সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কারে জনমত গঠন করতে পারছে না নাগরিক সমাজ। সুশীলসমাজ হিসাবে পরিচিত এই আলোকিত সমাজ এক সময় রাজনৈতিক মত পথের ঊর্ধ্বে উঠে জাতিকে দিকনির্দেশ করার মতো ভূমিকা পালন করত। রাষ্ট্র, পরিবার ও ব্যবসায়িক কাঠামোর বাইরে এক স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক পরিসর তৈরি হতো তাদের নিয়ে। সচেতন নাগরিকরা সংগঠিত হয়ে জনস্বার্থ, অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতেন। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে সরকারকে সমালোচনা, পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহির আওতায় আনার মাধ্যমে নাগরিক সমাজ ঐতিহাসিকভাবে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। রাজনৈতিক গুণগত পরিবর্তনেও এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সময়ের সাথে সাথে এই নাগরিক সমাজের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার পরিবর্তে এর একটি বড় অংশ দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে সরকারি নীতি ও কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনার জায়গা দখল করছে তোষামোদ। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পাওয়ার আকাক্সক্ষা বড় ভূমিকা রাখছে। কখনো সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়ে লাভজনক পদ পাওয়া, আবার কখনো নিজস্ব সংগঠনের জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা- এসব কারণেই নাগরিক সমাজের নিরপেক্ষ অবস্থান ক্ষুণœ হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, নাগরিক সমাজের এই দুর্বলতার সুযোগও সরকারগুলো বিভিন্ন সময় কাজে লাগিয়েছে। স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়া, সমালোচনাকে নিরুৎসাহিত করা কিংবা চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে নাগরিক সমাজের গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় কমেছে এবং ভবিষ্যতেও তা আরো ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
তত্ত্বগতভাবে নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রের নীতি, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি জানায়। একই সাথে উন্নয়ন ও অধিকার রক্ষায় সচেতন জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই সক্রিয়তা দৃশ্যমান নয় বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নাগরিক সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়। নতুন রাজনৈতিক পরিসরে এই শক্তি পুনরুজ্জীবিত হবে কি না, কিংবা নতুন কোনো ধারার সূচনা হবে কি না- তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। সমালোচকদের মতে, বর্তমান সময়েও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরকারের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করছে না বা ভুলগুলো তুলে ধরছে না। ফলে সরকারের সমালোচনার ভার কার্যত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপরেই ন্যস্ত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে অনেক সময় দলীয় অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলে না।
এ প্রসঙ্গে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, নাগরিক সমাজের ভূমিকা অতীতেও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল এবং বর্তমানেও তা অব্যাহত রয়েছে। তার মতে, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির প্রতি ঝোঁক তৈরি হওয়ায় নাগরিক সমাজের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে নাগরিক সমাজের যে পরামর্শ এসেছে, তার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা উপেক্ষিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ইতিবাচক নয়।
নাগরিক সমাজের আরেক প্রতিনিধি ইকতেদার আহমেদের মতে, বর্তমান সরকার নাগরিক সমাজকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার অনেক ক্ষেত্রেই একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং নাগরিক সমাজের মতামত বা পরামর্শকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিবর্তনে নাগরিক সমাজের কার্যকর ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।
অন্য দিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি আরো কঠোর ভাষায় বলেন, দেশে প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের অস্তিত্বই এখন প্রশ্নের মুখে। তার মতে, যারা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে স্বাধীন মত প্রকাশ ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের জায়গা সঙ্কুচিত হয়েছে।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, অতীতেও ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি একাংশের সমর্থন ছিল এবং যারা সমালোচক ছিলেন, তারাও পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছেন। এই ধারাবাহিকতায় নাগরিক সমাজের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের প্রভাবও ক্রমেই কমেছে। তার ভাষায়, “নাগরিক সমাজ আজ অনেকটাই প্রান্তিক অবস্থায় চলে গেছে”- যা রাজনৈতিক পরিবর্তনে তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও সংশয় সৃষ্টি করে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, নাগরিক সমাজের মূল শক্তি ছিল তার নিরপেক্ষতা, নৈতিক অবস্থান এবং জনআস্থার ভিত্তি। কিন্তু যখন সেই নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তার প্রভাবও স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। বর্তমান বাস্তবতায় নাগরিক সমাজ যদি স্বাধীন ও গঠনমূলক ভূমিকা পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনে তাদের কার্যকর অবদান রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তাই সময়ের দাবি- নাগরিক সমাজকে আবারও তার মূল অবস্থানে ফিরে যেতে হবে। দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে। নইলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় তাদের ভূমিকা ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়বে, আর গণতান্ত্রিক ভারসাম্যও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো: রবিউল ইসলাম মনে করেন, একটি দেশে নাগরিক সমাজের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধনে বিভিন্ন গঠনমূলক পরামর্শ দিয়ে নাগরিক সমাজ বিভিন্ন সময় সরকারকে সহযোগিতা করে, অনেক সময় সেই পরামর্শ গ্রহণ করে সরকার সঠিক পথে পরিচালিত হয়। সরকার যদি ভুল পথেও যায় বা কোনো কাজে ভুল করে থাকে নাগরিক সমাজ সেটিকে শুধরে দিতে পারে সমালোচনা করার মধ্য দিয়ে, আলোচনা, সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভুল-ত্রুটি ধরে দিয়ে কিভাবে কাজ করলে সমাজ তথা জনগণের উপকার হবে সেজন্য গঠনমূলক পরামর্শ দিয়ে থাকে নাগরিক সমাজ। এতে দল ও সরকার উপকৃত হয়। তবে সেই সমালোচনা অবশ্যই গঠনমূলক হতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি মনে করি না বর্তমান সরকার নাগরিক সমাজের কোনো গঠনমূলক কাজে হস্তক্ষেপ করবে। আবার নাগরিক সমাজেরও উচিত হবে না কোনো দলের হয়ে কাজ করা। নিরপেক্ষতা বজায় রেখে নাগরিক সমাজের কাজ করা উচিত। যদি এই কাজটি নাগরিক সমাজ করতে পারে তাহলে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে তারা আবির্ভূত হতে পারে। নাগরিক সমাজের সঠিক ভূমিকা সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও বেশ সহায়ক।


