নিজস্ব প্রতিবেদক
আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে ঘটনার ৯ম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী ও জেরা সম্পন্ন করেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: নিজাম উদ্দিন হাওলাদার। ভারতের সাথে উত্তেজনার ক্ষেত্রে পাকিস্তান অবশ্যই এই গোষ্ঠীকে একত্র করার এবং কোনো না কোনো রূপে চুক্তিটি কার্যকর করার চেষ্টা করবে। ভারতের জন্য এই চুক্তির অর্থ কী এ বিশ্লেষণে মক্কা চুক্তির ঘোষণার জবাবে ভারত বলেছে, তারা পশ্চিম এশিয়ার সঙ্ঘাতের ঘটনাবলি এবং বিশেষ করে এই চুক্তির ‘প্রভাব’ জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব উভয় দিক থেকেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ২০১১ ও ২০১০-১৩ সাল পর্যন্ত বলেশ্বর নদীর মোহনা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত অর্ধশতাধিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীর এ জবানবন্দীকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আইনি সংশ্লিষ্টরা।
জবানবন্দীতে ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন হাওলাদার জানান, ২০১০ সালে তিনি বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। সে বছরের ১৭ মে তিনি দাফতরিক বিশেষ কাজে বাগেরহাট পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন। বেলা অনুমান ৩টার দিকে শরণখোলা থানার এক চৌকিদার ফোনে তাকে জানায়, চাল রায়েন্দা এলাকায় বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে একটি গলিত লাশ পড়ে রয়েছে। চৌকিদার ফোনে ওসিকে জানান, লাশটির শরীরে জমাটবাঁধা সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল, পেটের অংশ কাটা, মাথা কাপড়ে ঢাকা এবং হাত-পা শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় ছিল।
চৌকিদারের ফোন পেয়ে ওসি ঘটনাটি থানায় কর্মরত সাব ইনস্পেক্টর (এসআই) ইকবালকে জানান এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এসআই ইকবাল সাধারণ ডায়েরি (জিডি)-ভুক্ত করে ঘটনাস্থলে যান, লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট সদর হাসপাতালে প্রেরণের উদ্যোগ নেন। তবে ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে আসায় লাশটি ওই রাতে থানাতেই রাখা হয়। ঐ দিন চৌকিদার বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করলে এসআই ইকবাল মামলাটি রুজু করে নিজেই তদন্তভার গ্রহণ করেন। রাতে থানায় ফিরে ওসি নিজাম উদ্দিন গলিত ও পচন ধরা লাশটির বাহ্যিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। পরদিন সকালে লাশটি বাগেরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি বাগেরহাট কবরস্থানে দাফন করা হয়।
জবানবন্দীতে সাবেক এ ওসি আরো উল্লেখ করেন, লাশ উদ্ধারের আনুমানিক দুইদিন পর ঝালকাঠি থেকে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করে দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া লাশটি তার ভাইয়ের। তিনি জানান, দুই-তিন মাস পূর্বে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থেকে তার ভাই অপহৃত হন এবং এ বিষয়ে কোটালীপাড়া থানায় একটি অপহরণ মামলাও রয়েছে। এর চার-পাঁচ দিন পর ওই ব্যক্তির দুই ভাই, স্ত্রী ও চাচা শরণখোলা থানায় আসেন। থানায় রক্ষিত মৃতের পরনের শার্ট ও প্যান্ট দেখে স্বজনেরা নিশ্চিত হন যে, লাশটি সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলামের। স্বজনরা জানান, পিলখানা ঘটনার পর পলাতক অবস্থায় নজরুল গোপালগঞ্জের একটি ক্লিনিকে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। তারা লাশ নিজের এলাকায় নেয়ার আবেদন জানালে ওসি স্পষ্ট জানান, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের অনুমতি সাপেক্ষে লাশ হস্তান্তর করা যাবে।
এর কিছুদিন পর খুলনা বিডিআর সেক্টর থেকে একজন কর্নেল পত্রিকার খবরের সূত্রে ওসিকে ফোন করে লাশের বিস্তারিত জানতে চান এবং ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সহায়তার আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে বিডিআর থেকে এক হাবিলদারও থানায় আসেন। তবে এ প্রক্রিয়া চলাকালেই, ঘটনার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় নিজাম উদ্দিনকে রামপাল থানায় বদলি করা হয়। জবানবন্দীতে তিনি আরো বলেন, তৎকালীন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় লাশ পাওয়ার খবর নিয়মিত পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতো।
জবানবন্দী শেষ হলে আসামিপক্ষ অর্থাৎ জিয়াউল আহসানের পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী মো: সাহিদুর রহমান ও মিজানুর রহমান সাক্ষীকে জেরা করেন। জেরায় সাবেক ওসি জানান, তিনি লাশের সম্পূর্ণ অংশ দেখতে না পারলেও যতটুকু দেখেছেন তাতে কোনো গুলির চিহ্ন দেখেননি, তবে কানের কাছে রক্তের মতো ছোপ দেখেছিলেন। ঘটনার এতদিন পর ফোন করা চৌকিদার, ঝালকাঠি থেকে ফোন করা ব্যক্তি বা থানায় আসা স্বজনদের নাম-পরিচয় বা জিডি নম্বর তাৎক্ষণিকভাবে হুবহু স্মরণ করতে না পারার বিষয়টিও জেরায় উঠে আসে। আসামিপক্ষ দাবি করে, তদন্ত কর্মকর্তার নিকট প্রদত্ত তথ্য ও আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে অসঙ্গতি রয়েছে এবং সাক্ষী শেখানো মতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে সাক্ষী নিজাম উদ্দিন বলেন, তিনি যা দেখেছেন ও জানেন সম্পূর্ণ সত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও শাইখ মাহদী। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যান্য আইনজীবী।
চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। এর মধ্যে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী খালঘেঁষা বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। শুনানি শেষে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে আগামী ৩১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।



