সংস্কার ও আ’লীগের বিচার দাবি

মাঠে ঘাটে ছুটছেন এনসিপির নেতারা

হাসান আলী
Printed Edition

বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে একেবারেই নতুন মানুষদের নিয়ে গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই দলের নেতাকর্মীদের বেশির ভাগই কখনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। যারা ছিলেন তারাও হয়তো ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি করেছেন। যার ফলে রাজনীতির মাঠ ঘাট ততটা পরিচিত নয় তাদের। ফলে বাংলাদেশের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত ও নি¤œ আয়ের দেশের প্রচলিত ধারার রাজনীতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন দলটির নেতারা। একদিকে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে কাজ করা আবার অন্যদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি। সবমিলিয়ে বেশ বেগই পেতে হচ্ছে তাদের। দলটি সংস্কারের আগে নির্বাচন না চাইলেও বিদ্যমান নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে বেশ অগ্রগতি দেখাচ্ছে। পাশাপাশি বিএনপিসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোও ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছে। ফলে এনসিপির নেতাকর্মীদের হাতে একেবারেই সময় কম। এর মধ্যেই দলটির শীর্ষ নেতারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন সংস্কার ও আওয়ামী লীগের গণহত্যার বিচারের দাবিতে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দলের বার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করছেন তারা। এতে একইসাথে দলের প্রচার এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদেরও প্রচার হচ্ছে বলে মনে করেন দলটির নেতাকর্মীরা।

গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরে ঘুরে পথসভা করেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। এ সময় তার সাথে ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা: তাসনিম জারা, যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক, যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা: মাহমুদা আলম মিতু, মো: আতাউল্লাহ, সংগঠক আরমান হোসেন, আজিজুর রহমান রিজভীসহ কেন্দ্রীয় ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ। এই সফরে বৃষ্টিতে ভিজে এবং তীব্র রোদে পথসভা করে প্রশংসিত হন তাসনিম জারাসহ নেতৃবৃন্দ। হাসনাত আব্দুল্লাহ এ সময় চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, লোহাগাড়া, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন উপজেলায় পথসভা করেন। এ ব্যাপারে কথা হয় হাসনাত আব্দুল্লাহর সাথে। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যেখানেই গিয়েছি সেখানেই মানুষের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। মানুষের নতুন দল নিয়ে জানার আগ্রহ অনেক। আমি মোট ২৫টি জায়গায় পথসভা করেছি। মানুষের মধ্যে এত আগ্রহ দেখেছি, যেটা আশাব্যঞ্জক। ওই দিকে সারজিস আলমও পথসভা করছেন। সব মিলিয়ে মানুষের কাছে যাওয়ার যে কর্মসূচি সেটি চলমান থাকবে। ঈদের আগেই আমার আরো কোনো একটা এলাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।

তুমুল বৃষ্টি উপেক্ষা করেই গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানে পথসভা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। দুপুর থেকে তাদের কর্মসূচি শুরু হয়ে চলে রাত পর্যন্ত। কর্মসূচি চলাকালে নাহিদ ইসলাম মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের কাছে যান এবং এনসিপির দাবি দাওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন বক্তব্য রাখেন। বিকেল ৩টার দিকে মোহাম্মদপুরের সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে তিনি প্রথমে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর মোহাম্মাদপুর কেন্দ্রীয় মসজিদে (কবরস্থান মসজিদ) আসরের নামাজ আদায় করে বিকেল ৫টায় শহীদ সৈকতের কবর জিয়ারত করেন। এরপর জেনেভা ক্যাম্পে প্রথম পথসভায় বক্তৃতা করেন। এ সময় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ এনসিপির নেতাকর্মীদের সাথে এসে কুশল বিনিময় করেন। পথসভা শেষে নাহিদ ইসলামসহ নেতৃবৃন্দ বিহারি জনগোষ্ঠীর একমাত্র স্কুল, ড্রিম স্কুলে ক্যাম্পের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সাথে মতবিনিময় করেন। এরপর শহীদ পার্ক মসজিদে (টাউনহল) মাগরিবের নামাজ আদায় করে টাউনহলের সামনে দ্বিতীয় পথসভা, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তৃতীয় পথসভা এবং রাত সাড়ে ৮টার দিকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে ৪র্থ পথসভা করেন। পথসভাগুলোতে তিনি বিহারি সম্প্রদায়সহ দেশের সব মানুষের নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের জন্য নাগরিক পার্টি কাজ করবে বলে জানান। এ সময় তার সাথে উপস্থিত ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা: তাসনিম জারা, যুগ্ম সদস্যসচিব আকরাম হোসাইন, রিফাত রশীদসহ নেতৃবৃন্দ।

দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার উপজেলা শহরগুলোতে পথসভা করেছেন উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তার সাথে সফরসঙ্গী হিসেবে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলাগুলোর প্রতিনিধিরাও থাকছেন। গত কয়েক দিনে তিনি দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় এবং গতকাল গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলায় পথসভা করেন। পথসভাগুলোতে তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের সাথে মতবিনিময়ও করেন। এনসিপির সাংগঠনিক দাবি-দাওয়া নিয়ে তিনি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে কথাবার্তা বলেন এবং তাদের সমস্যাগুলোর কথা শোনেন। গতকালের পথসভায় সারজিস আলম বলেন, এনসিপির পথসভা শুধু পক্ষে ভোট চাওয়া নয়, মানুষকে সঠিক পথে আনতে, বোঝাতে ও সব দিক সংস্কার করতে কাজ করছি। জনগণের মতামত নিতে প্রত্যক এলাকায় পথসভা করছি।

তিনি বলেন, এলাকার ক্ষমতাশীল বা কোনো মার্কা ও কোনো একটি দলের পূজারি না হয়ে যারা এলাকার কাজ করবেন, পাশে থাকবেন, আগামীতে তাদের নির্বাচিত করুন। উত্তরাঞ্চল সারা দেশ থেকে অবহেলিত। বিগত সময়ে যারা ছিলেন তারা কোনো উন্নয়ন করেননি। কিন্তু উন্নয়নের জোয়ারের কথা শুনিয়েছেন। যেটুকু উন্নয়নের কাজ চলমান আছে, দীর্ঘদিন থেকে কাজ চললেও তারও সুফল পাচ্ছে না মানুষ। এলাকার সব সমস্যাগুলো আগে খুঁজে বের করতে হবে। তাহলেই সমাধানের রাস্তা পাওয়া যাবে। জুলাই আন্দোলন যেমন কোনো রাজনৈতিক দল দিয়ে হয়নি। সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে গিয়েছিল। তেমনি এদেশের উন্নয়নে কোনো দল মার্কা না দেখে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রশাসন দলীয় লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে আজ ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে।

দলের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে কর্মসূচি চলমান থাকবে বলে জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। চট্টগ্রাম, রংপুর ছাড়াও ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, ফেনীসহ বিভিন্ন জেলার কেন্দ্রীয় নেতারাও তাদের নিজ নিজ এলাকায় পথসভা, উঠানবৈঠক করছেন। শীর্ষ নেতারাও মানুষের কাছে যাওয়াকে উৎসাহিত করছেন। নেতারা বলেন, দলের যে চাওয়া পাওয়া সেসব নিয়ে আমরা যত বেশি মানুষের কাছে যাবো তত দ্রুত আমাদের সাংগঠনিক গতি বৃদ্ধি পাবে। মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের যে প্রকৃত আকাক্সক্ষা সেটা বাস্তবায়নে যে আমরা কাজ করছি সেটা তাদের জানানোও আমাদেরই দায়িত্ব। মানুষ যেন আমাদের ওপর তাদের আস্থা রাখে সেই পরিবেশ আমাদেরই তৈরি করতে হবে। সেজন্য প্রতিটি গ্রামে গ্রামে আমাদের ছুটে যেতে হবে। জনমত তৈরি করতে হবে।