বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা অতিরিক্ত মূল্য, অতিরিক্ত সমতা ও ক্রমবর্ধমান রাজস্ব চাপের সমাধান শুধু জরুরি আইন বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় সংস্কার কমিশনের (এনআরসি) সর্বশেষ বিশ্লেষণ বলছে- এই সঙ্কটের শিকড় প্রোথিত রয়েছে চুক্তিকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতিতে। তাই সংস্কার হতে হবে ধাপে ধাপে, বাস্তবসম্মত ও আইনগতভাবে সতর্ক।
সংস্কারের মূল লক্ষ্য ৪টি
কমিশন চারটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রথমত, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দামে ব্যয়-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, কঠোর চুক্তি ও অতিরিক্ত সমতা থেকে সৃষ্ট সরকারি আর্থিক ঝুঁকি কমানো। তৃতীয়ত, ক্রয়, নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনায় জবাবদিহি পুনর্গঠন। চতুর্থত, ভবিষ্যতে যেন আবার গোপনীয় ও খেয়ালখুশিমতো সিদ্ধান্ত ফিরে না আসে- সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
কমিশনের মতে, একটির অগ্রগতি অন্যগুলোর সহায়তা ছাড়া টেকসই হবে না।
স্বচ্ছতা-সব সংস্কারের ভিত্তি
ঘজঈ স্পষ্ট করে বলছে, সংস্কারের প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হলো স্বচ্ছতা। সব বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ), সংশোধনী, প্ল্যান্টভিত্তিক ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, জ্বালানি পেমেন্ট, ভর্তুকি এবং সার্বভৌম গ্যারান্টির তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
এই স্বচ্ছতা তিনভাবে কাজ করবে-সংসদ ও জনসাধারণের নজরদারি নিশ্চিত করবে, ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক ও সুনামগত চাপ বাড়াবে এবং পুরনো চুক্তি পুনঃআলোচনায় সরকারকে শক্ত অবস্থানে রাখবে।
প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রই মূলনীতি
ভবিষ্যতের সব বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রকে আবার ‘ডিফল্ট’ ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে কমিশন। আনসোলিসিটেড প্রস্তাব থাকলেও তা কঠোরভাবে সীমিত করতে হবে এবং বাধ্যতামূলক প্রতিযোগিতামূলক যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে নিতে হবে।
জরুরি ক্রয়পথ থাকলে সেটি হতে হবে সময়সীমাবদ্ধ, নির্দিষ্ট ও পরে পর্যালোচনার আওতায়।
চুক্তির ঝুঁকি পুনর্বিন্যাস
সব চুক্তি একসাথে বাতিল বা নতুন করে করা সম্ভব নয়- এ কথা স্বীকার করেই ঘজঈ বলছে, লক্ষ্যভিত্তিক পুনর্বিন্যাস জরুরি। বিশেষ করে যেসব চুক্তিতে ব্যবহার কম হলেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বেশি, বৈদেশিক মুদ্রা সূচক অবারিত, কিংবা ‘টেক-অর-পে’ ধারা অযৌক্তিক, সেগুলো অগ্রাধিকার পাবে।
কমিশনের ভাষায়, কিউইইইএস আইনের অধীনে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলো ‘সৎ বিশ্বাসে’ হয়েছে, এই দাবি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ব্যাপক শাসনব্যর্থতা, অতিরিক্ত মূল্য ও ঝুঁকির একতরফা হস্তান্তর প্রমাণ করে যে, এসব ঝুঁকি তখনই দৃশ্যমান ছিল। ফলে পুনঃআলোচনা শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, ন্যায়সঙ্গতও।
মামলা নয়, আলোচনার পথ
আন্তর্জাতিক সালিসে যাওয়া ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত- এ কথা মেনে নিয়েই এনআরসি বলছে, সৎ বিশ্বাসে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনঃআলোচনা সবচেয়ে কম ঝুঁকির পথ। লক্ষ্য হবে ভবিষ্যৎমুখী সংশোধন- যেমন ঋণ পরিশোধ শেষে ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সূচকে সীমা আরোপ, ব্যবহার অনুযায়ী স্থায়ী চার্জ সামঞ্জস্য করা।
বকেয়া অর্থকে চাপের হাতিয়ার নয়, বরং আর্থিক সীমাবদ্ধতার লক্ষণ হিসেবে দেখে আলোচনায় ব্যবহার করার পরামর্শও দিয়েছে কমিশন।
পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ শক্ত করা
বিদ্যুৎ খাতের মাস্টার প্ল্যান যেন পরে সিদ্ধান্ত বৈধ করার কাগজ না হয়- সেটিই চ্যালেঞ্জ। তাই চাহিদা পূর্বাভাসে রক্ষণশীলতা, পরে ভুলের মূল্যায়ন, পরিকল্পনা ও প্রকল্প অনুমোদনের সরাসরি যোগসূত্র এবং জ্বালানি-নেটওয়ার্ক প্রস্তুতির সাথে সামঞ্জস্য বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
একই সাথে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও বিশ্লেষণ সম করে তোলার সুপারিশ রয়েছে।
সংসদের কাছে জবাবদিহি
অতীতের বড় ব্যর্থতা বিবেচনায় ঘজঈ সংসদের কাছে দায়বদ্ধ একটি স্বাধীন এনার্জি ওভারসাইট কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই সংস্থা বড় চুক্তি আগেভাগে পর্যালোচনা করবে, পুনঃআলোচনা নজরদারি করবে এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
ধাপে ধাপে রূপান্তর
সংস্কার একদিনে নয়- কমিশনের রোডম্যাপ অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদে (১-২ বছর) স্বচ্ছতা ও নজরদারি, মধ্যমেয়াদে (৩-৫ বছর) চুক্তি সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ শক্তকরণ, দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা।
এনআরসির ভাষায়, বিদ্যুৎ খাতের সঙ্কট কাঠামোগত হলেও অপ্রতিরোধ্য নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক ক্রমে সংস্কার এবং জবাবদিহি ফিরিয়ে আনতে পারলে এই খাত আবার আর্থিকভাবে টেকসই ও উন্নয়নবান্ধব পথে ফিরতে পারে।



