বহুবিবাহের নামে চলা ফ্যান্টাসি শরীয়তের মেজাজের সাথে সাংঘর্ষিক

মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া

শরীয়ত কোনো প্রবৃত্তি-তাড়িত ভোগবাদী সংস্কৃতির অনুমোদন দেয় না। একটি বৈধ বিষয় পালন করতে গিয়ে তারা স্বামীর দায়িত্ব, স্ত্রীর হক, সবর ও সংযম, ইহসান, মানবিকতা ও নৈতিকতা ভুলে যাচ্ছে। কোনো কিছু কেবল জায়েজ বা হালাল হলেই তা সর্বাবস্থায় গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না, এই পরিমাণ সুস্থ রুচিবোধ তাদের নেই।

লেখক মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া
লেখক মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া |সংগৃহীত

সম্প্রতি কিছু লেবাসধারী অপরিপক্ব অর্বাচীন বহুবিবাহের বিধানটিকে তামাশার বস্তু বানিয়ে ফেলেছে। শরিয়তের এই বৈধ বিষয়টিকে ব্যক্তিগত প্রমোদ ও নিজের প্রবৃত্তি পূরণের হাতিয়ার বানিয়েছে। তারা যেভাবে নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বহুবিবাহকে বিনোদন ও ফ্যান্টাসি আকারে উপস্থাপন করছে, তা শরীয়তের মেজাজের সাথে সাংঘর্ষিক।

শরীয়ত কোনো প্রবৃত্তি-তাড়িত ভোগবাদী সংস্কৃতির অনুমোদন দেয় না। একটি বৈধ বিষয় পালন করতে গিয়ে তারা স্বামীর দায়িত্ব, স্ত্রীর হক, সবর ও সংযম, ইহসান, মানবিকতা ও নৈতিকতা ভুলে যাচ্ছে। কোনো কিছু কেবল জায়েজ বা হালাল হলেই তা সর্বাবস্থায় গ্রহণযোগ্য বা পালনযোগ্য হয়ে যায় না, এই পরিমাণ ‘যাওকে সালিম’ বা সুস্থ রুচিবোধ তাদের নেই।

মানবসমাজে বহুবিবাহ আদিকাল থেকেই প্রচলিত একটি সামাজিক প্রথা। ইতিহাসে বিভিন্ন সমাজে অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যায় স্ত্রী রাখার রীতি ছিল, ইসলাম এটিকে নিয়ন্ত্রিত ও সীমাবদ্ধ করেছে। ইসলাম সর্বোচ্চ চারজন পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ করে কঠোরভাবে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের শর্ত আরোপ করে দিয়েছে।

কোরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে- ইনসাফ করতে না পারলে একটিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।

তারা জোরেশোরে প্রচার করে যে, সকল নবীই একাধিক বিয়ে করেছেন, অথচ এ দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। একটি অপ্রমাণিত বিষয়কে নিজেদের স্বার্থে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করে যাচ্ছে।

একইভাবে তারা গোপনে বিয়েকে প্রমোট করে। যদিও ফকিহদের মতে ইজাব-কবুল, মোহর ও সাক্ষীর মতো মৌলিক শর্ত পূরণ হলে বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যায়; তবে তা গোপন রাখা শরীয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় এবং নানাভাবে সমস্যাজনক। কারণ, এতে পূর্বের স্ত্রীর অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, পারিবারিক অবিশ্বাস তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে উত্তরাধিকার, সন্তানের পরিচয় ও সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ কারণেই শরীয়ত বিয়েকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে যথাযথ সামাজিক রীতি অনুসরণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে।

সমাজে বহুবিবাহের অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা আছে। বিশেষত স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা নারী, এতিম ও অসহায়দের দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখে।

ইসলাম নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে বিশেষ শর্তাবলির সাথে বহুবিবাহকে বৈধ করেছে, কিন্তু এটি কোনো আবশ্যিক বিধান নয়। নবীকন্যা হযরত ফাতিমা রা: জীবিত থাকা অবস্থায় হজরত আলী রা: দ্বিতীয় বিয়ের উদ্যোগ নিলে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন, আম্মাজান হজরত খাদিজা রা: জীবিত থাকতে তিনি নিজেও দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। নববী এই মেজাজ দ্বারা বুঝে আসে, ‘নিছক বিয়ের জন্য’ বহুবিবাহ কোনো পছন্দনীয় বা উৎসাহিত করার মতো বিষয় নয়।

ইসলামে বিয়ে ও পরিবারব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক। কিন্তু তাই বলে বর্তমানে আলেম পরিচয়ের কিছু লোক যেভাবে এর আড়ালে নিজেদের ফ্যান্টাসি পূরণ করছে, পারিবারিক বলয়ে এর সাথে তার সাথে একের পর এক বিয়ে করে যাচ্ছে, একজনকে তালাক দিয়ে অন্যজনকে ঘরে তুলছে, এসব কিছু কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সামাজিক নৈতিকতা, মানবিকতা, স্ত্রীর অনুভূতি ও তার প্রতি সহমর্মিতার কোনো তোয়াক্কা না করে কেবল বহুবিবাহের বৈধতার দলিল হাজির করা দায়িত্বশীল দ্বীনি আচরণ হতে পারে না।

শরীয়ত বহুবিবাহের অনুমতির সাথে সাথে ইনসাফ, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও তাকওয়ার কথাও বলেছে। স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখা, তার মনে কষ্ট না দেয়া, ধৈর্য ও সংযম অবলম্বন করা, এ সবই নববী শিক্ষার অংশ। দ্বীনের বিধানকে প্রবৃত্তির পক্ষে ব্যবহার না করে শরীয়তের মেজাজ ও সামাজিক নৈতিকতার প্রতি লক্ষ্য রাখাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।

লেখক : মুহতামিম, জামিয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদ, ঢাকা