- আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সুফল মিলছে না দেশীয় বাজারে
- প্রতিযোগিতা কমছে, বোঝা বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাদের
দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম কমলেও তার সুফল দেশীয় বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে না। বরং চাল, ভোজ্যতেল, ডিম, পেঁয়াজ, চিনি ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বারবার বেড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তব সীমাবদ্ধতা মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি, মজুদদারি এবং বাজার কারসাজির অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এর ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমছে এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির পুরো বোঝা বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক মাস ধরে নিত্যপণ্যের দামে ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে। মে মাসের তুলনায় জুন ও জুলাইয়ে চাল, ভোজ্যতেল, ডিম, পেঁয়াজ ও মসুর ডালসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম আবারো বেড়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদর পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত তিন মাসে মোটা চালের দাম প্রতি কেজিতে প্রায় তিন থেকে পাঁচ টাকা, মিনিকেট চাল চার থেকে ছয় টাকা, খোলা সয়াবিন তেল পাঁচ থেকে ১০ টাকা এবং ডিমের দাম প্রতি ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্য দিকে মৌসুমে আলু ও পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ায় কিছু সময়ের জন্য দাম কমলেও পরে পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং মজুদের অভিযোগের কারণে তা আবার বাড়তে শুরু করে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম কমলেও সেই সুবিধা দেশীয় বাজারে দ্রুত পৌঁছায় না। ফলে আন্তর্জাতিক মূল্যহ্রাসের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।
রাজধানীর কাওরান বাজার, শ্যামবাজার, যাত্রাবাড়ী এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, রাজশাহীর সাহেববাজার ও খুলনার বড় বাজারসহ দেশের প্রধান পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে চাল, ভোজ্যতেল, ডিম, পেঁয়াজ, আলু, চিনি ও ডালের দামে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বাজার কারসাজি কতটা দায়ী, আর কতটা প্রভাব ফেলছে আমদানি, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তব সঙ্কট।
কাওরান বাজারের কয়েকজন খুচরা ব্যবসায়ী জানান, সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পাইকারি বাজারে দামের অস্থিরতার কারণে খুচরা পর্যায়ে দাম কমানো যাচ্ছে না। অন্য দিকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, ডলারের উচ্চমূল্য, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, অযৌক্তিক মজুদ, মূল্যতালিকা প্রদর্শনে অনিয়ম এবং অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন জেলায় হাজারের বেশি বাজার তদারকি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মূল্য কারসাজি, অতিরিক্ত দাম আদায় এবং ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বহু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই পণ্যের দাম এক দিনের ব্যবধানে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও ব্যবসায়ীরা দিতে পারেননি।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, বাজারকে শুধু ‘সিন্ডিকেট’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব চিত্র উঠে আসে না। তাদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট, এলসি খোলার জটিলতা, ডলারের উচ্চ বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং মৌসুমি উৎপাদন ঘাটতির কারণে বিশেষ করে ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও গমের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানিকারকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সাথে ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসার অর্থায়ন ব্যয়ও বেড়েছে। এর প্রভাবে অনেক আমদানিকারক আগের তুলনায় কম পরিমাণে পণ্য আমদানি করছেন, যা বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু বাজার সিন্ডিকেট কিংবা শুধু সরবরাহ সঙ্কট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে উভয় কারণই ভিন্ন মাত্রায় কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘যেসব পণ্য আমদানিনির্ভর, সেখানে ডলার সঙ্কট, এলসি জটিলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার পরও যদি দেশীয় বাজারে তার সুফল দ্রুত না আসে, তাহলে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং প্রতিযোগিতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’
তার মতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় যত বেশি মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে, মূল্য তত বাড়বে। পাশাপাশি কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাবে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ পান।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বাজারে কারসাজির অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। আবার সব মূল্যবৃদ্ধির জন্য শুধু সিন্ডিকেটকেই দায়ী করাও বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, “প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল হলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতিও থাকে।’ তার মতে, উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল নজরদারি, গুদামজাত তথ্য প্রকাশ এবং নিয়মিত বাজার তথ্য উন্মুক্ত করা গেলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদক ও ভোক্তার দামের ব্যবধান এখনো অনেক বেশি। অনেক সময় কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, শহরের বাজারে সেই পণ্য দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি হয়। এই অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে। তিনি আরো বলেন, বাজারে চাহিদা কমলেও পাইকারি পর্যায়ে কাক্সিক্ষত হারে দাম কমে না। ফলে খুচরা ব্যবসায়ীরাও মূল্য কমানোর সুযোগ পান না। অন্য দিকে একই পণ্যের দাম এক বাজার থেকে অন্য বাজারে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যায়, যা কার্যকর বাজার তদারকির ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
তার মতে, শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত বা অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। এজন্য আমদানি পরিকল্পনা উন্নত করা, পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা, প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা, নিয়মিত বাজার তথ্য প্রকাশ এবং সরবরাহ চেইনে অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সাথে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, টিসিবি, কৃষি বিপণন অধিদফতর এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বিত বাজার তদারকি আরো জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নিত্যপণ্যের বর্তমান মূল্য অস্থিরতার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করছে না। ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয় এবং কিছু ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি- সব মিলিয়ে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে একদিকে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, অন্য দিকে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সাথে উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা গেলে নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।



