বিএনপি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর ভেতর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে : ফরিদা আখতার

Printed Edition
এবি পার্টির আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার : নয়া দিগন্ত
এবি পার্টির আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার : নয়া দিগন্ত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

জুলাই বিপ্লবে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী কাঠামো এখনো বজায় রয়েছে। এর কারণ ফ্যাসিবাদী কাঠামোকে চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে না পারা। তারা মনে করেন, গণঅভ্যুত্থান সফল না হলে দেশের কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র বন্ধ করে দিত আওয়ামী লীগ। সেই সঙ্গে জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হলে বাংলাদেশে ‘শেখরাজ্য’ প্রতিষ্ঠিত হতো বলেও মন্তব্য করেন তারা।

গতকাল সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গণমাধ্যম কর্মীদের দায়িত্ব, ত্যাগ ও দুঃসাহসিক স্মৃতি’ আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাতুল্লাহ টুটুলের সঞ্চালনায় এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক ও বাংলাদেশে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ, ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকন, ডিজিটাল অনুসন্ধানী মিডিয়া দ্য ডিসেন্ট-এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজীব আহাম্মদ, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, এবিএম খালিদ হাসান ও ব্যারিস্টার নাসরীন সুলতানা মিলি প্রমুখ। শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছয়জন সাংবাদিককে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এবং তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল না হলে দেশের বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হতো। বহু সাংবাদিক গুম, কারাবন্দি ও নির্যাতনের শিকার হতেন। শুধু তাই নয়, আনুষ্ঠানিকভাবে হাসিনা পরিবারের ‘শেখতন্ত্র’ বা ‘শেখরাজ্য’ প্রতিষ্ঠা করা হতো। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও তার সুপারিশ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, সে বিষয়ে জাতি এখনো কোনো স্পষ্ট জবাব পায়নি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরিদা আখতার বলেন, ‘আপনারা যদি মনে করেন ৫ আগস্টের পর দেশ একরকম ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়েছে- তাহলে আমি বলব, আসলে ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়নি। কারণ আমরা রাষ্ট্র গঠন করিনি; ফ্যাসিস্ট কাঠামোকে চিহ্নিত করে সেটাকে আমরা উদ্ঘাটন করিনি এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিইনি। যে কারণে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা কিন্তু এখনো বজায় আছে। তিনি বলেন, বিএনপি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর ভেতর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। কাজেই আমরা কী আশা করতে পারি। এই আন্দোলনকে আপনাদের চালিয়ে যেতে হবে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অন্যতম। আবু সাঈদের ছবি এবং আন্দোলনের বিভিন্ন আলোকচিত্র ও ভিডিও ধারণ করে সাংবাদিকরাই আন্দোলনকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

দৈনিক আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ বলেন, জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘কিল’ করেছে আর তথাকথিত সিনিয়র সাংবাদিকরা অফিসে বসে ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ ‘কিল’ (নষ্ট) করেছে। তবে যেসব সাংবাদিক দূরন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তাদের অবদান অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে এবং তাদের যথাযথ সম্মান জানাতে হবে।

রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সাংবাদিক নির্যাতন ছিল নিয়মিত ঘটনা, যার অন্যতম উদাহরণ সাগর-রুনি হত্যাকা-। তিনি জুলাই গণহত্যায় নিহত ও নির্যাতিত সাংবাদিকদের ঘটনাগুলোর বিচার পৃথক ট্রাইব্যুনালে করার দাবি জানান।

দ্য ডিসেন্ট-এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের আত্মত্যাগের বিষয়টি যথাযথভাবে আলোচিত হয়নি। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের আগে অন্য কোনো গণআন্দোলনে সাংবাদিকদের শহীদ হওয়ার এমন নজির ছিল না এবং এলিট শ্রেণির সাংবাদিকরা তুলনামূলক কম ঝুঁকি নিয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করেন।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজীব আহাম্মদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত অধিকাংশ ভিডিও, ছবি ও নথি মোবাইল জার্নালিস্টদের অবদানে সংরক্ষিত হয়েছে।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, মোবাইল জার্নালিজমের স্বীকৃতির দাবি প্রথম তাদের দলই জোরালোভাবে উত্থাপন করেছে। তিনি সব সাংবাদিকের অধিকার, ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।

আলোচনা সভায় জুলাইয়ের মাঠের গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন আওয়াজ নিউজের সম্পাদক সাইফ আল তুহিন, ঢাকা ডিজিটের আইয়ুব আলী, আরটিভির সংবাদকর্মী জনি মজুমদার, আবুল হোসেন হৃদয়, শীর্ষ নিউজের আল-হেলাল মিয়া, সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল রাজু, সংবাদকর্মী এম আর আমিন, শাহারুল ইসলাম রকি প্রমুখ।