ট্রাইব্যুনালে পুলিশ সদস্যের সাক্ষ্য

রামপুরায় গুলি চালানোর নির্দেশ দেন ওসি ও এডিসি

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর রামপুরায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেন থানার ওসি ও তৎকালীন এডিসি। এমন তথ্য দিয়েছেন পুলিশের এক সদস্য। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ সাক্ষ্য দেন পুলিশ টেলিকম শাখার সদস্য মো: আ: রহমান। তিনি ২০২৪ সালের ১৯ থেকে ২০ জুলাই রামপুরা থানায় ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ও আবদুস সাত্তার পালোয়ান।

সাক্ষী মো: আ: রহমান আদালতে বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সকাল ৮টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত আমি রামপুরা থানায় বেতার চালক হিসেবে ডিউটিতে ছিলাম। ওই দিন জুমার নামাজের পর বেলা ২টার দিকে মসজিদ থেকে বেরিয়ে থানার সামনে ও আশপাশ এলাকায় ছাত্র-জনতা জড়ো হয়। আমি বিষয়টি ওয়্যারলেসে ওসি স্যারকে জানাই। কিছুক্ষণ পর ওসি মশিউর রহমান স্যার ও এডিসি রাশেদ স্যার বিজিবির একটি এপিসি যোগে থানায় আসেন। তাদের নির্দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে ছত্রভঙ্গ করা হয়।’

তিনি আরো বলেন, আমি তখন থানার ভেতরে অবস্থান করছিলাম এবং গুলির শব্দ শুনতে পাই। পরে জানতে পারি, থানার সামনে সেলুনের গলিতে নাদিম নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। ওই গলিতে মুসা নামে এক শিশু ও তার দাদিও গুলিবিদ্ধ হয়; পরে শুনেছি শিশুটির দাদি মারা গেছেন।

সাক্ষী জানান, গুলিবর্ষণের সময় ওসি মশিউর রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি ও এডিসি রাশেদ কন্ট্রোল রুমে ঘটনাটির প্রতিবেদন পাঠান।

জুলাই মাসে রাজধানীর রামপুরায় ছাদের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনসহ দু’জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। গতকাল সোমবার ছিল মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের পঞ্চম দিন। এদিন মামলার অষ্টম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন মো: আ: রহমান। এদিন তার আগে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দিয়েছেন এএসআই (নিরস্ত্র) মো: কামরুল হাসান।

ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের অভিযোগ : পুলিশে কর্মরত এএসআই (নিরস্ত্র) মো: কামরুল হাসান জবানবন্দীতে জানিয়েছেন, তিনি ১৭ জুলাই ২০২৪ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারের অপারেশন বিভাগে ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই দিন সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত তার ডিউটি ছিল। কামরুল হাসানের ভাষ্যমতে, বেলা ১১টা থেকে ১১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের জন্য তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার মো: হাবিবুর রহমান, যার সাঙ্কেতিক কল সাইন ‘ভিক্টর মাইক ওয়ান’, ওয়্যারলেসে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেন। কমিশনার হাবিবুর রহমান চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে নিলিং পজিশনে (হাঁটু গেড়ে) অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারীদের গুলি করার নির্দেশ প্রদান করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সাক্ষী কামরুল হাসান জানান, এই নির্দেশনার অডিওবার্তা তিনি ও তার টিম বার্তাবাহক হিসেবে ডিএমপির সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে পৌঁছে দেন। পরবর্তীতে সেই অডিওবার্তা তদন্তের সময় উপস্থিত সবাইকে শোনানো হয়। এতে ডিএমপি কমিশনার মো: হাবিবুর রহমানসহ তার (এএসআই কামরুল হাসান) এবং আরো কয়েকজনের কণ্ঠস্বর শোনা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাদের জেরা করেন পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন ও গ্রেফতার চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার জাহান। এখন পর্যন্ত এ মামলায় আটজনের জবানবন্দী নেয়া হয়েছে।

এর আগে ৩ নভেম্বর তৃতীয়-চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন শহীদ মো: নাদিম মিজানের স্ত্রী তাবাসসুম আক্তার নিহা ও প্রত্যক্ষদর্শী মো: ইয়াকুব। জবানবন্দীতে গত বছরের ১৯ জুলাই রামপুরার বনশ্রীতে পুলিশ-বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চালানো নৃশংস-নির্মমতার কথা ট্রাইব্যুনালের সামনে আনেন। একইসাথে ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচার চান তারা।

গত ২৭ অক্টোবর দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন গুলিবিদ্ধ বাসিত খান মুসার বাবা মো: মোস্তাফিজুর রহমান। জবানবন্দীতে ১৯ জুলাই তার পরিবারের সাথে ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক বিবরণ তুলে ধরেন তিনি। নিজের চোখের সামনেই তার একমাত্র ছেলে মুসা গুলিবিদ্ধ হয়। একই বুলেটে শহীদ হন মা মায়া ইসলাম। বাচ্চা ছেলেটি বেঁচে থাকলেও কথা বলতে পারছে না। ফলে তছনছ হয়ে যায় তাদের পরিবারের সব স্বপ্ন। ২৩ অক্টোবর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন কার্নিশে ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ হওয়া আমির হোসেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ওই দিন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান। আসামিকে অভিযোগ পড়ে শোনান তিনি। এরপর নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন চঞ্চল। ১৬ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন।

এ মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। হাবিবুর ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো: রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো: মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। গত ১০ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

গত ১ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২৫ আগস্ট পলাতক আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজিরের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়। গত ৭ আগস্ট প্রসিকিউশনের পক্ষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফর্মাল চার্জ) দাখিল করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। গত ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।

গত ২৬ জানুয়ারি রাতে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে সাবেক এএসআই চঞ্চল সরকারকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি দল। এর নেতৃত্ব দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা।