পৃথিবীকে বাঁচাতে চীনের মহাকাশ পাহারা: আসছে শক্তিশালী গ্রহাণু সতর্কবার্তা ব্যবস্থা

মহাকাশ বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে আমরা 'প্ল্যানেটারি ডিফেন্স' বা গ্রহ প্রতিরক্ষা বলি, চীন এখন সে বিদ্যাতেই নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে বড় কোনো মহাজাগতিক সংঘর্ষের আশঙ্কা অত্যন্ত ক্ষীণ। তারপরও বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

সৈয়দ মূসা রেজা
পৃথিবী ও ধেয়ে আসা গ্রহাণুর কাল্পনিক ছবি
পৃথিবী ও ধেয়ে আসা গ্রহাণুর কাল্পনিক ছবি |সংগৃহীত

আসমানি বিপদ ও বেইজিংয়ের নতুন প্রস্তুতি

'স্বরে অ-তে অজগর ওই আসছে তেড়ে'— ছোটবেলায় এই ছড়া অনেকেরই মনে থাকার কথা। তবে বাস্তব অজগর কিংবা অন্য কোনো সাপকে ঘাটানো না হলে কখনো নিজে থেকে তেড়ে আসে না। কিন্তু মহাকাশ থেকে কোনো নোটিশ ছাড়াই তেড়ে আসে আসমানি বিপদ গ্রহাণু বা অ্যাস্টেরয়েড। কোটি কোটি বছর আগে ডাইনোসরদের মরণ ঘটেছিল ঠিক এ রকমই এক তেড়ে আসা গ্রহাণুর আঘাতেই। মহাজাগতিক সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রুখতে এবার পৃথিবীর আকাশে এক বিশাল পাহারা বা আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে চীন।

ডেইলি গ্যালাক্সি জানিয়েছে, বিজ্ঞান ও গল্পের চমৎকার মেলবন্ধনে এই জটিল বিষয়টি সামনে এনেছেন বিজ্ঞান প্রতিবেদক লিডিয়া আমাজুজ। ইংরেজি ও যোগাযোগ বিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রিধারী লিডিয়া জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাকে সহজ ও আকর্ষণীয় গল্পে রূপ দিতে দারুণ পারদর্শী। তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পৃথিবীর সুরক্ষায় বৈশ্বিক উদ্যোগকে আরো গতিশীল করতে চীনের এই নতুন পদক্ষেপের কথা। মূলত পৃথিবীর কক্ষপথের কাছাকাছি থাকা গ্রহাণুগুলোর ঝুঁকি দ্রুত মূল্যায়ন করা এবং যেকোনো মহাজাগতিক বিপর্যয় রুখে দিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোই বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য।

অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা গ্রহাণু ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

মহাকাশ বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে আমরা 'প্ল্যানেটারি ডিফেন্স' বা গ্রহ প্রতিরক্ষা বলি, চীন এখন সে বিদ্যাতেই নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে বড় কোনো মহাজাগতিক সংঘর্ষের আশঙ্কা অত্যন্ত ক্ষীণ। তারপরও বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। চীনা রাষ্ট্রীয় মাধ্যম সিনহুয়া তাদের দেশের বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আগামী দিনে কোনো গ্রহাণু নিশ্চিতভাবে পৃথিবীতে আঘাত করবে এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এই উদ্বেগকে মোটের ওপর উড়িয়ে দেয়া যায় না। আসল সংকট হলো, মহাকাশের বহু বিপজ্জনক গ্রহাণু এখনো মানুষের নজরদারির বাইরে রয়ে গেছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যেসব গ্রহাণু সরাসরি সূর্যের দিক থেকে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে কিংবা যাদের পৃষ্ঠভাগ কুচকুচে অন্ধকার, তারা খুব কম আলো প্রতিফলিত করে। ফলে পৃথিবীর সাধারণ কোনো অপটিক্যাল টেলিস্কোপে এদের ধরা মুশকিল। এই লুকানো বিপদ আগেভাগে জানতেই চীন দূরপাল্লার ওয়াইড-ফিল্ড টেলিস্কোপ, রাডার পর্যবেক্ষণ, ইনফ্রারেড প্রযুক্তি ও জটিল অরবিটাল মডেলের এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। ভবিষ্যতে এই মহাকাশ-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু হলে ভূপৃষ্ঠের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠা অনেক সহজ হবে।

মহাজাগতিক যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক ডেটার উন্মুক্ত আকাশ

মহাকাশের কোনো গ্রহাণু যখন ধেয়ে আসে, তখন সে কোনো নির্দিষ্ট দেশের জাতীয় সীমানা বা ভৌগোলিক মানচিত্র চিনে আসে না। আঘাতটা পুরো মানবজাতির ওপরই আসে। তাই এই গ্রহাণু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এক মহাদেশের পর্যবেক্ষণ যখন অন্য মহাদেশের মহাকাশযানের ডেটার সাথে মিলে যায়, তখনই কেবল গ্রহাণুর সঠিক গতিপথ হিসাব করা সম্ভব।

খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী কিরসি ভিরকি এই বিষয়ে চীনের ভূমিকার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, চীনের এই মিশন তখনই সত্যিকারের মূল্যবান হয়ে উঠবে, যখন এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশগুলোর চলমান কার্যক্রমের স্রেফ পুনরাবৃত্তি না করে নতুন কোনো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যোগ করবে। ভিরকি আশা প্রকাশ করেন, চীন তাদের নতুন এই শক্তিশালী টেলিস্কোপ নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া সমস্ত অরবিটাল পরিমাপ বা ডেটা শুধু নিজেদের বিজ্ঞানীদের মধ্যে আটকে রাখবে না। তারা আন্তর্জাতিক মহলে সবার সাথে এই তথ্য উন্মুক্তভাবে ভাগ করে নেবে, যাতে বিশ্বজুড়ে স্বাধীন গবেষক দলগুলো গ্রহাণুর আঘাতের সুনির্দিষ্ট তথ্য যাচাই করতে পারে। তবেই পৃথিবীর সুরক্ষায় কোনো দিপক্ষীয় সীমানা না রেখে মানবজাতি একজোট হয়ে মহাকাশের এই আসন্ন দানবদের রুখে দিতে পারবে।

নিরাপদ পৃথিবীর অপেক্ষা

মহাকাশের এই তেড়ে আসা গ্রহাণুকে যদি সত্যিই বিজ্ঞানের জোরে রোখা সম্ভব হয়, তবেই কেবল সেই শিশু পাঠের চিরচেনা 'স্বরে আ-তে আমটি আমি খাবো পেড়ে'র স্বপ্নগুলো প্রতিটি শিশুর জীবনে ঘটতে পারে নিরাপদে। একদম আশঙ্কাহীন এক শান্ত পৃথিবীতে।