প্রযুক্তির দুনিয়া এখন আর রূপকথার গল্পে সীমাবদ্ধ নেই, বরং মানুষের এক অদ্ভুত সমান্তরাল ছায়া তৈরি হচ্ছে আমাদের কাজের টেবিলে। আমরা যখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন হয়তো আমাদেরই এক ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি ইমেল চালাচালি করছে, ব্যবসায়িক জটিল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বা গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন গুছিয়ে রাখছে।
এমন এক অদ্ভুত বাস্তবের খবর দিয়েছে বিবিসি। এই প্রযুক্তির নাম ‘ডিজিটাল টুইন’ বা ডিজিটাল যমজ। এটি স্রেফ কোনো সাধারণ চ্যাটবট বা এআই নয়, বরং একজন মানুষের জ্ঞান, চিন্তা করার ভঙ্গি, কাজের ধরন ও ব্যক্তিগত পছন্দকে হুবহু নকল করে তৈরি করা এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
এখন আর শুধু মানুষ কাজ করছে না, মানুষেরই তৈরি আরেকটি সত্তা কাজ করছে তার পাশে, কখনো তার জায়গায়, কখনো তার চেয়েও দ্রুত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন এক প্রয়োগ ‘ডিজিটাল যমজ’ বা ডিজিটাল টুইন এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে।
কিভাবে একজন মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা, এমনকি তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ধরন পর্যন্ত কপি করে তৈরি করা হচ্ছে তার ডিজিটাল প্রতিরূপ। ফলে মানুষকে পরিণত করছে এক ধরনের ‘সুপারওয়ার্কার’-এ । কিন্তু এই শক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে কিছু কঠিন প্রশ্ন, কাজের মালিকানা, ব্যক্তিগত পরিচয়, আর মানুষের জায়গা ঠিক কোথায়?
ডিজিটাল যমজ কি- এই প্রশ্নের উত্তরটা বোঝা জরুরি। সহজ করে বললে, এটি আপনারই এক কৃত্রিম সংস্করণ, কিন্তু কোনো স্থির ছবি বা সাধারণ প্রোফাইল নয়। এটি এমন একটি সিস্টেম, যা আপনার কাজের প্রতিটি স্তর বিশ্লেষণ করে আপনি কিভাবে ইমেইল লেখেন, কিভাবে মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেন, কিভাবে সমস্যার সমাধান করেন- সবকিছু শিখে নেয়। তারপর সেই ডেটার ভিত্তিতে তৈরি হয় একটি ছোট ভাষা আদল বা ল্যাঙগুয়েজ মডেল, যা আপনার মতো করে ভাবতে পারে, উত্তর দিতে পারে, এমনকি যুক্তি দাঁড় করাতে পারে। ফলে আপনি না থাকলেও, এই আদল বা মডেল দিয়ে আপনার মতো করেই কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ রিচার্ড স্কেলেট। তিনি তিন বছর ধরে নিজের একটি ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করেছেন ‘ডিজিটাল রিচার্ড’। এটি শুধু একটি সহকারী নয়, বরং তার জ্ঞানের পূর্ণ ভাণ্ডার। ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেয়া, ক্লায়েন্টদের জন্য উপস্থাপনা তৈরি, জটিল বিশ্লেষণ- সবকিছুতেই এটি তাকে সহায়তা করে। এমনকি তার ব্যক্তিগত জীবনের জন্য আলাদা বিভাগ রাখা হয়েছে ‘ফ্যামিলি’ এবং ‘অ্যাডমিন’- যেখানে কর্মক্ষেত্রের লোকজন প্রবেশ করতে পারে না। অর্থাৎ ডিজিটাল যমজ কেবল কাজের জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরেও ঢুকে পড়ছে।
এই ধারণাটি এখন শুধু একজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্কেলেটের প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিভিন্ন টিমে তাদের প্রায় ৫০ জন কর্মীর জন্য ডিজিটাল যমজ তৈরি করেছে। কেউ অবসর নিতে চাইলে ধীরে ধীরে কাজ হস্তান্তর করছে তার ডিজিটাল সংস্করণের কাছে। আবার কেউ মাতৃত্বকালীন ছুটিতে গেলে, অস্থায়ী কাউকে নিয়োগ না দিয়েই তার ডিজিটাল যমজই তার কাজ সামাল দিচ্ছে।
এখান থেকেই উঠে আসে ‘সুপারওয়ার্কার’ ধারণা। অর্থাৎ মানুষের ডিজিটাল সংস্করণ সারাক্ষণ সক্রিয় তাই একজন মানুষ তার স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে কাজ করতে পারছে । আপনি ঘুমাচ্ছেন, কিন্তু আপনার ডিজিটাল যমজ তখনো কাজ করছে। মাঝরাতে কোনো প্রশ্ন এলে সেটি উত্তর দিতে পারে, বিশ্লেষণ করতে পারে, সিদ্ধান্তের খসড়া তৈরি করতে পারে। ফলে কাজ আর সময়ের মধ্যে যে সীমা ছিল, সেটি ভেঙে যাচ্ছে।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে কাজের ধরনে। আগে কোনো প্রকল্পের অবস্থা জানতে হলে মিটিং, কল বা ইমেইলের প্রয়োজন হতো। এখন সরাসরি সেই কর্মীর ডিজিটাল যমজকে প্রশ্ন করলেই উত্তর পাওয়া যাচ্ছে। এতে সময় বাঁচছে, কাজের গতি বাড়ছে এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে।
এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট। কিছু প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে, কিন্তু নতুন কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন কমে গেছে। কারণ বিদ্যমান কর্মীদের ডিজিটাল যমজ তাদের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বেশি বোনাস দিতে পারছে, কারণ প্রত্যেক কর্মীর অর্থনৈতিক মূল্যই বেড়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই গল্পের অন্য দিকটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই ডিজিটাল যমজের মালিক কে? কর্মী, নাকি প্রতিষ্ঠান? যদি কোনো কর্মীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং চিন্তাভাবনা ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি হয়, তাহলে সেটি কি ব্যক্তিগত সম্পত্তি, নাকি প্রতিষ্ঠানের?
