ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই দিনে অনুষ্ঠিত সংবিধান সংস্কারবিষয়ক গণভোটের পর দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা এবং ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন। পদ্ধতি কী হবে- আসনভিত্তিক নাকি ভোটের আনুপাতিক- তা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। এই প্রেক্ষাপটে নেত্রকোনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য ও আইনজীবী নেতা ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সাথে কথা বলে জানা গেল তার দল ও ব্যক্তিগত অবস্থান, প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ব্যারিস্টার কামাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী ভবনে এই সাক্ষাৎকার দেন। এ সময় তিনি জোর দিয়ে বলেছেন- উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
প্রশ্ন : দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
কায়সার কামাল : আমি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদে কাজ করছি। কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নে পর্যালোচনা, ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দ্বিতীয় কক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই উচ্চকক্ষ গঠন সময়ের দাবি। এ নিয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই- এটি হবেই।
প্রশ্ন: এই প্রস্তাবের সূচনা কোথা থেকে?
কায়সার কামাল : দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের ধারণাটি মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকেই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফায় এটি স্পষ্টভাবে ছিল। পরবর্তীতে জুলাই সনদেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়- দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
প্রশ্ন : সমালোচকরা বলছেন, এটি কেবল রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার কৌশল। আপনি কী বলবেন?
কায়সার কামাল : আমি একমত নই। যদি কেবল সুবিধার কথা ভাবতাম, তাহলে এমন জটিল সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব দিতাম না। উচ্চকক্ষ মানে আরো স্বচ্ছতা, আরো বিতর্ক, আরো পর্যালোচনা। এটি সরকারকেও জবাবদিহিতার মধ্যে রাখবে। ফলে গণতন্ত্রই শক্তিশালী হবে।
প্রশ্ন : গণভোটের ফলাফল উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে কতটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে?
কায়সার কামাল : গণভোটই এই সংস্কারের বৈধতা দিয়েছে। বিপুল সংখ্যক ভোটার অংশ নিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। এর ফলে সংবিধান সংস্কারের আইনি ও নৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। জনগণের এই রায়কে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি।
প্রশ্ন : উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গাটা কোথায়?
কায়সার কামাল : মূল বিতর্ক দু’টি পদ্ধতি নিয়ে- একটি হচ্ছে জাতীয় সংসদে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব, অন্যটি হচ্ছে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হার অনুযায়ী প্রতিনিধিত্ব। আমাদের প্রস্তাব ছিল আসনভিত্তিক, কারণ সংসদীয় ব্যবস্থায় আসনই কার্যকর রাজনৈতিক শক্তির প্রতিফলন। তবে অন্য দলগুলো ভোটভিত্তিক পদ্ধতির কথা বলছে। এটাও গণতান্ত্রিক যুক্তি। তাই আলোচনা দরকার।
প্রশ্ন : দু’টি পদ্ধতির ফলাফলে কী ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে?
কায়সার কামাল : গাণিতিক পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। আসনভিত্তিক হলে আমাদের জোট বেশি প্রতিনিধিত্ব পাবে। ভোটভিত্তিক হলে কিছুটা কমে যাবে এবং অন্য জোটের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে। তবে আমি মনে করি, বিষয়টিকে কেবল সংখ্যার খেলায় না দেখে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত।
প্রশ্ন : প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেছেন- গণভোটে ‘ভোটের আনুপাতিক হার’ অনুমোদিত হয়েছে। এতে কি আপনার দলের অবস্থান বদলাবে?
কায়সার কামাল : গণভোটের সিদ্ধান্ত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্য জরুরি। আমরা আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি কাঠামো চাই, যাতে জনগণের রায় ও কার্যকর সংসদ- দুটোর সমন্বয় হয়।
প্রশ্ন : সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আপনার ভূমিকা কী হবে?
কায়সার কামাল : আমরা দ্বৈত দায়িত্ব পালন করব- এক দিকে সংসদ সদস্য, অন্য দিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। তাই সময় খুব সীমিত। উচ্চকক্ষের কাঠামো, ক্ষমতা, নির্বাচন পদ্ধতি- সব দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে।
প্রশ্ন : উচ্চকক্ষের কার্যকারিতা কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
কায়সার কামাল : আমার মতে- এটি হবে আইন পর্যালোচনার কক্ষ, সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকবে, অভিজ্ঞ ও নীতিনির্ধারক ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, দলীয় রাজনীতির বাইরে বিশেষজ্ঞদের সুযোগ থাকতে পারে। তাহলেই এটি সত্যিকার অর্থে ‘হাউজ অব রিভিউ’ হিসেবে কাজ করবে।
প্রশ্ন : সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
কায়সার কামাল : সময়ের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরি না হলে সংস্কার সফল হবে না। আমরা চাই এই প্রক্রিয়া যেন দলীয় নয়, জাতীয় উদ্যোগে পরিণত হয়।
প্রশ্ন : শেষ কথা?
কায়সার কামাল : উচ্চকক্ষ নিয়ে অযথা সংশয়ের কিছু নেই। জনগণের রায় আছে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার আছে, সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এখন দায়িত্বশীলভাবে কাজ করলেই আমরা একটি শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ ব্যবস্থা উপহার দিতে পারব।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়নে দেশব্যাপী গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার এই গণভোটে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৬২ শতাংশের বেশি ভোটার অর্থাৎ চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি পথ উন্মোচিত হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তারা জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সনদে বর্ণিত প্রস্তাবগুলো অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবেন।
এই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণভোটের ব্যালটে উচ্চকক্ষ গঠন সংক্রান্ত ‘খ’ প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট এবং দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে এই উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকবে। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি এককভাবে ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। জোটগতভাবে বিএনপি ৫১ শতাংশের বেশি এবং জামায়াত-এনসিপি জোট ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আসন সংখ্যার হিসেবে বিএনপি জোট জিতেছে ২১২টি এবং জামায়াত-এনসিপি জোট ৭৭টি আসন। যদি আসন সংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হয়, তবে বিএনপি জোট পাবে ৭০টি আসন এবং জামায়াত জোট পাবে ২৬টি।
অন্য দিকে, ভোটের আনুপাতিক হারে গঠন করা হলে বিএনপি জোটের আসন কমে দাঁড়াবে ৫২ থেকে ৫৩টিতে এবং জামায়াত জোটের আসন বেড়ে দাঁড়াবে ৩৮টিতে। এই গাণিতিক পার্থক্যের কারণেই পদ্ধতিগত বিতর্কটি জোরালো হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে, গণভোটের ব্যালটে সরাসরি ‘ভোটের আনুপাতিক হারে’ উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে, তাই কোনো দলের ব্যক্তিগত ইশতেহারের চেয়ে জনগণের সরাসরি দেয়া এই রায়ই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। আজ মঙ্গলবার সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে এই সংস্কারের তৃতীয় স্তর শুরু হবে, যেখানে তারা সাধারণ সদস্য হিসেবে একটি এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আরেকটি শপথ গ্রহণ করবেন। ১৮০ দিনের এই নির্দিষ্ট মেয়াদে উচ্চকক্ষের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণই হবে নতুন সংসদের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।



