অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ধারাবাহিক পতন ঘটে চলেছে দেশের পুঁজিবাজারে। গতকাল টানা চতুর্থ দিনের মতো সূচক হারাল দেশের দুই পুঁজিবাজার। আর এ পতনের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাজারের এহেন আচরণে কিছুটা হতাশা দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। তারা জানতে চায়, দীর্ঘ মন্দার পর কিছুটা ভালো অবস্থানে ফিরতে যাওয়া বাজার কি আবার ধারাবাহিক পতনের দিকে যাচ্ছে?
গত জুলাই মাসের শেষ দিকেই মূলত পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রবণতা শুরু হয়। ওই সময় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। তখনই বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত ছিল ছয় হাজার পেেয়ন্টের কাছাকাছি এসে বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপে থাকবে। তাই এ সময় বাজার কিছুটা ধীর গতির থাকবে। বিনিয়োগকারীরাও এ কথার সাথে একমত ছিলেন। কিন্তু এই প্রবণতা যে এত দীর্ঘায়িত হবে তা কেউ প্রত্যাশা করেনি। আগস্ট মাসের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত মোট ১১টি কর্মদিবসের মধ্যে মাত্র দু’টিতেই ভালো আচরণ করে দুই পুঁজিবাজার।
গতকাল লেনদেনের শেষ দিকে এসে ঢাকা শেয়ারবাজারে প্রধান সূচকটির অবনতি ঘটে ৬০ পয়েন্টের বেশি। তবে একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে হারানো সূচকের একটি অংশ ফিরে পায় বাজারটি। তারপরও এদিন প্রধান সূচকটির ৪৫ দশমিক ৭১ পয়েন্ট হারায় পুঁজিবাজারটি। ৫ হাজার ৮৫৯ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বিকালে লেনদেনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৮১৪ দশমিক ২৬ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫৬ ও ১৩ দশমিক ৬১ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১১১ দশমিক ২২ পয়েন্ট হারায় গতকাল। ১৫ হাজার ৭৩৫ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি সোমবার বিকেলে স্থির হয় ১৫ হাজার ৬২৪ দশমিক ১৩ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৫১ দশমিক ৪৭ ও ৬১ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপািশ গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনেও বড় ধরনের অবনতি ঘটে। বাজারটি গতকাল ৯৯৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিনের চাইতে ১৩৬ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। তবে এ দিন লেনদেনের বড় রেকর্ড করেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার। বাজারটিতে গতকাল ১০৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ। রোববার সিএসইর লেনদেন ছিল ৭৫ কোটি টাকা। তবে গতকাল সিএসইতে বড় লেনদেন সংঘটিত হয় তিনটি কোম্পানির। এগুলোর মধ্যে সেনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ৩১ কোটি টাকা, ডাচ বাংলা ব্যাংক ২৫ কোটি টাকা ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ২৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে।
এ দিকে অনুমোদিত মূলধন ও পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিটি ব্যাংক পিএলসি। এজন্য সঙ্ঘস্মারক ও সঙ্ঘবিধিতে পরিবর্তন আনবে ব্যাংকটি। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ৭০৬তম সভায় এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এসব বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের অনুমোদন নিতে আগামী ৪ অক্টোবর বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আয়োজন করবে সিটি ব্যাংক। ১৬ আগস্ট ডিএসইর ওয়েবসাইটে এসব তথ্য প্রকাশ করে দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের প্রতিষ্ঠানটি।
তথ্যানুযায়ী, সিটি ব্যাংক তাদের অনুমোদিত মূলধন দুই হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করবে। একই সাথে ব্যাংকটির স্বতন্ত্র পরিচালক বাদে পরিচালকের সর্বোচ্চ সংখ্যা আট থেকে বাড়িয়ে ১০ জন করার প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। এজন্য সঙ্ঘস্মারক ও সঙ্ঘবিধিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনবে সিটি ব্যাংক। শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিতে আগামী ৪ অক্টোবর বেলা ৩টায় ডিজিটাল মাধ্যমে ইজিএম আয়োজন করবে সিটি ব্যাংক। এ-সংক্রান্ত রেকর্ড ডেট ঠিক করা হয়েছে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর। শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং প্রযোজ্য সব আইন, বিধি ও প্রবিধান পালন করবে ব্যাংকটি।
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি ২০২৬ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) সিটি ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৩ টাকা ১ পয়সা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ টাকা ৭২ পয়সা। ৩১ মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ৩৭ টাকা ৬০ পয়সায়। সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদানের সুপারিশ করেছে সিটি ব্যাংকের পর্ষদ। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ। আলোচ্য হিসাব বছরে ব্যাংকটির ইপিএস হয়েছে ৮ টাকা ৭১ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৬ টাকা ৬৭ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে ব্যাংকটির এনএভিপিএস ছিল ৩৫ টাকা ৬৭ পয়সায়।
২০২৪ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ২৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে সিটি ব্যাংকের পর্ষদ। এর মধ্যে সাড়ে ১২ শতাংশ নগদ ও সাড়ে ১২ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ। আলোচ্য হিসাব বছরে সিটি ব্যাংকের ইপিএস হয়েছে ৭ টাকা ৫৩ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৪ টাকা ৭৪ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ৩৪ টাকা ৩৯ পয়সা।
১৯৮৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিটি ব্যাংকের বর্তমানে অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৭৪৯ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ৪ হাজার ২৭৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ১৭৪ কোটি ৯৪ লাখ ৫ হাজার ৩৮০। এর ৩০ দশমিক ৩৭ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৯ দশমিক ৪৫, বিদেশী বিনিয়োগকারী ৯ দশমিক ৯৮ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৪০ দশমিক ২০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।



