- ৫০টি সেমিনারে লাগবে ৮০ লাখ টাকা
- ২৬ পরামর্শকে খরচ ২৭.১৪ কোটি টাকা
- ৪ শতাংশ সুদে সরকার থেকে ঋণ নেয়া হবে
সরকার পরিবর্তন হলেও দেশের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নে অস্বাভাবিক খরচের পুরনো চরিত্র বদলায়নি। ১৭৫ কোটি টাকা খরচে পায়রা বন্দরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম ও সুবিধাদি সংযোজন প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশী-বিদেশী মিলে ২৬ জন পরামর্শকের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে খরচ ২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আর ৫০টি সেমিনার করতে হবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে। এখানে খরচ ৮০ লাখ টাকা। এই খরচে চরমভাবে আপত্তি জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিএসসি) ব্যয় সাশ্রয়ে প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতের খরচ কমানোর নির্দেশ দিয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। সরকার থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে গ্রেসপিরিয়ডসহ ২০ বছরে টাকা পরিশোধ শর্তে অর্থায়ন করা হবে।
প্রকল্প দলিলে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্দরের সক্ষমতা বছরে আট লাখ টিইইউ, ১০ লাখ টন বাল্ক এবং এক কোটি ২০ লাখ টন কয়লা। অটোমেশন চালু হলে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও ইয়ার্ডে স্থানান্তরের কাজ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালনা করা যাবে। এতে গ্যান্ট্রি ক্রেন ও স্ট্যাকিং ক্রেন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়বে এবং জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমবে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করছে। দেশের উন্নয়নে সমুদ্রবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অনেকটাই নির্ভর করে সমুদ্রকেন্দ্রিক বাণিজ্যের ওপর। দেশের সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে সাড়ে চার কোটি টন। প্রতি বছর তা ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। প্রতি মাসে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ১০০টির বেশি জাহাজ পায়রা বন্দরে আসবে, এমন হিসাবও সভায় তুলে ধরা হয়েছে। এ পরিমাণ পণ্য ও জাহাজ দক্ষতার সাথে ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম প্রয়োজন।
১৬০ কোটি থেকে প্রস্তাব ১৭৫ কোটি টাকা
মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালে পায়রা বন্দরের কার্যক্রমে অটোমেশন চালুর লক্ষ্যে প্রকল্পটির প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিল ১৬০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে। তখন বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ২০২৫ সালের ২৯ জুন প্রকল্পটির ওপর প্রথম পিইসি সভা হয়। সেই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠন করে আবার প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। এবার প্রকল্পটির প্রাক্বলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৫ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নকাল প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত; অর্থাৎ প্রথম প্রস্তাবের তুলনায় প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। একই সাথে বাস্তবায়নকালও নতুন করে নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। পিইসি সভায় প্রকল্পের মেয়াদ ‘যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণের’ সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে।
২৬ পরামর্শকের জন্য ২৭ কোটি টাকা
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে। ডিপিপিতে ২৬ জন পরামর্শক এবং তাদের পরামর্শক সেবার জন্য ২৭ কোটি ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়। জনপ্রতি এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা খরচ হবে। প্রকল্পটি ভৌত অবকাঠামো বিভাগে আলোচনায় ২৬ জনের পরিবর্তে ডিজাইন পর্যায়ে পাঁচজন আন্তর্জাতিক এবং সুপারভিশন পর্যায়ে পাঁচজন দেশীয় পরামর্শক রাখার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে; অর্থাৎ পরামর্শকের সংখ্যা ২৬ থেকে কমিয়ে ১০ জনে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সাথে পরামর্শকদের সম্মানী পর্যালোচনা করে যৌক্তিকভাবে কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরামর্শক ব্যয়ের প্রস্তাবিত অঙ্কটি প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। পিইসি সভার সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প ব্যয় কমে আসবে বলে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন।
প্রকল্পে ৫০টি সেমিনারের প্রয়োজন কেন?
