বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, ততই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে- রাষ্ট্রকে সংস্কার করবে কে? সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের নানা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে; কিন্তু যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করবে, সেই দল যদি নিজেই দুর্বলভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত, ব্যক্তিনির্ভর, অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিহীন হয়, তাহলে রাষ্ট্র সংস্কার কতটা টেকসই হবে?
রাজনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তার Political Order in Changing Societies (১৯৬৮) (১৯৬৮) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিকায়নের সাথে সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়লেও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান- বিশেষ করে রাজনৈতিক দল যদি সেই বাড়তি অংশগ্রহণকে ধারণ করতে না পারে, তাহলে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ঘাটতি তৈরি হয় এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক ক্ষয় বা political decay দেখা দিতে পারে। অন্য দিকে ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার চিন্তায়ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও জবাবদিহির পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন প্রফেসর ড. শরিফুল আলম। তিনি বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের আমলাতন্ত্রের অভিজ্ঞতা, দেশি-বিদেশী উন্নয়ন সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপনা, জুলাই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে সংস্কার প্রত্যাশা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। লেখক-গবেষক ও একাধিক গ্রন্থের সম্পাদনায় অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তিনি। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিতভাবে নয়া দিগন্তের সাথে খোলামেলা ও তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম নয়া দিগন্তের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
নয়া দিগন্ত: বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে এখন ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনার মূল প্রশ্নটি কী বলে আপনি মনে করেন?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, ততই একটি মৌলিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর তা হলো—রাষ্ট্রকে সংস্কার করবে কে? সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, স্থানীয় সরকার কিংবা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের নানা প্রস্তাব আলোচনায় আছে। কিন্তু যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করবে, সেই দলটি নিজেই যদি দুর্বলভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত, ব্যক্তিনির্ভর, অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিহীন হয়, তাহলে রাষ্ট্র সংস্কার কতটা স্থায়ী হবে বা সংস্কার কতখানি আশা করা সম্ভব?
এই প্রশ্নকে আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য রাজনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক দু’জন প্রতিষ্ঠিত চিন্তাবিদ—স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন এবং ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। হান্টিংটন তার Political Order in Changing Societies গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়লেও যদি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে রাজনৈতিক দল, সেই অংশগ্রহণকে ধারণ করতে না পারে, তাহলে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অভাব দেখা দেয় এবং তা থেকে রাজনৈতিক ক্ষয় বা political decay ঘটে।
তিনি বলেন, শক্তিশালী দল ছাড়া কোনো আধুনিক রাষ্ট্র স্থায়ী রাজনৈতিক শৃঙ্খলা অর্জন করতে পারে না। দুর্বল দলভিত্তিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ‘প্রেটোরিয়ান’ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে সেনা, আমলা বা ব্যক্তিগত নেতৃত্বের খেলায় রাজনীতি পরিণত হয়। তাই দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, নিয়ম, নেতৃত্বের স্থানান্তর এবং সামাজিক শিকড়—রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।
ক্ষমতাসীন দল যদি ক্লায়েন্টেলিস্ট, ব্যক্তিগত ও গণতন্ত্রবিরোধী হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো—আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন—সহজেই দলীয়করণের শিকার হতে পারে। তাই দল সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যুক্তি এখান থেকেই আসে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তার Political Order and Political Decay গ্রন্থে হান্টিংটনের ধারণাকে আরও সম্প্রসারিত করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে উন্নত গণতন্ত্রেও প্রতিষ্ঠানের ক্ষয় হতে পারে। তার মতে, শক্তিশালী রাষ্ট্র, আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক সরকার—এই তিনটি উপাদানের ভারসাম্য ছাড়া টেকসই রাজনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। রাজনৈতিক দলের সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি দ্বন্দ্ব রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সংস্কার আগে হলে তা অনেক সময় ‘স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগ’-এর মতো ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়, যা বিরল। ইতিহাসে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাহ্যিক চাপ—আন্দোলন, সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ অথবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা—রাজনৈতিক দলকে সংস্কারে বাধ্য করে। হান্টিংটন নিজেই বলেছেন, সংস্কার সবচেয়ে সফল হয় যখন তা ধাপে ধাপে হয়, নাটকীয়ভাবে একসঙ্গে নয়।
