানেও মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি মূলত প্রকৌশলবিদ্যা ও জীববিজ্ঞানের এক অনন্য মেলবন্ধন, যা রোবটিক্স জগতকে নিয়ে গেছে এক নতুন উচ্চতায়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান