টাকার বিনিময়ে কওমি-ছাত্রদের কোরবানি ঈদের ছুটি ও কিছু কথা

যদিও কওমি মাদরাসার ওপর এই দায়িত্ব কেউ চাপিয়ে দেয়নি, কিন্তু যেহেতু প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক কওমের (জাতি-সমাজ) সাথে এবং তাদেরই সবরকমের সাহায্য-সহযোগিতায় মাদরাসাগুলো পরিচালিত হয়, তাই মাদরাসা কর্তৃপক্ষই দীর্ঘ পরম্পরা ও ঐতিহ্যগতভাবে নিজেরাই এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

বেলায়েত হুসাইন
জাতির সাহায্যার্থে কওমি মাদরাসার ছাত্ররা কোরবানির পশু জবাই করেন
জাতির সাহায্যার্থে কওমি মাদরাসার ছাত্ররা কোরবানির পশু জবাই করেন |প্রতীকী ছবি

পবিত্র ঈদুল আজহা আসন্ন। কোরবানি ঈদ নামে প্রসিদ্ধ মুসলমানদের দ্বিতীয় প্রধানতম এই উৎসব উপমহাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে ভিন্ন আবহে হাজির হয়। ঐতিহ্যগতভাবে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে মাদরাসাগুলোতে নানা কার্যক্রম থাকে; তার অন্যতম মাদরাসার জন্য কোরবানিকৃত পশুর চামড়া সংগ্রহ করা। যার মাধ্যমে মাদরাসাগুলো আর্থিকভাবে উপকৃত হয়।

খোলা চোখে এটিই একমাত্র কারণ ও লক্ষ্য দেখা গেলেও এর আরো বড় একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে- সমাজের মানুষকে শরয়ীভাবে কোরবানি সম্পাদনে সাহায্য করা। আর সেটি সম্পাদিত হয় কোরবানির পশু সুন্নাহভিত্তিক ও সহিহভাবে জবাই দেয়ার মাধ্যমে। এই কাজটি সম্পাদন করেন সাধারণত কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা।

যদিও কওমি মাদরাসার ওপর এই দায়িত্ব কেউ চাপিয়ে দেয়নি, কিন্তু যেহেতু প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক কওমের (জাতি-সমাজ) সাথে এবং তাদেরই সবরকমের সাহায্য-সহযোগিতায় মাদরাসাগুলো পরিচালিত হয়, তাই মাদরাসা কর্তৃপক্ষই দীর্ঘ পরম্পরা ও ঐতিহ্যগতভাবে নিজেরাই এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

এজন্য প্রতি কোরবানির ঈদেই রাজধানীসহ দেশের সকল শহর; এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা অন্তত দু’টি দায়িত্ব আঞ্জাম দেন; জাতির সাহায্যার্থে কোরবানির পশু জবাই করেন এবং মাদরাসার স্বার্থে সংগ্রহ করেন কোরবানিকৃত পশুর চামড়া।

কিন্তু এখানে আরেকটি বিষয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে, ঈদুল আজহা মুসলমানদের দ্বিতীয়তম প্রধান উৎসব হলেও কওমি মাদরাসার বিরাট সংখ্যক ছাত্র-শিক্ষক সেটি উপভোগ ও উদযাপন করতে পারেন না; বরং ঈদের দিন মাদরাসার কাজ করে সাধারণত পরের দিন তাদের বাড়ি যেতে হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দ্বীনি দায়িত্ব ও মাদরাসার দায়িত্ব হিসেবে স্বতঃফূর্তভাবেই তারা এতে সাড়া দেন।

এখানে আরো একটি বিষয় এই যে, দেশের বড় বড় অনেক কওমি মাদরাসা আছে, যেগুলোর সকল ছাত্রকে কোরবানির কাজে লাগানো হয় না কিংবা লাগানো যায় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়- কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সংখ্যক ছাত্র রেখে বাকিদের ‘বিশেষ শর্তে’ ছুটি দিয়ে দেন। সেই শর্ত হলো- মাদরাসাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দানের মাধ্যমে ছুটি গ্রহণ করা। মানে- যারা মাদরাসায় থাকবেন, তারা কাজ করবেন এবং যারা বাড়িতে যাবেন, তারা মাদরাসায় অর্থ সহায়তা করবেন।

তবে এই পদ্ধতি কতটুকু সঠিক ও জায়েজ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কওমি মাদরাসাগুলো যে প্রতিষ্ঠানটির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়- সেই ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দই এটিকে নাজায়েজ ফতোয়া দিয়েছে। একইসাথে উপমহাদেশের আরেক প্রখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া আল্লামা ইউসুফ বানুরী টাউন করাচিও সেটিকে সমর্থন করেছে। বানুরী টাউনের ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ‘কোরবানিতে যে সকল ছাত্র চামড়া সংগ্রহের কাজ না করে ছুটি নিতে চান, এর বিনিময়ে তাদের থেকে টাকা নেয়া শরয়ীভাবে জায়েজ নেই।’ তাই আমাদের দেশের কওমি মাদরাসাগুলোও এটি বিবেচনা করতে পারে।

উল্লেখিত বিষয়টির সমাধান শরয়ীভাবেও খোঁজা যায়। প্রথমত, ছাত্রদের মাঝে কাজ ভাগ করে দেয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে যারা এই বছর কোরবানির কাজ করবেন, তারা আগামী বছর ছুটি পাবেন, আর যারা এই বছর ছুটি নেবেন, তারা আগামী বছর কাজ করবেন। কিন্তু যেহেতু পরের বছর ওই ছাত্ররা নাও থাকতে পারেন, তাই এটির বাস্তবায়ন সম্ভব নাও হতে পারে।

সেক্ষেত্রে এটাও করা যেতে পারে যে, অনেক ক্ষেত্রে মাদরাসার ক্লাসরুম-টয়লেটসহ কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ ছাত্ররা নিজেরাই করে থাকেন, এমন পরিস্থিতিতে বছরের শুরুতেই ছাত্রদের দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে যে, যারা কোরবানির কাজ করবেন, তাদের পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হবে না, আর যারা পরিচ্ছন্নতার কাজ করবেন, তাদের কোরবানির কাজ করতে হবে না। চিন্তা করলে এভাবে আরো একাধিক পদ্ধতি বের করা যাবে।

মোটকথা- ছুটি নিতে অর্থ বিনিময় বাধ্যতামূলক করা শরয়ীভাবে নাজায়েজ। কারণ, ছুটি নিজে কোনো ‘মাল-সম্পদ’ নয়, যা বিক্রি করা যাবে। তাই ফুকাহায়ে কেরাম এ ধরনের শর্তযুক্ত অর্থ গ্রহণকে বৈধ বলেননি। এজন্য মাদরারাসার নেজাম, কোরবানির খেদমত এবং ছাত্রদের প্রতি ইনসাফ- এই তিনটি বিষয় একসাথে রক্ষা করতে বৈধ ও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। আমীন