শ্রমবাজার সম্প্রসারণে দূতাবাসগুলো নিষ্ক্রিয়

কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কোম্পানি ও জেলখানা পরিদর্শনের নামে আখের গোছাচ্ছেন!

শ্রমবাজার সম্প্রসারণে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি তাদের মধ্যে দূতাবাসের মিশন প্রধান ও শ্রম কাউন্সিলর। কিন্তু তাদের তৎপরতা এ খাতে খুব একটা না থাকার কারণেই মনে হচ্ছে নতুন নতুন শ্রমবাজার যেমন খুলছে না, তেমনি অনেক দেশের বন্ধ শ্রমবাজারও এখন থমকে আছে। সার্বিকভাবে এর প্রভাব পড়ছে বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের ওপর। যদি ইউরোপের ইতালিসহ অন্যান্য দেশে শ্রমিক হারে বেশি যেতে পারতো তাহলে কিন্তু রেমিট্যান্সের গতি বাড়ত। দেশও সমৃদ্ধ হতো।

মনির হোসেন
Printed Edition

মালয়েশিয়া, কুয়েত, সৌদি আরব, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস ও কন্স্যুলেট অফিসের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন অনেক পুরনো। তবে এসবের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি তাদের বিরুদ্ধে, সেটি হচ্ছে বিদেশের বন্ধ শ্রমবাজার উন্মুুক্ত ও বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ বা শ্রমবাজার সম্প্রসারণে অনীহা এ কারণে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশেই সেভাবে বৈধভাবে কর্মী যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমবাজার সম্প্রসারণে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি তাদের মধ্যে দূতাবাসের মিশন প্রধান ও শ্রম কাউন্সিলর। কিন্তু তাদের তৎপরতা এ খাতে খুব একটা না থাকার কারণেই মনে হচ্ছে নতুন নতুন শ্রমবাজার যেমন খুলছে না, তেমনি অনেক দেশের বন্ধ শ্রমবাজারও এখন থমকে আছে। সার্বিকভাবে এর প্রভাব পড়ছে বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের ওপর। যদি ইউরোপের ইতালিসহ অন্যান্য দেশে শ্রমিক হারে বেশি যেতে পারতো তাহলে কিন্তু রেমিট্যান্সের গতি বাড়ত। দেশও সমৃদ্ধ হতো।

কাকরাইলের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যান ঘেটে দেখা গেছে, বিদেশে প্রতি বছর যতজন কর্মী বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে যাচ্ছেন তার অর্ধেকই মধ্যেপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে যাচ্ছেন। যদিও এই শ্রমবাজারের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। এরপর যে দেশগুলোতে যাচ্ছে সেগুলোর কোনো কোনোটিতে এক শ’, দুশ’, আবার কোনো দেশে তারও কম কর্মী যাচ্ছে। আবার কোনো দেশে কর্মী যাওয়া খোলা থাকলেও সেখানে দূতাবাসের গাফিলতিতে কর্মী একজনও যেতে পারছে না।

গত শুক্রবার মালয়েশিয়া থেকে একজন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নয়া দিগন্তকে টেলিফোনে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন কোন খবর নাই। পুরনো যেসব শ্রমিক ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে (সাড়ে ৭ হাজার) আসার কথা ছিল তার মধ্যে কতজন আসতে পেরেছে সেটিও হাইকমিশন থেকে স্পষ্ট বলা হচ্ছে না। বর্তমান হাইকমিশনার মজ্ঞুরুল করিম খান চৌধুরী যোগদান করার পর থেকে এখন পর্যন্ত শ্রমবাজার নিয়ে কোন অগ্রগতি আছে কি না সে তথ্যও তিনি বলছেন না, তার দফতর থেকেও কিছু বলা হচ্ছে না। অথচ মালয়েশিয়ার বৃহৎ শ্রমবাজার দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। তাহলে হাইকমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কী ধরনের ভূমিকা নিচ্ছেন- জানতে চাইলে কুয়ালালামপুরের অপর একজন প্রতিষ্ঠিত শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে বলেন, তারা মালয়েশিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট মিনিস্টার ও অন্যদের সাথে আলাপ করে যাচ্ছেন। তবে কতটুকু ফলপ্রসূ হচ্ছে তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন সংশ্লিষ্টরা জোর দিয়ে বলছেন, শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় তাদের (কর্মকর্তা) এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই বলতে পারেন! তারা এখন বিভিন্ন প্রদেশের জেলখানায় আটক এবং অন্যান্য স্থানে কর্মরত সমস্যায় থাকা বাংলাদেশীরা কেমন আছেন সেগুলোর খোঁজখবর নিচ্ছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার তারা ভিজিটে যাচ্ছেন এবং টিএ ডিএ বিল বানিয়ে সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন। এরমধ্যে কর্মচারীরা ভিজিট করলে ৪০০ ডলার পান, আর কর্মকর্তারা ভিজিটে গেলে কখনো ১২০০ ডলার পর্যন্ত বিল করে থাকেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাদের পরিদর্শনের পরই জেলখানায় ও দেশে ফিরতে ইচ্ছুক বাংলাদেশীরা হাইকমিশন থেকে ট্র্যাভেল পাস পাচ্ছেন। যেহেতু মালয়েশিয়া সরকার আমাদের দেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না সেই পর্যন্ত হাইকমিশনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কেক কেটে আর ফুল নিয়ই সময় কাটাচ্ছেন। শুধু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নয়, কুয়েতের শ্রমবাজারের অবস্থাও এই মুহূর্তে খুব একটা ভালো নয় বলে মন্তব্য করেছেন কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশীরা।