হান্টিংটন ও ফুকুইয়ামার চিন্তাধারাকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। আর তা হলো—রাষ্ট্র সংস্কার এবং রাজনৈতিক সংস্কারকে আলাদা করে দেখলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
নয়া দিগন্ত: তাহলে রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: একটি রাজনৈতিক দল তখনই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী বলা যায়, যখন দলটি কেবল একজন নেতা বা কয়েকজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকে না। দলের নিজস্ব নিয়ম, নীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো, নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি থাকে।
একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও দলটি টিকে থাকে। কিন্তু দল যদি ব্যক্তি-নির্ভর হয়, তাহলে নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে দলের চরিত্রও বদলে যেতে পারে। তখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দলের স্থায়িত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
নয়া দিগন্ত: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে কি আপনি ব্যক্তি-নির্ভর বলবেন?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রবণতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে প্রত্যেক দলের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এক নয়। তাই সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
রাজনৈতিক দলকে শুধু নির্বাচনের সময় সক্রিয় একটি সংগঠন হিসেবে দেখলে হবে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।
নয়া দিগন্ত: হান্টিংটনের রাজনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ধারণা বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: হান্টিংটনের রাজনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক মূল যুক্তি অত্যন্ত সরল, কিন্তু গভীর। আধুনিকায়ন, শিক্ষা, নগরায়ণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। কিন্তু সেই বাড়তি অংশগ্রহণকে ধারণ করার মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান না থাকলে উন্নয়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
হান্টিংটনের ভাষায়, রাজনৈতিক উন্নয়নের মূল প্রশ্ন শুধু সরকার গণতান্ত্রিক কি না, তা নয়; বরং রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কতটা প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত।
তার মতে, একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী হতে হলে তার মধ্যে অভিযোজনক্ষমতা, জটিলতা, স্বায়ত্তশাসন এবং সংহতি থাকতে হয়। এই মানদণ্ড রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ একটি দল যদি একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার বা সীমিত ক্ষমতাকেন্দ্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়, নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া না থাকে, অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ অস্বচ্ছ হয় এবং দলীয় প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ইচ্ছার অধীন হয়ে পড়ে, তাহলে সেই দলকে প্রকৃত অর্থে প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত বলা কঠিন।
হান্টিংটনের রাজনৈতিক ক্ষয়ের তত্ত্ব এখানেই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিস্তার যদি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত হয়, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষয়, অস্থিরতা এবং প্রেটোরিয়ান ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
এখানে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দল হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী সেতু। এই সেতু দুর্বল হলে জনগণের দাবি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়। ফলে রাজনীতি নীতিনির্ভর প্রতিযোগিতার পরিবর্তে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে হান্টিংটনের শিক্ষা হলো—শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে হলে শক্তিশালী, নিয়মভিত্তিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল প্রয়োজন।
নয়া দিগন্ত: কিন্তু শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হলেই কি সেটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হবে?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: না। এখানেই হান্টিংটনের তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সব সময় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। একটি রাজনৈতিক দল অত্যন্ত সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং কার্যকর হতে পারে; কিন্তু একই সঙ্গে সেটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমিত করতে পারে, ভিন্নমতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে।
