কাগজে-কলমে বড় অঙ্কের বরাদ্দ থাকলেও উপকূলের জলবায়ু তহবিল নিয়ে চলছে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় অঞ্চলের চার কোটিরও বেশি মানুষের জীবন এখন বিপন্ন। বর্ষা এলেই ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে নোনা পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর লবণাক্ততার আগ্রাসনে প্রতিবছর ভিটেমাটি হারাচ্ছে হাজারো পরিবার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে জলবায়ু অভিযোজন খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হলেও উপকূলের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থাপনা, দূরদর্শিতা ও যথাযথ পরিকল্পনার অভাব, ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প এলাকা নির্বাচন, বাস্তবায়নের ঘাটতি, বনায়নে অনিয়ম, অপ্রতুল বাজেট, ঋণ ও অনুদানের বৈষম্য এবং সুপেয় পানির স্থায়ী সঙ্কটকে অবহেলা করার কারণে উপকূলের মানুষ এই তহবিলের কাক্সিক্ষত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নে নেয়া প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগই উপকূলের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কোনো কাজে আসছে না। তাদের ভাষ্য, তহবিলের অর্থ অন্য খাতে অপচয় না করে সরাসরি টেকসই বাঁধ ও সুপেয় পানির মতো জীবন রক্ষাকারী খাতে খরচ করা জরুরি ছিল।
অভিযোজনের নামে ‘নগরায়ন’
নীতিমালা অনুযায়ী, এই তহবিলের মূল লক্ষ্য উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির স্থায়ী সঙ্কট নিরসন এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন। তবে বিগত সময়ের প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তহবিলের একটি বড় অংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পৌরসভাগুলোকে। প্রকল্পের টাকা দিয়ে জলবায়ু ঝুঁকিমুক্ত বা কম ঝুঁকিপূর্ণ পৌর এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন, এমনকি সড়ক কাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সাধারণ নগর উন্নয়ন প্রকল্পকেই ‘জলবায়ু অভিযোজন’ নাম দিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
অবশ্য চলতি বাজেটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন ২৯টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনায়ন সম্প্রসারণ, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ বিতরণ এবং লবণাক্ত এলাকায় পানির তীব্র সঙ্কট মেটাতে গভীর নলকূপ স্থাপনের মতো কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
টিআইবি ও পরিবেশবাদীদের যৌথ বিশ্লেষণ
উপকূলের পরিবেশ ও মানবাধিকার রক্ষা সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক যৌথ বিশ্লেষণ এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে জলবায়ু তহবিলের অর্থ ব্যয়ের এক হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। দেখা গেছে, উপকূলের জীবন-মরণ সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে এই অর্থ ব্যয় হচ্ছে কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক প্রকল্পগুলোতে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু তহবিলের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে বিভিন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়নে সোলার স্ট্রিট লাইট বা সৌর সড়কবাতি স্থাপনে, যার সাথে উপকূলীয় অভিযোজনের সম্পর্ক নামমাত্র। গ্রামীণ ও চরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যখন সুপেয় পানির জন্য হাহাকার করছে, তখন তহবিলের টাকা ঢালা হচ্ছে শহরের ড্রেন, কালভার্ট ও ইকো-পার্ক নির্মাণের পেছনে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, উপকূলীয় বনায়ন বা ম্যানগ্রোভ সুরক্ষার নামে কোটি টাকা খরচ করে চারা রোপণ করা হলেও, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশির ভাগ গাছই মারা যাচ্ছে। অন্য দিকে জলবায়ু তহবিলের মাধ্যমে স্থায়ী পানি শোধনাগার বা বড় পরিসরে টেকসই প্রযুক্তি স্থাপনের সুযোগ থাকলেও সেখানে নেয়া হয়েছে কিছু ক্ষণস্থায়ী প্রকল্প; যা তদারকির অভাবে এক-দুই বছরের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ছে। ফলে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বরগুনার মতো উপকূলীয় জেলাগুলোতে সুপেয় পানির সঙ্কট এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। মাইলের পর মাইল হেঁটে উপকূলীয় নারীদের খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তুচ্যুতির শঙ্কা
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অন্যান্য কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি মানুষ তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান ছেড়ে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হবেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই বাস্তুচ্যুতির হার অন্য যেকোনো অভ্যন্তরীণ কারণের চেয়ে বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। অথচ ২০০৯ সালের কোপেনহেগেন সম্মেলনে উন্নত বিশ্ব জলবায়ু মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার করে দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। উপরন্তু আন্তর্জাতিক তহবিলের প্রায় ৮০ শতাংশই চলে যাচ্ছে কার্বন নিঃসরণ কমানোর (মিটিগেশন) খাতে, যেখানে বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশের জন্য অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন) তহবিল বেশি জরুরি। এ অবস্থায় ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ হ্রাস করার পাশাপাশি অভিযোজন তহবিল দ্বিগুণ করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও ‘পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক মো: মাহমুদুর রহমান পাপন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জলবায়ুর জন্য বরাদ্দ তহবিল যথাযথ কাজে না লাগার মূল কারণ হলো ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প এলাকা নির্বাচন, বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব এবং সুপেয় পানির মতো মৌলিক সঙ্কটকে অবহেলা করা।’
তার মতে, উপকূলে প্রকৃত সুফল পৌঁছাতে হলে রাষ্ট্রের নিজস্ব জলবায়ু বাজেট অন্তত ৩ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে প্রকল্প প্রণয়ন এবং তহবিলের টাকা কোথায় কিভাবে খরচ হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে পরিবেশবিদ ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী জবাবদিহি কমিটি বা তদারকি সেল গঠন করা জরুরি। একই সাথে এ খাতের বাজেটের বেশির ভাগ উপকূলের অবকাঠামো উন্নয়নে সরাসরি বরাদ্দ না দিলে এই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান অসম্ভব।