গতরাতে কুয়েত সিটির একজন প্রবীণ বাংলাদেশী শ্রমিক নয়া দিগন্তকে বলেন, কুয়েতের বর্তমান পরিস্থিতি খুব খারাপ। সকাল-বিকেল শুধু নতুন নতুন আইন-কানুন করছে; সাথে ধরপাকড় তো আছেই। আগে আকামা লাগাতে যেখানে ১০ দিনার লাগত এখন লাগছে তার ডাবল। মেডিক্যালের জন্য দুই দিনারের পরিবর্তে এখন লাগছে ৫ দিনার। আগে ওষুধের টাকা না লাগলেও এখন এক্সরে, ব্লাড টেস্ট করলে আলাদা টাকা নিচ্ছে।

শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকাণ্ড কেমন দেখছেন- জানতে চাইলে দূতাবাস সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম না প্রকাশের শর্তে গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, দূতাবাসের কর্মকর্তারা বলছেন তারা শ্রমবাজার সম্প্রসারণে চেষ্টা করছেন। এখন কতটুকু চেষ্টা করছেন এটা তারাই জানেন আর তাদের আল্লাহ পাকই জানেন। তাদের মতে, দিনে দিনে কুয়েতে লোক আসা কমছে। তাহলে কিভাবে তারা শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কাজ করছেন? এমন প্রশ্নে তারা বলেন, এখন বরং নতুন ভিসা নিয়ে দুই দেশে চলছে বানিজ্য। তাও ১০-১২ লাখ টাকার নিচে কেউ কুয়েতে আসতে পারছে না। অথচ বেতন পাচ্ছে সর্বোচ্চ কুয়েতি ৭৫ দিনার। বাংলাদেশ থেকে যে টাকা খরচ করে আসছে কর্মীরা তাদের সেই টাকা তুলতেই অনেক দিন লাগবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তাদের মন্তব্য, দূতাবাসে আওয়ামী লীগের দোসর হিসাবে পরিচিত দু’জন কর্মকর্তার মধ্যে একজন আবুল হোসেন অপরজন ইকবাল আকতার। তারা ইতিমধ্যে দেশে ফিরে গেছেন। তবে এখনো শেখ হাসিনার আমলে নিযুক্ত কিছু কর্মকর্তা মিশনে দাপটের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের দিয়ে শ্রমবাজার কতটুকু সম্প্রসারণ হবে সেটি এখন বুঝে নেন আপনারা।

এ দিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে বিদেশের বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনের প্রধানদের কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া হলেও সেসব নিয়ে তারা কমই ভাবছেন বলে ভূক্তভোগীদের অভিযোগ। এরমধ্যে ওমান, দুবাই, মরিশাস, লিবিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ রয়েছে। কাতার, সিঙ্গাপুর, রোমানিয়া, মালদ্বীপ, কম্বোডিয়া এবং রাশিয়ায় কর্মী গেলেও তা তুলনামূলক অনেক কম। তবে নতুন করে এশিয়ার দেশ জাপানের দক্ষ শ্রমবাজার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার খুলতে সক্ষম হলেও সেভাবে লোক যাচ্ছে না। এরমধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রধানসহ অন্যান্য কর্মকর্তা নিজেদের পছন্দের লোকদেরই বেশি সুযোগ সুবিধা দিতে ব্যস্ত রয়েছেন বলে এই পেশার সাথে সম্পৃক্তদের অভিযোগ। এই বিষয়টিও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নজরে আনা উচিত বলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের অভিযোগ।

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ড্রাইভয়ে এলাকায় কর্মরত একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদেশে লোক যাচ্ছে ঠিকই, আবার খালী হাতেও দেশে ফেরত আসছে। প্রায়ই সৌদি আরবের জেলখানা থেকে বাংলাদেশীরা ফেরত আসছে। কেন দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ কর্মী ফেরত আসছে তা-ও খতিয়ে দেখা উচিত। এ ব্যাপারে দেশটির বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনসাল জেনারেল অফিস কি কাজ করছেন সেগুলোও খতিয়ে দেখা দরকার বলে অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একইভাবে নতুন শ্রমবাজার রাশিয়া থেকেও দেশে ফিরছে অনেক বৈধ কর্মী। আর লিবিয়ার শ্রমবাজার খোলা থাকলেও এখনো দেশটিতে শ্রমিক পাঠাতে পারছে না। এ ক্ষেত্রেও দূতাবাসের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা উচিত।