মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা নিয়ে সংশয়

Printed Edition

গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ক্ষেত্রে পরপর বেশ কিছু কৌশলগত জয় পেলেও মধ্যপ্রাচ্যে কাক্সিক্ষত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে ইসরাইল। খ্যাতনামা দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির তত্ত্ব অনুযায়ী, বলপ্রয়োগ বা ক্ষমতার প্রদর্শন কোনো রাষ্ট্রকে সামরিক আধিপত্য এনে দিতে পারলেও তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্ব বা সর্বজনগ্রাহ্য কর্তৃত্ব তৈরি করতে সক্ষম হয় না। কেবল যুদ্ধকৌশল দিয়ে ধ্বংসসাধন করা গেলেও তা মানুষের সমর্থন জয় কিংবা একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থা গঠনে কাজে আসে না।

বর্তমানে সামরিক সক্ষমতার চরম শিখরে অবস্থান করছে ইসরাইল। হামাসের অবকাঠামো ধ্বংস, হিজবুল্লাহর উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব পরাস্ত কিংবা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে আঘাত হানা তাদের শক্তিরই প্রমাণ। তবে এসব তাৎক্ষণিক সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের কোনো স্থায়ী গ্রহণযোগ্যতা বা সুসংহত কাঠামোগত প্রভাব তৈরি করতে পারেনি; বরং ওয়াশিংটনের সুরক্ষা ব্যতীত তাদের সামরিক শক্তির স্বকীয় স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতেও দেশটির এই সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে। হাই-টেক ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি থাকলেও এসব উদ্যোগ মূলত মার্কিন কাঠামোর ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। তেল আবিবের পুঁজিবাজার থেকে শুরু করে মুদ্রানীতি- সবই বিশ্ব অর্থনীতির মূল স্রোতের সাথে সংবেদনশীল। একই সাথে নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সহায়তার ওপর নিরবচ্ছিন্ন নির্ভরতা দেশটিকে স্বাবলম্বী শক্তির বদলে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে রূপ দিয়েছে।

আর্থিক ও প্রযুক্তিগত অর্জনের আড়ালে দেশটির মানবসম্পদ সঙ্কট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। বিচার ব্যবস্থার সংস্কারকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাতের ফলে গত বছরগুলোতে বিপুল সংখ্যক পেশাদার ও দক্ষ নাগরিক দেশ ত্যাগ করেছেন। উদ্ভাবনসংক্রান্তÍ জাতীয় কর্তৃপক্ষও গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি নিয়ে সতর্ক করেছে। ফলে কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর ভর করে টিকে থাকা অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ভিত্তি দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে। সামরিক অর্জনের বিপরীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের আইনি ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় বড় ধস নেমেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যা সম্পর্কিত অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পরোয়ানা সামাল দিতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে দেশটির ভাবমূর্তি মারাত্মক সঙ্কটে পড়েছে। বৈশ্বিক জরিপগুলোতে ইসরাইলের বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে এবং তাদের ঐতিহ্যগত মিত্র দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ জনমতেও বড় ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছে।

ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে একক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও ইসরাইল বর্তমানে বেশ কোণঠাসা। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট পথরেখা ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক না করার নীতিতে অনড় রয়েছে সৌদি আরব। পাশাপাশি কায়রো, দোহা, আঙ্কারা ও আম্মানের ভূমিকা আঞ্চলিক রাজনীতিতে অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ফলে ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য বা নিরাপত্তার একক নীতি নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে; বাধা সৃষ্টির ক্ষমতা থাকলেও কৌশলগত নেতৃত্ব তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সঙ্কটময় এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো এখন ইসরাইলকে বাদ দিয়েই নিজেদের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করছে। গ্যাস সরবরাহ থেকে আঞ্চলিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক- সব ক্ষেত্রে বিকল্প পথ তৈরি করা হচ্ছে, যা ইসরাইলকে কৌশলগত অংশীদারের বদলে একটি এড়ানো সম্ভব এমন বাধায় পরিণত করেছে। এ অবস্থায় মার্কিন সমর্থন কিংবা বাহ্যিক সহায়তার ভিত দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থার ওপর অস্থিতিশীলতার ঝুঁঁকি দেখা দেবে।

মূলত সামরিক শক্তিমত্তা আর রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগ্যতা এক বিষয় নয়। আধুনিক সামরিক ব্যবস্থা দিয়ে ইসরাইল সাময়িকভাবে প্রভাব ধরে রাখতে পারলেও মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বা সম্মতিভিত্তিক একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের ওপর ভর করে সাময়িক প্রাধান্য দেখা গেলেও বৈধতার এ তীব্র সঙ্কট এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর বিকল্প জোট গঠনের উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রূপরেখাকে ইসরাইলকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।