ইসলামে ৪ বিবাহের বৈধতা ও সীমারেখা

মুফতি জহির রায়হান

ইসলাম পুরুষকে ‘চারটি বিয়ে করার অধিকার’ দেয়নি; বরং ন্যায়বিচার-ভিত্তিক দায়িত্বের বোঝা দিয়েছে। ন্যায়, দায়িত্ব, আর্থিক সামর্থ্য, আবেগিক পরিপক্বতা, নৈতিক জবাবদিহি—এসবের সমন্বয় ছাড়া চার বিবাহ সম্ভব নয়, বৈধও নয়।

প্রতীকী ছবি

শুরুতেই একটি মৌলিক সত্য
মানবসভ্যতার বিবর্তন যত গভীরে গেছে, ততই পরিবার, সম্পর্ক, নারীর নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি এবং দায়িত্ববোধ—এগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন প্রশ্ন উঠেছে। বিবাহপ্রথা মানবীয় আচরণের কেন্দ্রবিন্দু। আর সেই বিবাহপ্রথাকে ইসলামে যে কাঠামো, শৃঙ্খলা ও নৈতিক সুরক্ষা দেয়া হয়েছে, তা পৃথিবীর কোনো সভ্যতাই এত সূক্ষ্মভাবে দিতে পারেনি। চার বিবাহের প্রসঙ্গটি সেই কাঠামোরই একটি ছোট অংশ—কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত।

এটি শুধু অনুমতির বিষয় নয়; বরং ন্যায়, দায়িত্ব, নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং মানবসমাজের জটিল বাস্তবতার প্রতি ইসলামের সংবেদনশীল উত্তর। কোরআনের নির্দেশ—অনুমতি নয়; ন্যায়ের শর্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের পছন্দের নারীদের মধ্যে থেকে দুই, তিন বা চার পর্যন্ত বিবাহ করতে পারো। আর যদি আশঙ্কা কর যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনেই সীমাবদ্ধ থাকো।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত : ৩)

এ আয়াত শুধু অনুমতি নয়—এটি একটি শর্তযুক্ত বিধান। আয়াতের অভ্যন্তরে তিনটি স্তর রয়েছে—

১. অনুমতি: দুই, তিন বা চার পর্যন্ত বিয়ের সুযোগ।

২. শর্ত: ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

৩. সীমারেখা: ন্যায় করতে না পারলে একজনেই সীমাবদ্ধ থাকা।

এই সীমারেখাই ইসলামকে অনন্য করেছে।

নবীজীর সুন্নাহ : বাস্তবতার সাথে প্রজ্ঞার সংযোগ
হাদীসে রাসূল সা: বলেন, ‘নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদীস : ১২১৮)

অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘যার দুই স্ত্রী থাকবে, আর সে একদিকে ঝুঁকে অত্যাচার করবে, সে কিয়ামতের দিন অর্ধেক শরীর কাত হয়ে নিয়ে উপস্থিত হবে।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ২১৩৩)

এ হাদিসগুলো স্পষ্ট করে দেয়— একাধিক বিবাহ মানে অধিকার নয়; বরং দায়িত্ব ও জবাবদিহির ওজন আরো বেড়ে যাওয়া।

ইসলামে ৪ বিবাহ আসলে কেন বৈধ?
—পাঁচটি দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক কারণ

১. যুদ্ধ-সঙ্কট পরবর্তী সমাজে নারীর নিরাপত্তা
ইসলাম নাজিলের যুগে পুরুষদের বড় অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারাত। ফলে নারীর সংখ্যা ছিল বেশি। সমাজে বিপুল সংখ্যক বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, এতিম সন্তানের মা—যাদের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন ছিল। বিবাহই ছিল সেই সম্মানজনক নিরাপত্তার পথ।

২. মানব-সমাজে সংখ্যাতাত্ত্বিক বৈষম্য
বহু সভ্যতায় নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি—আজও বিশ্বব্যাপী গড় হিসেবে একই প্রবণতা দেখা যায়। ইসলাম এই বিষয়টির একটি নৈতিক সমাধান দিয়েছে।

৩. যৌনতার নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক পবিত্রতার সুরক্ষা
বিবাহ বহুগামী হলে সমাজে স্থায়িত্ব আসে। আর অবৈধ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করে পরিবার, সন্তান, নৈতিকতা ও সমাজের ভিত্তি। ইসলাম সর্বদা বৈধতার পথকে শক্তিশালী করে, অবৈধতার দরজা বন্ধ রাখে।

৪. বন্ধ্যাত্ব বা স্থায়ী অসুস্থতা—পরিবার রক্ষার বিকল্প ব্যবস্থা
স্ত্রীর অক্ষমতা, অসুস্থতা বা বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে তালাক নয়; বরং পরিবার রক্ষার বিকল্প হিসেবে দ্বিতীয় বিবাহের সুযোগ ইসলাম দিয়েছে।