প্রকল্প দলিলের তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্পে ৫০টি সেমিনার ও সম্মেলনের জন্য ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পর্যালোচনা সভায় এ নিয়ে আপত্তি ওঠে। পরে ৫০টির পরিবর্তে মাত্র পাঁচটি সেমিনার ও সম্মেলনের জন্য আট লাখ টাকা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। একইভাবে প্রচার ও বিজ্ঞাপনের বরাদ্দ ১৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে আট লাখ টাকা, কম্পিউটার সামগ্রী ২০ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা, মুদ্রণ ও বাঁধাই আট লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা, স্ট্যাম্প ও সিল দুই লাখ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য মনিহারি খাতে ১৫ লাখ থেকে দুই লাখ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ শুধু এই কয়েকটি খাতেই প্রস্তাবিত ব্যয়ের বড় কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বাদ দিতে হবে নানা ধরনের ব্যয়
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পিইসি সভায় প্রকল্পের ডিপিপি থেকে আপ্যায়ন ব্যয়, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট ও মডেম রিচার্জ, টেলিফোন, বই ও সাময়িকী, অফিস ভবন ভাড়া, অনিয়মিত শ্রমিকের মজুরি, কমিশন, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ, পেট্রল-অয়েল-লুব্রিকেন্ট, গ্যাস ও জ্বালানি, সার্ভে, অনুষ্ঠান ও উৎসব, মোটরযান, ফার্নিচার ও ফিক্সার, কম্পিউটার, অফিস সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রের মতো বিভিন্ন অঙ্গ বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি মূলত পায়রা বন্দরের পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, সফটওয়্যার ও সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য নেয়া হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়- এমন ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিয়েছে।
প্রযুক্তি অবকাঠামোর ব্যয়ও যাচাই হবে
প্রকল্পে ব্যাকবোন নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, সার্ভার ও সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা, হ্যান্ডহেল্ড টার্মিনাল, জেটি ও কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন (সিএফএস) অপারেশন, ভিডিও নজরদারি, কম্পিউটার সফটওয়্যার ও ডেটাবেজের মতো প্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব রয়েছে। এসব খাতের ব্যয়ও সরাসরি অনুমোদন না দিয়ে বাজারদর যাচাই কমিটি বা টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে যাচাই করে নির্ধারণের সিদ্ধান্ত দিয়েছে পিইসি। এতে প্রকল্পের প্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে অতিমূল্যায়ন বা অযৌক্তিক দর নির্ধারণের সুযোগ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণেও কাটছাঁটের নির্দেশ
এ দিকে জানা গেছে, প্রকল্পে প্রশিক্ষণের জন্য থোক হিসেবে তিন কোটি ৬১ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু কী বিষয়ে প্রশিক্ষণ হবে, কতটি প্রশিক্ষণ হবে, কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে অংশ নেবেন এবং প্রশিক্ষণ বাবদ সম্মানী কত হবে- এসব বিস্তারিত উল্লেখ ছিল না। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ, এসব তথ্য ডিপিপিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সাথে প্রশিক্ষণ খাত আলাদা করে না দেখিয়ে পণ্য ক্রয় পরিকল্পনার সাথে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারি ঋণের টাকায় হবে প্রকল্প
পরিকল্পনা কমিশনকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রকল্পটি সরকার প্রদত্ত ঋণের অর্থে বাস্তবায়ন করা হবে। ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ, গ্রেস পিরিয়ড পাঁচ বছর এবং পরিশোধকাল ২০ বছর। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি রয়েছে বলেও জানানো হয়। প্রকল্পে যে ব্যয় হবে, তার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই পড়বে। এ কারণে প্রকল্পের প্রতিটি ব্যয় যৌক্তিক ও বাজারদরভিত্তিক কি না, তা নিশ্চিত করার গুরুত্বও বেশি।
ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলছে
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কয়েকজনের সাথে প্রকল্পটি নিয়ে কথা হলে তারা জানান, পরিকল্পনা কমিশন নির্দেশ দিয়েছে, পিইসির পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তগুলো প্রতিপালন করে সংশোধিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিভাগে জমা দিতে হবে। এ ছাড়া প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সাথে কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ, তা-ও ডিপিপিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদও নতুন করে যৌক্তিক পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।



