'কাজ না করলেও অসুবিধা নেই। কিন্তু ব্যস্ততা যেন কম না থাকে।' বেসরকারি খাতের এক বন্ধু কথাটা প্রায়ই বলতেন। কর্মজীবনে সিঁড়ি বেয়ে অনেক দূর উঠেছিলেন তিনি। হয়তো কোভিডে অকালমৃত্যু না হলে নিজেই বিশাল কিছু করতেন। তখন কথাটা ছিল কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা নিয়ে এক ধরনের রসিকতা। কিন্তু এআইয়ের যুগে এসে সেই কথাই যেন নতুন অর্থ পেয়েছে—কাজের ফলাফলের পাশাপাশি আপনি কতটা ব্যস্ত দেখাচ্ছেন, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কর্মীদের কাজের সময় কীভাবে কাটছে, তা নজরদারিতে এখন ক্রমেই বেশি ব্যবহার হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক প্রযুক্তি। এসব ব্যবস্থায় শুধু বিক্রির ফলাফল বা কাজের পরিমাণের মতো প্রাসঙ্গিক তথ্যই নয়, কর্মী কতবার কিবোর্ডে চাপ দিচ্ছেন, কিংবা কম্পিউটারের পর্দা কতবার ঘুমিয়ে যাচ্ছে—এমন প্রশ্নবিদ্ধ সূচকও ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভালো কর্মী হওয়াই যথেষ্ট নয়; এখন এআইয়ের চোখেও নিজেকে ভালো কর্মী হিসেবে তুলে ধরতে হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জানিয়েছে, কর্মী নজরদারি ব্যবস্থা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। অন্যান্য সাদা-কলারের প্রতিষ্ঠানও কর্মীরা অফিসের সময় কীভাবে ব্যয় করছেন, তা বোঝার জন্য এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক অঙ্গরাজ্যে কর্মীদের জানানো বাধ্যতামূলক নয় যে তাদের ওপর নজরদারি চলছে।
বাড়ি থেকে কাজের সময় কর্মীদের ওপর বাড়তি নজরদারি মোটামুটি মেনে নেয়া হয়েছিল। অন্তত তখন এর কারণটা বোঝা যেত। কর্মীরা যখন বসের চোখের সামনে নেই, তখন তারা কী করছেন, তা জানার প্রয়োজন রয়েছে—এমন যুক্তি ছিল। কিন্তু সেই নজরদারি থেমে থাকেনি। বরং কর্মক্ষেত্রে তা আরো বিস্তৃত, পরিশীলিত ও স্পর্শকাতর হয়েছে। সাথে বেড়েছে কর্মীদের অস্বস্তিও। এখন বসের চোখের বদলে অনেক ক্ষেত্রে কর্মীর কাজের ওপর নজর রাখছে অ্যালগরিদম।
মেটার সাবেক একদল কর্মী মামলায় অভিযোগ করেছেন, মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই শুরু করার সময় 'এআইভিত্তিক অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক' ব্যবহার করেছিল। তবে মেটা বলেছে, কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত মানুষই নেয়।
মামলাটির শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—কোন কর্মী কাজে কতটা মনোযোগী, তা মাপতে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর হাতে এখন অত্যাধুনিক এআই নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে। একই সাথে তারা মনে করছে, মন্থর শ্রমবাজারে কর্মীদের ওপর তাদের প্রভাবও বেশি।
তাই বসের উৎপাদনশীলতার ড্যাশবোর্ডে নিজের কাজের মূল্য কয়েকটি সংখ্যায় নেমে আসায় কর্মীদের যতই অস্বস্তি হোক, বাস্তবতা মেনে নিয়ে এই খেলায় কৌশলী হওয়া ছাড়া উপায় কম। কর্মী নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করেন এমন ব্যক্তি এবং এসব ব্যবস্থাকে কৌশলে সামলান এমন কর্মীদের সাথে কথা বলে কিছু পরামর্শ দিয়েছে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল।
ক্যালেন্ডারে সবকিছু লিখে রাখুন
