জঙ্গল সলিমপুরে ভয়ঙ্কর ৬ সন্ত্রাসী

ভোল পাল্টে নৃশংসতায় মেতে ওঠে ভূমিদস্যু ইয়াসিন সিন্ডিকেট

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানও আশ্রয় নিয়েছিল সলিমপুরে
  • দেড় বছরে ৬ জন নিহত

ডাক নাম ইয়াসিন (৩৮)। এলাকার সবাই আদর করে ডাকেন জামাই ইয়াসিন নামে। সুন্দর এই নামের পেছনে আছে আরেক ভয়ঙ্কর খেতাব। সেই খেতাব অর্জন করেছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু হিসেবে। তিনি চট্টগ্রাম শহরের অদূরে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল আলী নগর এলাকার বাসিন্দা হলেও জঙ্গল সলিমপুরের জামাই হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও তিনি আরেকটি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। ভোল্ট পাল্টে ইয়াসিন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে সব ধরনের অপরাধীর আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতা হয়েছেন। ইয়াসিনের আরেক সহযোগী মো: ফারুকসহ ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ছয় সন্ত্রাসী। তাদের সবার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। বিশেষ করে মো: ফারুকের বিরুদ্ধেই রয়েছে ১১ মামলা। এ ছাড়াও জামাই ইয়াসিনের বিরুদ্ধে রয়েছে তিনটি মামলা। নুরুল হক ভাণ্ডারির নামে রয়েছে চারটি মামলা। মো: শাহীনের বিরুদ্ধে রয়েছে তিনটি মামলা, মো: মেজবাহ হোসেন বিপ্লবের বিরুদ্ধে রয়েছে একটি মামলা। সাহেদের বিরুদ্ধে রয়েছে পাঁচটি মামলা। গোয়েন্দাদের ভাষ্য অনেকে ইয়াসিন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মামলা করতে সাহস পায়নি।

স্থানীয়দের কাছে জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক ভয়ঙ্ককর জনপদ হিসেবে পরিচিত। পাহাড়বেষ্টিত দুর্গম এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের শক্ত ঘাঁটি। প্রশাসনের একের পর এক অভিযানে হামলা, সরকারি কর্মকর্তাদের গণপিটুনি, অস্ত্রধারীদের দৌরাত্ম্যর সবকিছুকে ছাপিয়ে এবার র‌্যাবের এক কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে সেখানকার সন্ত্রাসীরা। এই নৃশংস ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও ঘটনার মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, র‌্যাবের হাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানও জীবিত থাকাকালে এই জঙ্গল সলিমপুরে আত্মগোপনে ছিলেন। তার সাথে ঢাকার অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীও আশ্রয় নিয়েছেন। ২০১৭, ১৮ ও ২৩ সালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পাহাড় দখল, পাহাড়কাটা, ডাকাতি এবং জাহাজ থেকে তেল চুরির পর সেই তেল চোরাকারবারিদের কাছে বিক্রিসহ সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে দখলবাজি-চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছেন ইয়াসিন।

যেভাবে র‌্যাব সদস্যকে হত্যা : তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সোমবার র‌্যাবের কাছে তথ্য ছিল ওই এলাকায় একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান হবে। ইয়াসিন, মো: ফারুকসহ সেখানে অবস্থানরত শীর্ষ ছয় সন্ত্রাসী ওই অনুষ্ঠানস্থলে ও আশপাশে থাকার কথা। র‌্যাব জঙ্গল সলিমপুরে গিয়ে প্রথমেই ১১ মামলার আসামি মো: ফারুককে আটকের পর হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেয়। মাত্র ৭ সেকেন্ডের মধ্যেই নুরুল হক ভাণ্ডারি মাইকে র‌্যাব সদস্যদের ঘেরাওয়ের নির্দেশ দেন। এরপর চারদিক থেকে চার-পাঁচ শতাধিক লোক জড়ো করে র‌্যাব সদস্যদের ঘিরে ফেলে। কিছুক্ষণ পর তাদের বিবস্ত্র করে নির্মমভাবে পেটানো হয়। আড়াই মিনিট পরই দু’টি সিএনজি অটোরিকশায় করে র‌্যাবের তিন সদস্যকে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা সেখান বেধম নির্যাতন ও মারধর করা হয়। তাদের মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ততক্ষণে সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে চলে যায়। এরপর সিএনজি অটোরিকশায় তুলে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে আলীনগরে নিয়ে একটি ঘরে আটকে দফায় দফায় নির্যাতন চালানো হয়। এই নির্যাতনের শিকারদের মধ্যে ছিলেন র‌্যাব ৭-এর উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। পরে পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত অন্য তিনজনের মধ্যে একজন এখনও আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন।