সুতরাং শুধু রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। মূল প্রশ্ন হলো—সেই সক্ষমতা কার নিয়ন্ত্রণে এবং কী ধরনের নিয়মের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে? এখানেই ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার রাজনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক ধারণা আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
নয়া দিগন্ত: ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার চিন্তা এ ক্ষেত্রে কী নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা রাজনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় তিনটি মৌলিক স্তম্ভকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এগুলো হলো—প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা; দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন; এবং তৃতীয়ত, জবাবদিহিমূলক সরকার।
এই তিনটির ভারসাম্য নষ্ট হলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকৃতি ঘটতে পারে। রাষ্ট্র অত্যন্ত শক্তিশালী কিন্তু আইনের শাসন দুর্বল হলে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে। আবার জবাবদিহি থাকলেও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা দুর্বল হলে সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না।
অর্থাৎ ফুকুইয়ামার দৃষ্টিতে একটি উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থা শুধু ‘শক্তিশালী সরকার’ নয়; বরং সক্ষম রাষ্ট্র, আইনের শাসন ও জবাবদিহি—এই তিনটির সমন্বয়।
ফুকুইয়ামা রাজনৈতিক ক্ষয়ের ধারণাটিকেও নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান একবার গড়ে উঠলেই তা চিরস্থায়ীভাবে কার্যকর থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। উন্নত গণতন্ত্রেও প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠী, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংগঠিত এলিটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। এই অবস্থাকে তিনি রাজনৈতিক ক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
নয়া দিগন্ত: রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় নির্বাচনব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর কারণ কী?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: কারণ নির্বাচন রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতা তৈরির প্রধান মাধ্যম। নির্বাচন যদি বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারও জনগণের আস্থা অর্জনে সমস্যায় পড়ে।
তবে শুধু ভোটের দিন নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই হবে না। নির্বাচনের আগে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, প্রার্থী মনোনয়ন, অর্থায়ন, প্রচারণা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন-পরবর্তী জবাবদিহি—সবকিছুকে বিবেচনায় নিতে হবে।
নয়া দিগন্ত: রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়ন পদ্ধতিতেও কি সংস্কার প্রয়োজন?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: অবশ্যই। প্রার্থী মনোনয়ন যদি সম্পূর্ণভাবে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে, তাহলে তৃণমূলের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ দুর্বল হয়ে যায়। এতে জনপ্রিয় বা যোগ্য প্রার্থীর বদলে ব্যক্তিগত আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই প্রার্থী মনোনয়নে স্বচ্ছতা, দলীয় সদস্যদের অংশগ্রহণ এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।
নয়া দিগন্ত: এখন বলুন, বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় হান্টিংটন ও ফুকুইয়ামাকে একসঙ্গে দেখার প্রয়োজন কেন?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: কারণ আমরা প্রায়ই মনে করি, নতুন আইন তৈরি করলেই প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে। কিন্তু আইন প্রণয়নের পর সেই আইন কে বাস্তবায়ন করবে? প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কে নিয়ন্ত্রণ করবে? নিয়োগ, পদোন্নতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর কার প্রভাব থাকবে?
যদি রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের আচরণ অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে নতুন প্রতিষ্ঠানও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধীনে চলে যেতে পারে। এটাই রাজনৈতিক সংস্কার ও রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্যকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
হান্টিংটন আমাদের সতর্ক করেন দুর্বল রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সম্পর্কে। আর ফুকুইয়ামা আমাদের সতর্ক করেন প্রতিষ্ঠানের দখল ও রাজনৈতিক ক্ষয় সম্পর্কে।
হান্টিংটনের প্রশ্ন হলো—রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কি যথেষ্ট শক্তিশালী?
ফুকুইয়ামার প্রশ্ন আরও এক ধাপ এগিয়ে—শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান কি আইনের শাসন ও জনজবাবদিহির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে?
