বিশেষ সংবাদদাতা
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নিয়োগ স্থগিতের নির্দেশনা এবং শিক্ষা অডিট অধিদফতরের একাধিক আপত্তি উপেক্ষা করে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চপদে নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব নিয়োগকে পরবর্তীতে বৈধতা দেয়ার উদ্দেশ্যে আজ ১৪ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২তম সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি, ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রত্যাহার না হলেও ইতোমধ্যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অর্থ পরিচালক, ডিন, অধ্যাপক, পরিদর্শকসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদে ‘লিয়েন’ ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ এসব পদে লিয়েনে নিয়োগের কোনো বিধান নেই বলে শিক্ষা অডিট অধিদফতর একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছে।
কেন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ইউজিসি
ইউজিসির ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জারি করা স্মারক (নম্বর ৩৭.০১.০০০০.০০০.১৫২.২৭.০০০৬.২৩.৩৩৮)-এ ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিজ্ঞাপিত জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: আব্দুর রশীদ এবং সাবেক উপউপাচার্য মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে মাদরাসা পরিদর্শন, অধিভুক্তি, পাঠদান অনুমোদন এবং নিয়োগ প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবির অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ায় ইউজিসি নিজস্ব তদন্ত কমিটিও গঠন করে। এসব কারণ উল্লেখ করে ইউজিসি চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানায়, ‘সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং জনপরিসরে বিতর্ক এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বিজ্ঞাপিত জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রাখা হলো।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ নির্দেশনা এখনো প্রত্যাহার হয়নি।
শিক্ষা অডিটের আপত্তি : শিক্ষা অডিট অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অর্থ পরিচালক, ডিন বা সমমানের পদে লিয়েনে নিয়োগ দেয়ার সুযোগ নেই। বিধি অনুযায়ী এসব পদে নিয়োগের দুটি পথ রয়েছে- প্রেষণে (ডেপুটেশন) নিয়োগ; অথবা উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব বিধান অনুসরণ না করেই ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দিতে লিয়েনে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দফতর থেকে জারি করা ৭ জুলাইয়ের নোটিশ অনুযায়ী আজ ১৪ জুলাই বিকেল ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভার নোটিশে আলোচ্যসূচি উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে দেয়া বিতর্কিত নিয়োগগুলোকে অনুমোদন বা বৈধতা দেয়ার বিষয়টি সভায় তোলা হতে পারে।
এ কারণে সিন্ডিকেট সভাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
লিয়েন নাকি স্বজনপ্রীতির হাতিয়ার?
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লিয়েন এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তা তার মূল চাকরি বহাল রেখে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিধানকে ব্যবহার করা হচ্ছে স্থায়ী নিয়োগের বিকল্প হিসেবে- যা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
তাদের অভিযোগ, উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এতে যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা আবেদন করার সুযোগই পাচ্ছেন না।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অর্থ পরিচালক বা ডিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ যদি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুর্নীতির অভিযোগের ছায়া
দুদকের তদন্তের পাশাপাশি ইউজিসির নিজস্ব তদন্তও শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন নিয়োগ বা নিয়োগ বৈধ করার উদ্যোগ তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে- এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই যদি সিন্ডিকেট বিতর্কিত নিয়োগ অনুমোদন করে, তাহলে তা প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা আরো বাড়াতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মহল শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকা অবস্থায় কোনো নিয়োগ বা নিয়োগ অনুমোদনের উদ্যোগ যেন গ্রহণ করা না হয়।
তাদের দাবি, সব ধরনের নিয়োগ উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতা, প্রতিযোগিতা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বিতর্ক কমবে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।