রাজনৈতিক কার্যালয় নিয়ে বিতর্ক ও সন্ত্রাসীদের দখলদারি : স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনার পর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জঙ্গল সলিমপুরে তাদের কোনো কার্যালয় নেই। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা: কমল কদর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, গত দেড় বছরে আমরা সেখানে কোনো কর্মসূচি পালন করিনি। এই হত্যাকাণ্ডে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই।

তাছাড়া সীতাকুণ্ডের জঙ্গল এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে র‌্যাবের এক সদস্য নিহতের মর্মান্তিক ঘটনায় বিএনপির কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলে লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন দলের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির নাম জড়িয়ে যেসব সংবাদ ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন এবং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তবে স্থানীয়দের ভাষ্য ভিন্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, ভবনটি আগে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তখন সেটি নিয়ন্ত্রণ করত সন্ত্রাসী মশিউর ও গফুর মেম্বার। চব্বিশের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা পালিয়ে গেলে উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক রোকন উদ্দিন মেম্বার সেটি দখল করে বিএনপির সাইনবোর্ড ঝোলান। পরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু ইয়াসিন, মো: ফারুক ওই এলাকা দখলের চেষ্টা করলে রোকন ও ইয়াসিনের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়। এক সময় কার্যালয়টি ইয়াসিন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

রক্তাক্ত সলিমপুর, একের পর এক সংঘর্ষ ও প্রাণহানি : জঙ্গল ছলিমপুরে সহিংসতা নতুন নয়। গত দেড় বছরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারসহ চারজনকে আটক করে। এরপর ৪ অক্টোবর এক সংঘর্ষে দু’জন নিহত হন। স্থানীয় পুলিশের মতে, পাহাড়ি এলাকা দখল ও নিয়ন্ত্রণই এসব হত্যার মূল কারণ।

প্রশাসনের ওপর ধারাবাহিক হামলা : র‌্যাব সদস্য হত্যার আগেও একাধিকবার প্রশাসনের ওপর হামলা হয়েছে জঙ্গল ছলিমপুরে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে র‌্যাবের সাথে সন্ত্রাসীদের গুলিবিনিময় হয়। একই বছর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে জঙ্গল সলিমপুর কার্যত সন্ত্রাসীদের অঘোষিত দুর্গে পরিণত হয়েছে।

যেভাবে গড়ে উঠল সন্ত্রাসীদের আখড়া : প্রায় তিন হাজার একর সরকারি খাসজমি নিয়ে গড়ে ওঠা এই বিশাল পাহাড়ি জনপদে বর্তমানে বসবাস করে প্রায় এক লাখ মানুষ। নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি গড়ে তোলার মাধ্যমে সূচনা করেন। পরে তিনি র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে সহযোগীরা এলাকা ভাগ করে নেয়। রাজনৈতিক সমঝোতা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে একসময় মশিউর, গফুর ও ইয়াসিন নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এই এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।

রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও নাগরিক সমাজের উদ্বেগ : সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির বলেন, ভোটের রাজনীতি ও জনসংখ্যার কারণে এলাকাটিতে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। প্রকাশ্যে না হলেও সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়া পাচ্ছে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ না হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের দাবি : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ পাহাড় কাটা, দখল ও স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ এবং পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উচ্চ আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার দাবিতে তাগাদা নোটিশ দিয়েছে তিনটি পরিবেশবাদী সংগঠন। সংগঠনগুলো হলো, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাম এবং সৃষ্টি।

গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনার এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান বরাবর এ তাগাদা নোটিশ পাঠানো হয়।

যৌথ অভিযানের ঘোষণা : চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল জানান, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি ভাঙতে না পারলে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। এ কারণে র‌্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে বড় ধরনের যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

রথ্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমানও জানিয়েছেন, শিগগিরই সেনাবাহিনী, বিজিবি, এপিবিএন, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে নিয়ে সমন্বিত অভিযান শুরু হবে। লক্ষ্য অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, সরকারি জমি উদ্ধার এবং র‌্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব হত্যার বিচার নিশ্চিত করা।

উল্লেখ্য, জঙ্গল সলিমপুর এখন শুধু একটি এলাকা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জন্য এক ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ। র‌্যাব সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা প্রমাণ করেছে, সন্ত্রাসীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই অভয়ারণ্য ভাঙতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত যৌথ অভিযান কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সত্যিই পাহাড়ের আড়ালে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসের সাম্রাজ্যের অবসান ঘটাতে পারে।