হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি চালকবিহীন আধুনিক পানির নিচের যান বা ড্রোন উদ্ধার করার দাবি করেছে ইরান। ‘ডাইভ-এলডি’ নামের এই বড় আকারের পানির নিচের ড্রোনটি কারিগরি ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে পড়ার পর তেহরান তা প্রায় অক্ষত অবস্থায় আটক করে। ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এ দাবি ওয়াশিংটনের। যাই হোক, ঘটনাটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক ড্রোন প্রযুক্তির সুরক্ষায় এক বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী বা আইআরজিসি বিবৃতিতে বলা হয়, এক জটিল গোয়েন্দা ও সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আধুনিক, চালকবিহীন ও চৌকস ডুবোজাহাজ আটক করেছে। পরবর্তীতে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে পানিতে ভেসে থাকা ও ক্রেন দিয়ে তুলে আনার বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ডাইভ-এলডি ড্রোনের গায়ে থাকা প্রতীক ও চিহ্ন দেখে যানটির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

মার্কিন চিফ অফ নেভাল অপারেশনস অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল(ডানে)কে একটি ‘ডাইভ-এলডি’ ডুবোজাহাজ ড্রোন দেখানো হচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তা ও ড্রোনটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল এ অঞ্চলে একটি ডাইভ-এলডি হারানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তার দাবি, পানির নিচে আঞ্চলিক জরিপ চালানোর সময় ড্রোনটি বিকল হয়ে যায়। এটি একটি পুরোনো মডেলের প্রযুক্তি। এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য বা গোপন সোনার ও রাডার সরঞ্জাম ছিল না। সোনার হচ্ছে পানির নিচে শব্দতরঙ্গ পাঠিয়ে অলক্ষ্যের বস্তু বা সমুদ্রের তলদেশ শনাক্ত করার এক বিশেষ প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি প্রধানত সামুদ্রিক নজরদারি ও অনুসন্ধান তৎপরতায় ব্যবহৃত হয়। অ্যান্ডুরিলের প্রতিনিধি জানান, ডাইভ-এলডি এমন একটি সাশ্রয়ী ও ঝুঁকি নেওয়ার মতো প্রযুক্তি হিসেবে নকশা করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাসদস্যদের জীবন রক্ষায় এটি ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সদর দপ্তর সেন্টকমের অধীনে ডাইভ-এলডি হাজার হাজার ঘণ্টা সফলভাবে কাজ করেছে।

ইরানের প্রকাশিত আটক ডাইভ এলডির ছবি
ডাইভ-এলডি মূলত ডাইভ টেকনোলজিসের প্রস্তুতকৃত এবং পরবর্তীতে অ্যান্ডুরিল হাতে উন্নত একটি বড় আকারের চালকবিহীন পানির নিচের যান। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫.৮ মিটার, ব্যাস ১২ মিটার এবং ওজন প্রায় ৩ টন। এটি ৩ডি প্রিন্টেড বহিরাবরণ দিয়ে তৈরি এবং সমুদ্রের প্রায় ৬ হাজার মিটার (১৯,৬৮৫ ফুট) গভীরে কাজ করতে সক্ষম। বিন্যাসভেদে এটি টানা ১০ দিন পর্যন্ত আত্মনিয়ন্ত্রিতভাবে বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে সমুদ্রে অবস্থান করতে পারে। এই যানটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, পানির নিচে নজরদারি, নৌমাইন শনাক্তকরণ ও অপসারণ এবং সমুদ্রতলের নিখুঁত মানচিত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় মার্কিন নৌবাহিনী সেখানে মাইন পরিষ্কার অভিযান পরিচালনা করছিল। এই অভিযানে ডাইভ-এলডির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রতলে কৌশলগত জরিপ সম্পন্ন করার কাজেও এটি ব্যবহৃত হতো।
যানটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক গোপনীয় প্রযুক্তিতে ঠাসা নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। তারপরও সাগর তলদেশের চালকহীন যান ইরানের হাতে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান দীর্ঘদিন ধরে আটককৃত বিদেশি প্রযুক্তি বিশেষ করে মার্কিন ড্রোন রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং বা উল্টো প্রকৌশলের মাধ্যমে নিজস্ব প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে আসছে। ২০১১ সালে মার্কিন আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেল ড্রোন আটকের ঘটনা এর বড় প্রমাণ। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজস্ব ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মিত্র দেশ রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে এই তথ্য ভাগাভাগি করতে পারে, যারা নিজস্ব ডুবোজাহাজ ড্রোন তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে।
এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মাঝে ইরানের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রচারণামূলক সাফল্য এনে দিয়েছে। একই সাথে, সমুদ্রসীমায় চালকবিহীন যুদ্ধপ্রযুক্তির ব্যবহার যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি তা প্রতিপক্ষের হাতে ধরা পড়ার ঝুঁকিও যে বহুগুণ বেড়ে গেছে, এই ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।



