সিলেট ব্যুরো
নির্বাচিত সরকারের চেয়ে কোনো সরকার শক্তিশালী হতে পারে না মন্তব্য করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচন যত দেরি হবে দেশ তত পিছিয়ে যাবে।
গতকাল সোমবার যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এ মালিকের আয়োজনে এবং সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির সহযোগিতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রূহের মাগফিরাত, বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা, তারেক রহমানের দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি মরহুম এম সাইফুর রহমান এবং গুম হওয়া এম ইলিয়াস আলী এবং জুলাই-আগস্টের শহীদের স্মরণ করেন।
হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে মুহুর্মুহু সে্লাগানে মুখরিত সমাবেশে মির্জা ফখরুল নেতাকর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানুষের কাছে যান। মানুষ যাতে বুঝতে পারে বিএনপি ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। তিনি বলেন, নির্বাচন যত দেরি হবে, দেশ তত পিছিয়ে যাবে। বিনিয়োগ আসবে না, মায়েরা-মেয়েরা নিরাপত্তা হারাবে, জুডিশিয়াল ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। সেই জন্য দরকার একটা নির্বাচিত সরকার। যেই সরকারের পেছনে রয়েছে জনগণ। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তিনি লন্ডনে তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করে ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের সময় ঠিক করেছেন, এ জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আমরা যখন সুযোগ পাই সিলেট আসি। কারণ হচ্ছে শত শত বছর আগে এখানে হজরত শাহজালাল রহ: ইসলামের আলো ছড়িয়েছেন। সত্য, সুন্দর ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই শাহজালাল রহ: ও শাহপরান রহ: দরগায় আমরা আসি। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন। কারণ সেই মহান পুরুষরা অন্ধকারকে আলোকিত করার জন্য মানুষকে আলোকপাত করেছিলেন। এখন মানুষ সেই মানুষগুলোকে শ্রদ্ধা জানাতে চায়। তিনি বলেন, এটি আমাদের পুণ্যভূমি। সিলেট আমাদের কাছে আরো প্রিয় আরেকটা কারণে তা হচ্ছে আমাদের নেতা তারেক রহমান সাহেবের শ্বশুরবাড়ি। সে জন্য আমরা এখানে আসতে আনন্দ পাই, শান্তি পাই। তিনি বলেন, এমনি এমনি হঠাৎ করে হাসিনা পালায় নাই, বহু মানুষের সংগ্রাম, রক্ত, ত্যাগ মিলিয়ে আমরা ফ্যাসিবাদ মুক্ত হলাম। আমরা তো লড়াই করেছি গণতন্ত্রের জন্য। আমরা একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই যেখানে মানুষ কথা বলতে পারবে, বাকস্বাধীনতা থাকবে, মহিলারা নিরাপত্তা পাবে, তরুণরা কাজের সুযোগ পাবে, মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পাবে এমন একটা দেশ আমরা চাই। সেই দেশ তৈরির জন্য নতুন করে লড়াই শুরু করেছি। আর আমাদের এই সংগ্রামের নেতা হচ্ছেন তারেক রহমান। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখনো অসুস্থ অবস্থায় আমাদের পরমার্শ দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র, ভোট, পত্রিকা বন্ধ করেছিল। মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করেছিল। সেই অবস্থায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র এনে নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস একদল লোক নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্র করছে এবং নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছে মন্তব্য করে বলেন, আমরা গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছি, ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলন করেছি। ১৭ বছরের আন্দোলনের ফলে সরকারের পতন ঘটেছে। হাসিনা চলে গেছে। কিন্তু হাসিনার দোসররা এখনো দেশ ছাড়ে নাই। তারা এখনো ষড়যন্ত্র করছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে শেখ হাসিনার লোকেরা এখনো রয়ে গেছে। একেবারে সচিবালয় থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত। তারা চাচ্ছে না বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। চাচ্ছে না দেশে গণতন্ত্র ফিরুক। আর আরেক শ্রেণীর লোক আছে, ক্ষমতায় বসে তারা নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে। নির্বাচন না দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চাইছে।
পিআর পদ্ধতি কী তা বাংলাদেশের জনগণ বুঝে না উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস বলেন, এখন একেক রাজনৈতিক দল একেক কথা বলছে। আবার একই দল একেক সময় একেক কথা বলছে। একবার বলছে, নির্বাচন হবে। আবার বলছে, এ অবস্থায় নির্বাচন সম্ভব না। আবার কখনো বলে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে। এই নাম (পিআর) বাংলাদেশের লোক কখনো শুনে নাই। পিআর পদ্ধতি কি তা বাংলাদেশের মানুষ জানে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ যে পদ্ধতিতে নির্বাচনে অভ্যস্ত সেই পদ্ধতিতেই নির্বাচন হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ২০১৪ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত হাসিনার পতনের জন্য যারা শহীদ হয়েছে তাদের স্মরণ করি। তিনি বলেন, আমরা হাসিনামুক্ত হয়েছি কিন্তু ষড়যন্ত্রমুক্ত হইনি। বিএনপির বিরুদ্ধ সবাই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ষড়যন্ত্র করে বিএনপিকে প্রতিরোধ বা থামিয়ে দেয়ার ক্ষমতা মহান আল্লাহ ছাড়া কারো নেই। যারা ষড়যন্ত্র করছেন, হুমকি দিচ্ছেন, মনে রাখবেন বিএনপি জনগণের দল।
সভাপতির বক্তব্যে এম এ মালিক বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন ও শাসনের অবসান ঘটাতে প্রবাসে বিএনপি নেতাকর্মীরা নির্ভীকভাবে আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন। তারা বিদেশের মাটিতে থেকেও ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলনকে জাগিয়ে রেখেছিলেন।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, হাবিবুর রহমান, তাহসিনা রূশদী লুনা, ড. এনামুল হক চৌধুরী, মুহিদুর রহমান, ডা: শাখাওয়াত হাসান জীবন, আরিফুল হক চৌধুরী, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জিকে গউছ, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন মিলন ও মিফতাহ সিদ্দিকী, বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যরিস্টার এম এ সালাম, বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক, সদস্য নিপুণ রায়, ডা: শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, মিজানুর রহমান চৌধুরী, অ্যাডভোকেট হাদীয়া চৌধুরী মুন্নী, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম। শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে রাখেন জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও মহানগর বিএনপির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকী।
শহীদদের স্মরণ ও সম্মাননা সভায় মির্জা ফখরুল : জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারদের সম্মাননা দিয়েছে সিলেট জেলা বিএনপি। এ উপলক্ষে নগরীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখনো অসুস্থ অবস্থায় আমাদের প্রেরণা ও পরামর্শ দিয়ে চলেছেন।
গতকাল বিকেলে নগরীর একটি হোটেল মিলনায়তনে গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ, তাদের পরিবার-পরিজনের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই বিশেষ স্মরণ ও সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিএনপি।



