শহীদ ইকরামুল হক সাজিদের পরিবার বিচার চায়

হাবিবুল বাশার
Printed Edition
শহীদ ইকরামুল হক সাজিদের পরিবার বিচার চায়
শহীদ ইকরামুল হক সাজিদের পরিবার বিচার চায়

আমাদের একটা হাসিখুশি চারজনের পরিবার ছিল। এখন পরিবারটাই শেষ হয়ে গেছে। ভাইকে হারানোর পর বাবাকেও হারালাম। এখন পরিবারে শুধু আমি আর আমার মা আছি, কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থাপনা বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ইকরামুল হক সাজিদের বড় বোন ফারজান হক। পরিবার প্রতিশোধ চান না, শুধু ৪ আগস্ট সাজিদ হত্যার বিচার চায়।

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার বাঐজান ইউনিয়নের বিল কুকড়ি গ্রামের সন্তান সাজিদের জন্ম ১৯৯৯ সালের ১ মার্চ। অবসরপ্রাপ্ত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার জিয়াউল হক ও লিপি বেগম দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সাজিদ ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি এবং আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পাস করে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হন। স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী সাজিদ লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করতেন।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সাজিদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল নিজের উপার্জনের টাকায় গ্রামের সব আত্মীয়স্বজনকে এক দিন দাওয়াত করে খাওয়ানো। এ জন্য তিনি বাবাকে আত্মীয়দের তালিকা তৈরির কথাও বলেছিলেন। তারিখও ঠিক হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সেই দাওয়াত আর দেয়া হয়নি। স্বজনরা একত্রিত হয়েছিলেন অন্য এক উপলক্ষে সাজিদকে শেষ বিদায় জানাতে।

ফারজান হক জানান, চব্বিশের ৪ আগস্ট সকালে অফিসে যাওয়ার আগে তিনি ঘুমন্ত ভাইকে দেখে মাকে বলেছিলেন, আজকে পরিস্থিতি খারাপ, ওকে একটু সাবধানে থাকতে বলো। তিনি বলেন, সাজিদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয় ছিল। প্রথম দিকে আমরা আটকানোর চেষ্টা করলেও পরে বুঝেছিলাম ও একটা ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের জন্য যাচ্ছে। তাই শুধু বলতাম সাবধানে থাকতে।

ফারজানা বলেন, সেদিন অফিস শেষে বিকেলে বাসায় ফেরার কিছুক্ষণ পর তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। ফোনে সাজিদের এক বন্ধু বলেন, আপু, সাজিদ একটু ব্যথা পাইছে, আপনারা তাড়াতাড়ি সিএমএইচে আসেন। কথাটা শুনেই আমার মনে হচ্ছিল বিষয়টা শুধু ব্যথা নয়, এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর কিছু হয়েছে। পরিবার দ্রুত ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পৌঁছে জানতে পারে, মিরপুর-১০ গোলচত্বরে আন্দোলনে অংশ নেয় সাজিদ।

প্রত্যক্ষদর্শী ভাষ্যমতে, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ওই কর্মসূচিতে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র স্নাইপার দিয়ে গুলিবর্ষণ করলে গুলিবিদ্ধ হন সাজিদ। মাথার পেছনে গুলি লেগে ডান চোখ দিয়ে বের হয়ে যায়। গুরুতর আহতাবস্থায় ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়ার পর ওই রাতেই তার অস্ত্রোপচার হয়। তারপর ১০ দিনেও আর জ্ঞান ফেরেনি।

ফারজান বলেন, ডাক্তার আমাদের শুরুতেই বলেছিলেন, অপারেশনটি মূলত রক্ত পরিষ্কার করার জন্য। খুব বেশি আশা না রাখতে। এরপর টানা ১০ দিন সাজিদ আইসিইউ ও ক্রিটিক্যাল কেয়ারে ছিল। একবারো জ্ঞান ফেরেনি। অবশেষে চব্বিশের ১৪ আগস্ট বেলা আড়াইটার দিকে শহীদ হয়।

শহীদ হওয়ার পর সিএমএইচ ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নামাজে জানাজা শেষে সাজিদের লাশ গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার বিল কুকড়ি গ্রামে নেয়া হয়। স্থানীয় বাঐজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তৃতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

ভাইয়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই পরিবারে নেমে আসে আরেকটি ট্র্যাজেডি। ফারজান বলেন, সাজিদের মৃত্যুর পর আব্বুর ক্যান্সার ধরা পড়ে। কয়েক মাস চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে গত বছরের ৩ আগস্ট সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। ১৩ আগস্ট অস্ত্রোপচার হয়। এরপর এইচডিইউতে ছিলেন। ওই বছরেই ২৪ আগস্ট সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে আব্বু সিএমএইচে মারা যান।

তিনি বলেন, আব্বু সবসময় বলতেন, সাজিদ আর কয়েক মাস পর লেখাপড়া শেষ করে সংসারের দায়িত্ব নেবে, তাকে আর চাকরি করতে দেবে না। কিন্তু সেই ছেলেকেই কবর দিতে হয়েছে। এরপর আব্বুও বেশিদিন বাঁচলেন না।

সাজিদের হত্যার ঘটনায় মামলা করলেও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেন ফারজান হক। তিনি বলেন, বিচারের তো কোনো অবস্থাই নেই। কোথাও কি বিচারের কোনো আভাস আছে? তার অভিযোগ, মামলার তদন্ত চলাকালে বারবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হওয়ায় পরিবারকে প্রতিবার থানায় গিয়ে নতুন করে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, দুই দিন পরপর আইও বদল হতো। প্রতি মাসে থানায় হাজিরা দিতে হতো। অসুস্থ শরীর নিয়েও আব্বু থানায় গেছেন। মামলা করে যেন আমরাই অপরাধী হয়ে গিয়েছিলাম।

ফারজান জানান, বাবা মামলার বাদি ছিলেন। তার মৃত্যুর পর মামলার কার্যক্রম কার্যত থেমে যায়। বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের মামলাটা আর এগোয়নি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, মামলার অধ্যায়টাই শেষ হয়ে গেছে। তিনি আরো জানান, মামলা করার পর বিভিন্ন নম্বর থেকে হুমকি ও ভয়ভীতির ফোন আসত। এমনকি গ্রামের বাড়িতেও লোকজন গিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিল। সব বিষয়ই তদন্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, বলেন তিনি।

ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিওর কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবার। ফরজানা বলেন, ভিডিও দেখে মনে হয়েছে যেন আকাশ থেকে গুলিটা এসে ওর গায়ে লাগল। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে আমার ভাইয়ের গায়েই গুলি লাগল। একজন বড় বোন হিসেবে এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারি? আমরা প্রতিশোধ চাই না, আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই। যারা সাজিদকে হত্যা করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।