৫. মানবীয় প্রবৃত্তির বাস্তবতা ও নৈতিক পথ তৈরি
ইসলাম প্রবৃত্তিকে নস্যাৎ করে না; বরং বাঁধা ও নিয়ন্ত্রণ দিয়ে পবিত্র রাখে।

ন্যায়বিচারের সীমারেখা : চার বিবাহের সবচেয়ে কঠিন শর্ত
১. আর্থিক ন্যায়

প্রতিটি স্ত্রীর জন্য আলাদা বাসস্থান, ভরণপোষণ, পোশাক, চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার।

২. মানসিক ন্যায়

সংবেদনশীলতা, সময় বণ্টন, সান্নিধ্য—সবকিছুতে ন্যায়ের গুরুত্ব।

৩. আবেগিক ন্যায়

ইসলাম বলে—

‘তোমরা সম্পূর্ণ একদিকে ঝুঁকে পড়ো না।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১২৯)

৪. জুলুমের প্রতি শূন্য সহনশীলতা

নবীজীর ভাষায়— একজন স্ত্রীকে কষ্ট দেয়া মানেই কিয়ামতে অসম দেহ নিয়ে হাজির হওয়া।

ব্যাপারটি শুধু দাম্পত্য নয়; আখিরাতের বিচারও যুক্ত।

৫. রোমান্স নয়—রেসপনসিবিলিটি

একাধিক বিবাহ কোনো ‘রোমান্টিক ইচ্ছা’ নয়; এটি একটি আইনি-নৈতিক দায়িত্বব্যবস্থা।

সমাজে চার বিবাহ নিয়ে ভুল ধারণা এবং তার সংশোধন

১. ‘ইসলাম পুরুষকে সুবিধা দিয়েছে’—এটি ভুল

আসলে পুরুষের ওপর শর্ত এত কঠিন যে অধিকাংশই পূরণ করতে সক্ষম হয় না।

২. ‘এটি নারীর প্রতি অবিচার’; বরং সত্য উল্টো

ইসলাম নারীর নিরাপত্তা, সম্মান, আর্থিক সুরক্ষা এবং সামাজিক অবস্থান রক্ষার জন্যই সীমারেখাসহ এ অনুমতি দিয়েছে।

৩. ‘ইসলাম চারটাকে উৎসাহ দিয়েছে’—না, উৎসাহ নয়; রেগুলেশন দিয়েছে

ইসলাম কখনো সংখ্যা বাড়াতে উৎসাহ দেয়নি; বরং অবিচার ঠেকাতে কড়া শর্ত আরোপ করেছে।

৪. ‘মুসলিম সমাজে চার বিবাহ ব্যাপক’—এটিও ভুল

সংখ্যাগতভাবে মুসলিম সমাজে চার বিবাহ অত্যন্ত বিরল। কিন্তু এর দার্শনিক মূল্য অপরিসীম। কারণ, এটি একটি বিকল্প সুরক্ষা ব্যবস্থা।

মুসলিম সমাজের জন্য মূল বার্তা
১. ভুল ব্যবহার নয়—সঠিক বোঝাপড়া

চার বিবাহের বিধানকে হাস্যকর বা কামপ্রবৃত্তির আলোচনায় নামিয়ে আনা ইসলামের প্রতি অন্যায়।

২. পারিবারিক স্থিতিশীলতা ও নারীর মর্যাদা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

ইসলামের উদ্দেশ্য সংখ্যা নয়; ন্যায় বজায় রেখে পরিবার রক্ষা করা।

৩. বিধানটি যেমন আছে—তেমনি রাখাই ইসলামের ভারসাম্য

এটি তুলে নেয়া বা বাতিল করা মানে—সমাজের সঙ্কটময় পরিস্থিতির জন্য বিকল্প দরজা বন্ধ করা।

৪. নারীর সম্মান ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু

এ বিধান যদি নারীর ক্ষতি করত—ইসলাম কখনো এটি দিত না।

চার বিবাহ—একটি নৈতিক চুক্তি; খেয়ালখুশির নয়
ইসলাম পুরুষকে ‘চারটি বিয়ে করার অধিকার’ দেয়নি; বরং ন্যায়বিচার-ভিত্তিক দায়িত্বের বোঝা দিয়েছে।

ন্যায়, দায়িত্ব, আর্থিক সামর্থ্য, আবেগিক পরিপক্বতা, নৈতিক জবাবদিহি—এসবের সমন্বয় ছাড়া চার বিবাহ সম্ভব নয়, বৈধও নয়।

বিধানটি মানবসমাজের গভীর সঙ্কট, নারীর সুরক্ষা, পরিবারের স্থিতি এবং সামাজিক ভারসাম্যের প্রতি আল্লাহর এক অসাধারণ প্রজ্ঞাময় উত্তরের নাম।

লেখক : মুহাদ্দিস, দারুল উলুম ঢাকা