বৈরী আবহাওয়ায় থমকে গেছে লবণ উৎপাদন

লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও হয়নি

এস এম রহমান, পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
Printed Edition

হঠাৎ বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে দেশের লবণ উৎপাদন কার্যক্রম থমকে গেছে। গত ৬ এপ্রিল থেকে মাঠে লবণ উৎপাদন কার্যত বন্ধ রয়েছে। এ দিকে মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও অর্জিত না হওয়ায় চাষি ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দেশে ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বৈরী আবহাওয়া শুরুর আগ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে একই সময়ে উৎপাদন ছিল ১৮ লাখ ৮ হাজার ৫৬২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এ বছর প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন কম হয়েছে।

বিসিক লবণ প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার আবু জাফর ভূঁইয়া বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে এলে দুই-এক দিনের মধ্যে আবার উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এ দিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাজারে লবণের দাম কম থাকায় চাষিরা দ্বিগুণ চাপে পড়েছেন। মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে লবণ উৎপাদনে প্রতিমণ খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ৩০০ টাকা। অথচ ধোলাই খরচসহ বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতিমণ লবণ মাত্র ২৫০ টাকায়। এতে ধোলাই খরচ বাদ দিয়ে চাষিরা পাচ্ছেন প্রায় ২০০ টাকার মতো। ফলে প্রতিমণেই প্রায় ১৫০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে লবণ চাষিদের। চাষিদের অভিযোগ, এক দিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অন্য দিকে বাজারে কম দামের কারণে তারা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় উৎপাদনও কমে যাচ্ছে।

জানা গেছে, দেশের শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত কস্টিক সোডা ও বিভিন্ন রাসায়নিক উৎপাদনে সোডিয়াম সালফেট ও উন্নতমানের সোডিয়াম ক্লোরাইড প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশে সোডিয়াম সালফেট উৎপাদিত হয় না এবং স্থানীয় লবণের (সোডিয়াম ক্লোরাইড) গুণগত মান অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত না হওয়ায় সরকার এসব উপকরণ আমদানির সুযোগ দিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিক সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইডের আড়ালে মিথ্যা ঘোষণা (মিস ডিক্লারেশন) দিয়ে অতিরিক্ত লবণ আমদানি করছেন। পরে এসব লবণ বাজারে সরবরাহ করায় দেশীয় লবণের দামে ধস নেমেছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, পূর্বে লবণ শিল্প রক্ষায় আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সোডিয়াম সালফেট তরল (লিকুইড) আকারে আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আমদানির নামে অতিরিক্ত লবণ দেশে প্রবেশ করছে।

এছাড়া ‘লবণ নীতিমালা-২০২২’ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া এবং মাঠ পর্যায়ের লবণের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ না করায় চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমদানির ওপর যথাযথ নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে, প্রতিবছর ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদন মৌসুম ধরা হয়। গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। দেশের অধিকাংশ লবণ উৎপাদন হয় চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়া ও কক্সবাজার জেলায়।

বিসিক সূত্রে জানা যায়, গত মৌসুমে ৬৩ হাজার ১৯৮ একর জমিতে ৪১ হাজার ৩৫৫ জন চাষি লবণ উৎপাদনে যুক্ত ছিলেন। তবে চলতি মৌসুমে কম দামের কারণে অনেক চাষি আগ্রহ হারিয়েছেন।

এ পরিস্থিতিতে লবণ চাষিরা দ্রুত উৎপাদিত লবণের পাইকারি মূল্য নির্ধারণ, আমদানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল তরল আকারে আমদানির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এসব দাবি বাস্তবায়ন না হলে দেশের লবণ শিল্প মারাত্মক সঙ্কটে পড়বে।