এই দুই প্রশ্নকে একত্র করলে বাংলাদেশের জন্য একটি পঞ্চস্তম্ভবিশিষ্ট সংস্কার কাঠামো দাঁড়ায়।
প্রথমত, শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল।
দ্বিতীয়ত, সক্ষম ও পেশাদার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।
তৃতীয়ত, আইনের শাসন ও প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন।
চতুর্থত, কার্যকর জনজবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ।
এবং পঞ্চমত, রাজনৈতিক ইনটিগ্রিটি ও অর্থায়ন বা political integrity and financing।
শুধু প্রথমটি থাকলে সংগঠিত কিন্তু কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শুধু দ্বিতীয়টি থাকলে একটি শক্তিশালী কিন্তু জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি হতে পারে। শুধু জবাবদিহির দাবি থাকলেও যদি রাষ্ট্রের সক্ষমতা দুর্বল হয়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হবে না।
আর এসবের পূর্ণতাও পাবে না, যদি রাজনৈতিক ইনটিগ্রিটি ও অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না যায়। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে দলের এবং দলীয় ব্যক্তির দুর্নীতিমুক্ত থাকা অবশ্যকর্তব্য। তাই পাঁচটি উপাদানের সমন্বয়ই টেকসই রাজনৈতিক উন্নয়নের পথ।
নয়া দিগন্ত: রাজনৈতিক অর্থায়নকে আপনি সংস্কারের একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন কেন?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই উপেক্ষিত একটি বিষয় হলো রাজনৈতিক অর্থায়ন। রাজনৈতিক দল কোথা থেকে অর্থ পায়, বড় অনুদানের উৎস কী, দলীয় অর্থ কীভাবে ব্যয় হয় এবং সেই অর্থের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নীতি বা ব্যবসায়িক স্বার্থের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অংশ।
দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা দেখায় যে রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতাকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
বাংলাদেশেও রাজনৈতিক অর্থায়ন, দলীয় হিসাব, নেতাদের সম্পদ এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে আরও শক্তিশালী ও যাচাইযোগ্য স্বচ্ছতার কাঠামো প্রয়োজন। যাতে জনগণের কাছে সব রাজনৈতিক দল এবং দলীয় নেতাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকে।
এখানে লক্ষ্য কাউকে প্রমাণ ছাড়া দুর্নীতিগ্রস্ত বলা নয়। বরং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে তথ্য গোপন করার প্রয়োজন হবে না এবং জনগণ নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল এবং দলের নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করতে পারবে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ইনটিগ্রিটিও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নয়া দিগন্ত: ‘Integrity Before Power’—এই ধারণার মাধ্যমে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে, আর তা হলো—Integrity Before Power। অর্থাৎ ক্ষমতায় যাওয়ার আগে রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বকে ন্যূনতম কিছু মানদণ্ডে নিজেদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
যেমন—রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা; বড় অনুদানের উৎস প্রকাশ; রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘোষিত সম্পদ ও স্বার্থের সংঘাতের তথ্য; দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া; প্রার্থী মনোনয়নে নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি; এবং দলীয় অর্থ ও ব্যক্তিগত অর্থের সুস্পষ্ট বিভাজন।
এই ধারণাটি কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়। বরং ক্ষমতায় যাওয়ার আগে রাজনৈতিক সততার একটি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরীক্ষা।
এ ধারা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত, যেখানে নাগরিকরা শুধু ‘কে ক্ষমতায় যাবে?’ এই প্রশ্ন করবেন না; বরং প্রশ্ন করবেন—‘কে কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নৈতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য?’
নয়া দিগন্ত: আপনার প্রস্তাবিত সংস্কার সূত্রে রাষ্ট্র সংস্কার ও রাজনৈতিক সংস্কারের সম্পর্ক কী? এগুলো কি ধাপে ধাপে হবে, নাকি একসঙ্গে?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: হান্টিংটন ও ফুকুইয়ামার রাজনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যাখ্যার আলোকে বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সংস্কার সূত্র হতে পারে—রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Political Institutionalization), রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা (State Capacity), আইনের শাসন (Rule of Law), গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা (Democratic Accountability) এবং রাজনৈতিক ইনটিগ্রিটি ও অর্থায়ন (Political Integrity and Financing)।
তবে এটি কোনো সরল রৈখিক প্রক্রিয়া নয়। রাজনৈতিক দল শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক হবে; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সক্ষম হবে; আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে; ক্ষমতাসীন দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তি জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে থাকবে; এবং রাজনৈতিক ইনটিগ্রিটি ও অর্থায়নও স্বচ্ছ হতে হবে।
এই প্রক্রিয়া একই সঙ্গে চলতে হবে। ভিন্নভাবে চললে এর সুফল পাওয়া যাবে না।
