বিশেষ সংবাদদাতা
রাজনীতিবিদদের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদেরই। এটা করতে হবে জবাবদিহিতার মাধ্যমে- বলেছেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কট উত্তরণের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু, কার্যকর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের (বিসিএফসিসি) গতকাল জাতীয় নাগরিক প্লাটফর্ম আয়োজিত নির্বাচন ২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা শীর্ষক একটি সংলাপে তারা এই অভিমত জানান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। নাগরিক প্লাটফর্ম আহ্বায়ক ও সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, সাবেক এনসিপি নেত্রী ডা: তাসনিম জারা, বাসদের জেলা সমন্বয়ক ডা: মনীষা চক্রবর্ত্তী, গণফোরাম সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত), সুব্রত চৌধুরী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. রওনক জাহান।
আমীর খসরু প্রশ্ন তুলে বলেন, সব দল মিলে বাংলাদেশের সংস্কার করলে বাংলাদেশ পরিবর্তন হয়ে যাবে? আই এম সরি আই ডু নট বিলিভ, সব দলের একসাথে হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। প্রত্যেকটি দলের নিজস্ব দর্শন আছে, চিন্তা আছে, ভাবনা আছে, রূপরেখা আছে। আমরা এক দিকে বলছি বাংলাদেশের মালিক হচ্ছে জনগণ। আর আমরা ঢাকায় বসে কিছু রাজনীতিবিদ বাংলাদেশের সব প্রবলেম সলভ করে দিবো একসাথে বসে?
বিএনপি নেতা বলেন, আমাদের কিন্তু একটা ধারণা পরিষ্কার, সরকার একা কোনো কিছু সমাধান দিতে পারে না। সেটা যদি বাস্তবায়ন করতে হয় এখানে একটা পার্টনারশিপের বিষয় আছে। সরকারের সাথে পার্টনারশিপে এই সিভিল সোসাইটি, এনজিও এবং প্রাইভেট সেক্টরসহ যার যেখানে প্রয়োজনীয়তা আছে সেখানে তাদেরকে সাথে নিয়ে তা সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, অনেকে বলেছেন সিভিল সোসাইটিকে কাজ করতে না দেয়াটা স্বৈরাচারের পথে হাঁটার একটা ইন্ডিকেশন। আমি মনে করি আমাদের সিভিল সোসাইটিকে কাজ করতে দিতে হবে। শুধু ফাংশন না, একটু ফ্যাসিলিটেট করতে হবে।
প্রবীণ এই নেতা বলেন, এখন একটা অনির্বাচিত সরকার আছে। আমরা এখনো নির্বাচিত সরকার পাইনি, সংসদ পাইনি। একটা নির্বাচিত সরকার থাকলে তার জনগণের কাছে যেতেই হবে। আমরা যত কথাই বলি দিনের শেষে কিন্তু ভোটের জন্য তাদের কাছে যেতে হবে। তিনি বলেন, সুতরাং তার সেখানে একটা দায়িত্ববোধ থাকে। সংসদে তো নিয়মিতভাবে জবাবদিহিতার সুযোগ আছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের দৃষ্টিতে ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪ একই সূত্রে গাঁথা। তিন সময়ের ভেতরে যে প্রত্যাশা এবং আকাক্সক্ষা তার ভেতরে আমরা বৈপরীত্য দেখি না। আমরা এর ভেতরে দ্বন্দ্ব দেখি না। আমরা মনে করি, সামাজিক সুবিচার, মানবিক মর্যাদা ও বৈষম্যবিরোধী আকাক্সক্ষা এটি সবই ধারাবাহিক প্রকাশ। আন্দোলনপরবর্তী প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দেশ আজ রাষ্ট্র সংস্কারের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিচার, নির্বাচন, সংস্কার ও নাগরিক অধিকার- এই চারটি বিষয় আলোচনার মুখ্য তাগিদ আমরা অনুভব করি এবং গুরুত্ব দিই। এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন যে, এই নির্বাচনে কার কথা স্থান পাবে? আগের মতো সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে কি না?
দেবপ্রিয় বলেন, অনেক সংশয়, অনেক দ্বন্দ্ব, অনেক ধরনের সঙ্কট দেখতে পাই। তথাপি আমরা মনে করি, বাংলাদেশের বর্তমান উত্তরণের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু কার্যকর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। নির্বাচন এখন অত্যন্ত একটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার আকাক্সক্ষা কিন্তু আজও পূর্ণতা লাভ করেনি। তিনি বলেন, নাগরিক সমাজ, শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক শক্তি একত্রে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে সেদিন আমরা পথে এসেছিলাম। সেই সময় থেকে নাগরিক সমাজের সংস্কারের আকাক্সক্ষা, মানবাধিকার রক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় চিন্তা সক্রিয়ভাবে আমাদের সামনে আসে। তবে পরবর্তী আর্থসামাজিক উন্নয়নের ধারা, রাজনৈতিক উত্থান-পতন আমাদের যে ভঙ্গুর এবং সীমাবদ্ধ কাঠামো আমাদের দেশে আছে, তাকে কিন্তু ভেঙে একেবারে মৌলিকভাবে সামনে এগোনোর প্রচেষ্টা সেভাবে সফল হয়নি। গত দেড় দশকে মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত ছিল।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, আমাদের সবার সামনে প্রশ্ন আসে নির্বাচন কি সুষ্ঠু হবে? কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন এসেছে। নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও যেকোনো মাপকাঠিতে তা কি অর্থবহ? আমরা কি কোনো পরিবর্তন পাবো? নাকি আবার এই পুরনো ধারাবাহিকতার ভেতরে আমরা সেই গড্ডালিকা প্রবাহে প্রবেশ করব? প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর সেখানে আসবে কি না? তিনি বলেন, নারীদের বিষয়ে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া বিপন্ন জনগোষ্ঠী, তারা কি এর ভেতরে স্থান করে নিতে পারবে আগামী দিনের রাষ্ট্রচিন্তার ভেতরে? সেই বিষয় মাথায় রেখে আমাদের এই উদ্যোগ। তিনি বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন। প্রশ্ন উঠছে-নির্বাচনী ইশতেহারে কি এই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে? রাজনৈতিক নেতারা যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা কি বাস্তবে রূপ নেবে?
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে শহীদ হলেন ওসমান হাদি। তার খুনিরা আজও গ্রেফতার হলো না। তিনি বলেন, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এই নির্বাচন আমাদের পেতে হয়েছে। রক্তের বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা এই নির্বাচন পেয়েছি। আমরা রাজনৈতিক দলগুলো কি দেশের স্বার্থে গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি চুক্তিতে এক হতে পারি না? যারাই ক্ষমতায় আসবে তাদের উচিত হবে বিরোধী দলের সাথে সংলাপ করা।
জামায়াত নেতা বলেন, আমরা সবাই গণভোটের কথা ভুলে গেছি। আমরা গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে। তিনি বলেন, দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চাঁদাবাজ, দখলদার বাংলাদেশের বড় সমস্যা। আমরা এসবকে না দেখাতে চাই। এসবে যারা জড়িত তাদেরকে মনোনয়ন দিতে চাই না। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে। একে অপরকে যেন আমরা গালাগালি না দেই।



