ঈদযাত্রা স্বাভাবিক করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ার পরও নিরাপদ সড়কের সংশয় কাটছে না। প্রতি বছরই ঈদ যাত্রায় সড়কে ঝরে যায় অসংখ্য তাজা প্রান। নাড়ির টানে প্রিয়জনের সাথে ঈদ করতে হাসিমুখে যাত্রা করলেও কারো কারো জীবনে তা বিষাদে পরিণত হয়। এক পসিখ্যান অনুযায়ী গত চার বছরে আটটি ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিন হাজার ৬৭ জন মানুষ। আহত হয়েছেন ছয় হাজার ৯৯৬ জন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদ সামনে এলেই দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রী চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয় যানজট, দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিট সঙ্কট ও চাঁদাবাজির মতো সমস্যা। আবার ঈদের সময় চালকরা যেমন তাড়াহুড়া করেন, বাস মালিকরাও বেশি আয়ের জন্য অতিরিক্ত ট্রিপ পরিচালনা করতে চালকদের প্ররোচিত করেন।
বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, ঈদের আগে ও পরে কয়েকদিন সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা সাধারণ সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়না, ক্লান্ত চালক, অতিরিক্ত যাত্রী এবং অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য চালকের উপস্থিতি এ ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এর সাথে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অপরিকল্পিত মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা। ফলে যে যাত্রা হওয়ার কথা আনন্দের, তা অনেক সময় হয়ে ওঠে বিষাদের।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যান বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ঈদুল ফিতরে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৩৭২টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৪৪৩ জন নিহত এবং ৮৬৮ জন আহত হন। যার মধ্যে ১৬৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত হন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।
২০২২ সালে ঈদুল আজহায় ৩৫৪টি দুর্ঘটনায় ৪৪০ জন নিহত এবং আহত হন ৭৯১ জন, যার মধ্যে ১১৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ১৩১ জন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের ৩৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। ২০২৩ সালে ঈদুল ফিতরে ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৮ জন নিহত ও ৫৬৫ জন আহত হন। ১৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৬৭, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ। একই বছর ঈদুল আজহায় ৩১২টি দুর্ঘটনায় ৩৪০ জন নিহত এবং ৫৬৯ জন আহত হন। ৯১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ৯৪ জন, যা মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
২০২৪ সালে ঈদুল ফিতরে ৪১৯টি দুর্ঘটনায় নিহত ৪৩৮ জন ও আহত হন এক হাজার ৪২৪ জন। সেবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে ছিল মোটরসাইকেল, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। ঈদুল আজহায় ৩০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৬ জন নিহত ও ৭৬২ জন আহত হন। ২০২৫ সালে ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনে ৩৪০টি দুর্ঘটনায় ৩৫২ জন নিহত হন, আহত হন ৮৩৫ জন। সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে মোটরসাইকেল ঘিরে। ঈদযাত্রায় সড়ক-মহাসড়কে ১৩৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫১ জন নিহত হন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ। ২০২৫ সালে ঈদুল আজহায় সারা দেশে ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩৯০ জন ও আহত হন এক হাজার ১৮২ জন। ১৩৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৪৭ জন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
ঈদুল ফিতর নিরাপদ, নির্বিঘœ ও ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। পুলিশের নিরাপত্তা পরামর্শে যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়, পর্যাপ্ত সময় নিয়ে ঈদের ভ্রমণ পরিকল্পনা করুন। ভ্রমণকালে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় রাখুন। চালককে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে তাগিদ দেবেন না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাসের ছাদ কিংবা ট্রাক, পিকআপ ও অন্য পণ্যবাহী যানবাহনে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকবেন।
ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করতে নানামুখী প্রস্তুতির কথা বলেছেন সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সম্প্রতি তিনি কয়েকটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ঈদের সময় কিছু অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা বা সাময়িক বিঘœ ঘটতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেয়ার জন্য প্রশাসন প্রস্তুত।
আমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখছি না। যাত্রীদের কাছে অনুরোধ থাকবে- সঙ্কটের সময় কিছুটা ধৈর্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন। এ ছাড়া সম্ভাব্য যানজটপ্রবণ এলাকাগুলো আগেই চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত তদারকি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, চালকরা ঈদের সময় নির্ঘুমভাবে গাড়ি চালায়। কোনো বিশ্রাম না নিয়ে একটার পর একটা ট্রিপে যেতেই থাকে যতক্ষণ যাত্রী পাওয়া যায়।
কিন্তু চালকদের দায়িত্ব হলো যাত্রীদের ঠিকমতো গন্তব্যে পৌঁছে দেয়া। এটি কিন্তু একটি ইবাদতের কাজ। কারণ ঘরমুখো মানুষ আপনজনের সাথে দেখা করতে যায়। তাই চালক হিসেবে যাত্রীদের যদি আপনজনের কাছে পৌঁছে দেন তাহলেই যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করা হবে। তিনি বলেন, কিছু বাস মালিকরাও বেশি আয়ের জন্য অতিরিক্ত ট্রিপ পরিচালনা করতে চালকদের প্ররোচিত করেন। এসব থেকে যদি মালিকরা বিরত থাকেন ও চালকদের যদি তারা শান্তিতে গাড়ি চালাতে দেন তাহলে দুর্ঘটনার শঙ্কা কমে যায়।
লক্কড়-ঝক্কড় বাসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু যানবাহন দেখলেই বোঝা যায় সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া কোনো সড়কে কোনো যানবাহন চলাচলের নিয়ম নেই সেগুলো মাথায় রাখতে হবে। এবারের ঈদে শঙ্কার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে অটোরিকশা বেড়ে যাওয়ার দিকটি উল্লেখ করেন। মোজাম্মেল হক বলেন, অটোরিকশা মহামারীর মতো বেড়েছে। এগুলো বেশি আয়ের আশায় মহাসড়কে চলে আসবে। দুই-তিন থেকে ১০ কিলোমিটার পথ পর্যন্ত এক চার্জেই চলাচলের চেষ্টা করবে এগুলো। মহাসড়কেও যাত্রী বহন করে তারা। এ কারণে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, বিশেষ করে রাতে। এক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি দরকার। এর মাধ্যমে পথচারীদের দুর্ঘটনায় পড়া রোধ করা সম্ভব।’
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্পের সমন্বয়কারী শারমিন রহমান বলেন, সড়কে দুর্ঘটনার একটি অন্যতম কারণ হলো- যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত গতি। সড়ক ও পরিবহনের ধরন অনুযায়ী গতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী উভয়েরই মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ সংক্রান্ত এনফোর্সমেন্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করতে হবে।
আসন্ন ঈদযাত্রা নির্বিঘœ ও নিরাপদ করতে মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন এবং মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে থাকবে পুলিশ। হাইওয়েতে অটোরিকশা, ইজি বাইকের মতো তিন চাকার অবৈধ যানবাহন ও মোটরসাইকেলের কারণে ঘটা দুর্ঘটনা রোধে পুলিশ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো: আলী হোসেন ফকির বলেছেন, এই ঈদযাত্রা সুষ্ঠু ও সুন্দর ও নিরাপদ করার জন্য পুলিশ বাহিনীর সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
প্রতিটি ইউনিটের পর্যাপ্ত সংখ্যক ফোর্স নিয়োজিত থাকবে। কোনো ধরনের অন্যায়ের সাথে কম্প্রোমাইজ করা হবে না।