কারণ হান্টিংটন ছাড়া আমরা বুঝতে পারব না কেন দুর্বল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে। আর ফুকুইয়ামা ছাড়া আমরা বুঝতে পারব না কেন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও জবাবদিহি ও আইনের শাসন ছাড়া রাজনৈতিক ক্ষয়ের শিকার হতে পারে।
নয়া দিগন্ত: রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: সংবিধান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন হয় না। সংবিধানের বিধান বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজের সক্ষমতা প্রয়োজন।
তাই সংবিধান সংস্কারের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি।
নয়া দিগন্ত: প্রশাসন সংস্কার নিয়ে আপনার প্রধান উদ্বেগ কী?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে যতটা সম্ভব মুক্ত রেখে পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়ন করা; কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষা করা নয়।
একই সঙ্গে আমলাতন্ত্রেরও জবাবদিহি প্রয়োজন। নিরপেক্ষতা মানে জবাবদিহিহীনতা নয়।
নয়া দিগন্ত: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: : বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্যের অন্যতম শর্ত। বিচার বিভাগ যদি নির্বাহী বা রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকে না।
তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
নয়া দিগন্ত: দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে কার্যকর করা যায়?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: প্রথমত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, তাদের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। চতুর্থত, তাদের কাজের ওপরও যথাযথ জবাবদিহি থাকতে হবে।
কোনো প্রতিষ্ঠানকে শুধু আইনি ক্ষমতা দিলেই শক্তিশালী হয় না; বাস্তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতাও থাকতে হয়।
নয়া দিগন্ত: তাহলে রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাধা কোথায়?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ; কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন।
যদি ক্ষমতাসীন দল মনে করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম, তাহলে প্রতিষ্ঠান যতই সংস্কার করা হোক, পুরোনো আচরণ ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে।
নয়া দিগন্ত: তাহলে মূল প্রশ্নে আসা যাক—রাষ্ট্র সংস্কার আগে, না ক্ষমতাসীন দলের সংস্কার আগে?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: তাত্ত্বিকভাবে বলা সহজ—ক্ষমতাসীন দলের সংস্কার আগে হওয়া উচিত। কারণ দলই সরকার গঠন করে, আইন প্রণয়ন করে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে।
কিন্তু বাস্তবতার আলোকে প্রশ্ন হলো—ক্ষমতাসীন দল কি স্বেচ্ছায় নিজের ক্ষমতা সীমিত করবে? দলের অর্থায়ন প্রকাশ করবে? অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করবে? নেতৃত্বের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করবে? প্রার্থী মনোনয়নে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে?
রাজনৈতিক বাস্তবতা বলে, সব ক্ষেত্রে স্বেচ্ছা-সংস্কারের ওপর নির্ভর করা যায় না। এ কারণেই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজন।
স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ পরিবর্তনে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কিন্তু অন্যদিকে, শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেই হবে না। রাজনৈতিক দল অপরিবর্তিত থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও দলীয় বা ব্যক্তিগত প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এই দ্বৈত বাস্তবতাও আমরা দেখেছি।
সুতরাং সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উত্তর হলো—রাষ্ট্র সংস্কার রাজনৈতিক সংস্কারের বিকল্প নয়; রাষ্ট্র সংস্কারকে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক চালিকাশক্তি হতে হবে।
নয়া দিগন্ত: সবশেষে, বাংলাদেশের জন্য আপনার সংস্কারের মূল বার্তা কী?
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্গঠনের প্রশ্ন।
আমাদের শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয়—‘কে ক্ষমতায় যাবে?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত—দলটি কি নিজের ভেতরে গণতান্ত্রিক? তার অর্থের উৎস কি স্বচ্ছ? তার নেতৃত্ব কি জবাবদিহির আওতায়? দলটি কি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ক্ষমতায় গিয়ে সে কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে, নাকি নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে আনবে?
বাংলাদেশের জন্য সংস্কারের প্রকৃত পথ সম্ভবত এমন—শুধু রাষ্ট্র সংস্কার নয়। শুধু দলীয় সংস্কারও নয়। বরং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলকে জবাবদিহির মধ্যে আনা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় দখল থেকে রক্ষা করা।
এটাই হতে পারে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের টেকসই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কারের নতুন দর্শন।
আর সেই দর্শনের মূলনীতি হওয়া উচিত—
ক্ষমতার আগে সততা, দলের আগে প্রতিষ্ঠান, আর রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সংস্কার।
নয়া দিগন্ত: আপনাকে ধন্যবাদ
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম: আপনাকে, নয়া দিগন্তকে এবং এর পাঠকেও ধন্যবাদ।