কর্মী নজরদারি ব্যবস্থাকে আরো উন্নত ও আপাতদৃষ্টিতে ন্যায্য করার একটি উপায় হলো ক্যালেন্ডারের সাথে এর সংযোগ।
ধরা যাক, আপনি পুরোনো ধাঁচে ফোনে কথা বলছেন কিংবা অফিসে সরাসরি কোনো বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। তখন আপনার আউটলুক বা স্ল্যাকের স্ট্যাটাস 'দূরে' দেখাতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় কফি খেতে যাওয়ার মতোই আপনাকে নিষ্ক্রিয় মনে হতে পারে।
ইনসাইটফুলের মতো কর্মী নজরদারি ব্যবস্থা আপনার অনলাইন স্ট্যাটাসের সাথে ক্যালেন্ডারের তথ্য মিলিয়ে দেখে, নিষ্ক্রিয় থাকার যথার্থ কারণ আছে কি না। ফোনকল বা বৈঠকটি যদি ক্যালেন্ডারে লেখা থাকে, তাহলে সিস্টেম বুঝবে আপনি অনলাইনে না থাকলেও কাজে ব্যস্ত। কিন্তু ক্যালেন্ডারে কিছু না থাকলে সেটি আপনাকে কাজ ফাঁকি দেয়া কর্মী হিসেবে দেখাতে পারে।
কাজের সক্রিয়তা ৬০–৮০ শতাংশ রাখুন
কর্মদিবসে কতটা সময় কাজের বাইরে থাকা স্বাভাবিক—এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত কম্পিউটার অফিসে আসার পর থেকেই কর্মীরা ভয় পেয়ে আসছেন, বস যেন তাদের পর্দায় কাজের বাইরের কিছু না দেখেন।
এ বিষয়ে রজার ওয়াগনারের অভিজ্ঞতা পুরোনো। আশির দশকের শুরুতে প্রথম 'বস বাটন' তৈরির কৃতিত্ব ব্যাপকভাবে তাকে দেয়া হয়। বস কিউবিকলের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে কম্পিউটার গেম খেলার বদলে মুহূর্তেই স্প্রেডশিট দেখানোর জন্য তিনি একটি কিবোর্ড শর্টকাট তৈরি করেছিলেন। পরে অসংখ্য বিনোদনমূলক সফটওয়্যারে এ ধরনের ব্যবস্থা যুক্ত হয়।
কম্পিউটার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১০১০ টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াগনার বলেন, তার তৈরি ব্যবস্থাটি ছিল মূলত একটি রসিকতা—অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণপ্রবণ ব্যবস্থাপকদের নিয়ে মন্তব্য, অলস কর্মীদের আড়াল করার কৌশল নয়। তার মতে, ভালো বসেরা বোঝেন যে কর্মীদের দিনের মধ্যে মানসিক বিরতি প্রয়োজন।
ইনসাইটফুলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইভান পেত্রোভিচও একই কথা বলেছেন। তার প্রতিষ্ঠানের কর্মী ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা কোম্পানিগুলো কর্মীদের শতভাগ সময় কাজে ব্যস্ত থাকার প্রত্যাশা করে না।
তিনি বলেন, 'গড়ে কোম্পানিগুলো চায়, দিনের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ সময় আপনার কাজের জন্য ব্যবহার হোক।'
অর্থাৎ ডেস্কে বসে মাঝেমধ্যে ইউটিউবের একটি ভিডিও দেখলেও সম্ভবত সমস্যা নেই। তবে কৃত্রিমভাবে নিজের সক্রিয়তার হার বাড়াতে গেলে সতর্ক থাকতে হবে। ৯০ শতাংশ সক্রিয়তা বরং সন্দেহজনক দেখাতে পারে।
মাউস জিগলার ব্যবহারেও সতর্কতা
সারাদিন মাউস জিগলার চালু রাখার দরকার নেই। কেউ যদি এমন কৌশল নিতেই চান, তাহলে কোনটি ব্যবহার করছেন, সে বিষয়েও সতর্ক হতে হবে।
এমন অনেক সফটওয়্যার আছে, যেগুলো কম্পিউটার মাউসের নড়াচড়া অনুকরণ করে। এতে ডেস্ক থেকে দূরে থাকলেও মনে হতে পারে কর্মী কাজ করছেন। আবার কম্পিউটারের পোর্টে লাগানো যায় এমন যন্ত্রও আছে, যেগুলো একই কাজ করে।