এখানেই মতভেদ স্পষ্ট। কেউ বলছেন, কর্মীরই মালিকানা থাকা উচিত। কারণ এটি তার মেধারই প্রতিফলন। আবার কেউ বলছেন, কর্মক্ষেত্রে তৈরি হওয়া সব তথ্যই প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি, তাই ডিজিটাল যমজও তাদেরই হওয়া উচিত। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে মূল প্রশ্নগুলো খুবই গভীর। সম্মতি, ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ, শ্রমের বিকল্প এবং কর্মীর স্বাধীনতা। একজন মানুষের ইমেইল, মিটিং, নথি- সবকিছু দিয়ে যখন একটি কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি হয়, তখন সেটি সরাসরি শ্রম সম্পর্কের কেন্দ্রে আঘাত করে।
আরো একটি বড় ঝুঁকি হলো দায়বদ্ধতা। যদি কোনো ডিজিটাল যমজ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে দায় কার? কর্মীর, যে তার ভিত্তি তৈরি করেছে? নাকি প্রতিষ্ঠানের, যে এটি ব্যবহার করছে? ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে কোনো কর্মী তার ডিজিটাল সংস্করণের ভুলের জন্য শাস্তি পেতেই পারে।
আইনের দিক থেকেও বিষয়টি এখনো অনির্দিষ্ট। স্পষ্ট কোনো নিয়ম নেই, ফলে অনেক ক্ষেত্রে আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কোনো কর্মী যদি তার ডিজিটাল যমজের কারণে চাকরি হারায়, তখন বিচার কিভাবে হবে- এটি এখনো খোলা প্রশ্নই।
আরো একটি সূক্ষ্ম বিষয় হলো মানুষের পরিচয়। যদি আপনার মতো করে চিন্তা করে, আপনার মতো করে কথা বলে, আপনার মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়- এমন একটি সত্তা তৈরি হয়, তাহলে সেটি কি শুধু একটি যন্ত্র, হাতিয়ার বা টুল, নাকি আপনারই এক সম্প্রসারণ? আপনার নাম, আপনার চেহারা, আপনার ভাবমূর্তি- এসব কি তখনো পুরোপুরি আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
সব মিলিয়ে ডিজিটাল যমজ এমন এক প্রযুক্তি, যা একইসাথে সম্ভাবনা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে এসেছে। এটি কাজের গতি বাড়ায়, দক্ষতা বাড়ায়, মানুষের সীমা প্রসারিত করে। কিন্তু একইসাথে এটি প্রশ্ন তোলে- মানুষের কাজের মূল্য কী, তার পরিচয় কোথায়, আর তার নিয়ন্ত্রণ কতটা তার নিজের হাতে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত হয়তো বাস্তবতাটা এমনই দাঁড়াবে- মানুষ আর একা নয়। তার পাশে ছায়ার মতো অবিরাম লেগে থাকবে তারই এক ডিজিটাল সংস্করণ; যা কখনো তাকে দেবে অমানুষিক কাজের গতি, আবার কখনো হয়তো মেধার প্রতিযোগিতায় তাকেই ছাড়িয়ে যাবে। তখন লড়াইটা আর প্রযুক্তির উৎকর্ষ নিয়ে থাকবে না, লড়াইটা হবে খোদ মানুষের অস্তিত্বের।
প্রশ্ন উঠবে, নিজেরই তৈরি করা সেই অতি-মানবিক ডিজিটাল ছায়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষমতা কি এই রক্ত-মাংসের মানুষের আছে? নাকি স্রষ্টাকে ছাপিয়ে সৃষ্টিই হয়ে উঠবে আগামীর আসল ‘সুপারওয়ার্কার’, আর মানুষ পড়ে থাকবে তার নিজেরই তৈরি করা গোলকধাঁধায়!
সূত্র : বিবিসি