করপোরেট সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমেই এসব সফটওয়্যার ও যন্ত্র আটকে দিচ্ছে। কর্মী নজরদারি ব্যবস্থাগুলোও এগুলো শনাক্ত করতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে কিছু কর্মী টেকএইট ইউএসএর তৈরি মাউস ডকের মতো যন্ত্র ব্যবহার করেন, যা কার্সর নড়াচড়া করিয়ে রাখে।
টেকএইটের বিপণন পরিচালক স্যাম ম্যাথিউজ বলেন, 'মানুষ যান্ত্রিক সমাধানের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কারণ এগুলো খুব সহজ এবং সফটওয়্যার প্রয়োজন হয় না।' নজরদারি প্রযুক্তি আরো উন্নত হওয়ায় এই পার্থক্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলেও জানান তিনি।
এআই ব্যবহার করুন, তবে মাত্রাতিরিক্ত নয়
কর্মী নজরদারি ব্যবস্থার আরেকটি জনপ্রিয় সূচক হলো এআই ব্যবহার। প্রতিষ্ঠানগুলো জানতে চায়, কারা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন। ফলে বেশি এআই ব্যবহার করলেই বেশি ভালো কর্মী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ধারণা তৈরি হতে পারে।
কর্মীদের কাজের অভ্যাস বিশ্লেষণে সহায়তা করা প্রতিষ্ঠান ভিজিয়েরের প্রধান গবেষক আন্দ্রেয়া ডারলার বলেন, 'এক ধরনের প্রদর্শনীর প্রবণতা আছে, যেখানে কর্মীরা নিজেদের এআই ব্যবহারের মাত্রা বাড়িয়ে বলেন, যাতে প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রাসঙ্গিক হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।'
ভিজিয়েরের এক হাজার মার্কিন কর্মীর ওপর করা সাম্প্রতিক এক জরিপে ৪৮ শতাংশ স্বীকার করেছেন, তারা নিজেদের এআই ব্যবহারের মাত্রা বাড়িয়ে বলেছেন।
তবে এই কৌশলও দ্রুত পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। একসময় সব কাজে এআই ব্যবহার করাকে নতুন কিছু করার আগ্রহ হিসেবে দেখা হতো। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহারে খরচ হওয়া টোকেনের হিসাব আরো সতর্কভাবে দেখছে। ফলে শুধু বেশি এআই ব্যবহার করলেই যে নিজেকে বেশি কর্মঠ বা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলা কর্মী হিসেবে তুলে ধরা যাবে, তা নয়। অপ্রয়োজনীয় এআই ব্যবহার বরং অপচয় হিসেবেও দেখা হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততা দেখানো বা উৎপাদনশীলতার একটা চেহারা তৈরি করা অবশ্য নতুন কিছু নয়। আমার সেই বন্ধুর কথার মতো—কাজ না করলেও চলে, কিন্তু ব্যস্ততা যেন কম না থাকে। পার্থক্য হলো, তখন এই ব্যস্ততা দেখার দায়িত্ব ছিল মানুষের; এখন সেই কাজটিই অনেক ক্ষেত্রে করছে এআই। আর কর্মীর ব্যস্ততার হিসাবও তৈরি হচ্ছে কিবোর্ডের চাপ, মাউসের নড়াচড়া, পর্দায় সক্রিয়তা কিংবা এআই ব্যবহারের মতো নানা সংখ্যায়।
তাই এআইয়ের যুগে কর্মীদের সামনে চ্যালেঞ্জটা শুধু ভালো কাজ করা নয়, সেই কাজটি কীভাবে নজরদারি ব্যবস্থার চোখে ধরা পড়ছে, সেটিও বোঝা। অধিকাংশ মানুষ ব্যবস্থা ঠকানোর চেষ্টা করছেন না। কিন্তু প্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রের প্রত্যাশা এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে, নিজের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি পেতে কখনো কখনো একটু কৌশলী হওয়ার প্রয়োজন পড়ছে। সেই অর্থে, বহু বছর আগে বন্ধুটির বলা কথাটিই হয়তো এখন নতুন করে বলা যায়—কাজের পাশাপাশি ব্যস্ততাটাও যেন কম না থাকে।



