- ভোটের হিসাবে বিএনপি এগিয়ে, আসনের হিসাবে জামায়াত
- ৭১ শতাংশ মানুষ প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতায় এবং ৪৭ শতাংশ দলীয় বিবেচনায় ভোট দেবেন
- পুরুষ ভোটারে বিএনপি জোট, নারী ভোটারে জামায়াত জোট এগিয়ে
- শহরে বিএনপি, গ্রামে জামায়াতের সমর্থন বেশি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভোটের নতুন সমীকরণ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ভোটারদের মনোভাব কোন দিকে ঝুঁকছে- তা জানতে পরিচালিত এক প্রাক-নির্বাচনী জরিপে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে প্রকাশিত জরিপের ফলাফলে ভোটের হিসাবে বিএনপি সামান্য এগিয়ে থাকলেও তুলনামূলক বেশি আসনে জামায়াত এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস দিচ্ছে। এতে বলা হয়, ৪৪.১ শতাংশ ভোট বিএনপি পাচ্ছে, আর জামায়াতের ভোট ৪৩.৯ শতাংশ। জরিপ অনুযায়ী জামায়াত ১০৫টি আসনে জয় পেতে পারে, আর বিএনপি পেতে পারে ১০১টি আসন। অন্য দিকে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেতে পারেন ১৯টি আসনে। এ ছাড়া ৭৫টি আসনে বিএনপি ও জামায়াত দুই প্রধান জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পুরো নির্বাচনী মাঠে এক কঠিন ও হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে জরিপে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (আইআইএলডি) এবং জার্নাল অব ডেমোক্র্যাসির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই প্রাক-নির্বাচনী জনমত জরিপে জাতীয় নির্বাচনে এমন হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দেয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সামনে রেখে প্রাক নির্বাচনী জনমত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহীন আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপের এই ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি জানান, গত ২২ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৬ দিন সারা দেশে একযোগে ৩০০টি আসনে তাদের টিমের সদস্যরা এই জরিপ পরিচালনা করেন। এর আগে গত ১২ জানুয়ারি প্রথমবার নির্বাচনী জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
গতকাল প্রকাশিত জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট নিয়েও জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে সংস্থাটি। গণভোট নিয়ে প্রকাশিত জরিপে দেখা যায় জরিপে অংশ নেয়া ৭৪.৯ ভাগ মানুষ গণভোট সম্পর্কে অবহিত আছেন এবং ২৫.২ ভাগ মানুষ এখনো জানেন না। গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেয়ার কথা বলেছেন ৮৯.৬ ভাগ ভোটার এবং ‘না’ ভোটের কথা বলেছেন ৯.১ ভাগ।
জরিপের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি : সংশ্লিষ্টরা জানান, জরিপের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভোটারদের মনোভাবের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা। একই সাথে ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে এমন প্রধান ইস্যুগুলো চিহ্নিত করা এবং ভোটারদের ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সাথে রাজনৈতিক পছন্দের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা এই গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই জরিপে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিকে একটি করে ক্লাস্টার ইউনিট বা স্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তথ্য সংগ্রহ সম্পন্ন করা হয় দুই ধাপে। প্রথম ধাপে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা থেকে ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডগুলোকে প্রাইমারি স্যাম্পলিং ইউনিট হিসেবে দৈবচয়ন বা র্যান্ডম পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত এলাকা থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ জন ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এভাবে প্রতি নির্বাচনী এলাকায় মোট ১০০ থেকে ৩০০ জন উত্তরদাতার মতামত নেয়া হয়।
অংশগ্রহণকারীদের সামাজিক ও বয়সভিত্তিক চিত্র : জরিপে ৬৩ হাজার ৬১৫ জনের মতামত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৬৩৪ জন পুরুষ, যা মোট অংশগ্রহণকারীদের ৫৭.৫৯ শতাংশ। নারী অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৯৮১ জন, যা ৪২.৪১ শতাংশ। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ ভোটার ছিলেন ১৭ হাজার ৪৮১ জন, যা মোট অংশগ্রহণকারীদের ২৭.৪৮ শতাংশ। ৩০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ভোটার ছিলেন ২৬ হাজার ২৪৩ জন বা ৪১.২৫ শতাংশ। আর ৪৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী ছিলেন ১৫ হাজার ১১৭ জন, যা ২৩.৭৭ শতাংশ। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটার ছিলেন ৪ হাজার ৭৭৪ জন, যা মোটের ৭.৫০ শতাংশ।
ভোটদানে আগ্রহ ও প্রত্যাশা : জরিপে অংশ নেয়া মানুষের মধ্যে ভোটদানে আগ্রহের হার বেশি। ৯২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেবেন। ভোট দেবেন না বলেছেন ৪ শতাংশ এবং এখনো সিদ্ধান্ত নেননি এমন মানুষের হারও ৪ শতাংশ।
নির্বাচিত সরকারের কাছে ভোটারদের প্রত্যাশার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। ৬৭ ভাগ মানুষ এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি চান ৫৩ শতাংশ মানুষ, দুর্নীতি বন্ধ চান ৫২ শতাংশ, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি ৪৮ শতাংশ এবং চাঁদাবাজি থেকে মুক্তি চান ৩৭ শতাংশ উত্তরদাতা।
ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এ প্রশ্নে ৭১ শতাংশ মানুষ প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়ার কথা জানিয়েছেন। দলীয় আদর্শ বিবেচনায় ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন ৪৭ শতাংশ। পাশাপাশি দলীয় অভিজ্ঞতা (৩৬ শতাংশ), উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি (৩১ শতাংশ), ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি (২৫ শতাংশ) জুলাইয়ে ভূমিকা ২৩ শতাংশ এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান (১৮ শতাংশ) ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন উত্তরদাতারা।
জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ : জোটভিত্তিক সমর্থনে বিএনপি জোটকে ৪৪.১ শতাংশ এবং জামায়াত জোটকে ৪৩.৯ শতাংশ মানুষ সমর্থন জানিয়েছেন। জাতীয় পার্টির প্রতি সমর্থন মাত্র ১.৭ শতাংশ এবং সিদ্ধান্ত নেননি ৬.৫ শতাংশ ভোটার।
লিঙ্গ ও এলাকা অনুযায়ী ভোটের ধারা : লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষ ভোটারদের মধ্যে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে। ৪৭ শতাংশ পুরুষ বিএনপি জোটকে ভোটে সমর্থন জানিয়েছেন, যেখানে জামায়াত জোটকে ৪২ শতাংশ পুরুষ। অন্য দিকে নারী ভোটারদের মধ্যে চিত্রটি উল্টো। নারীদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ জামায়াত জোটকে এবং ৪২ শতাংশ বিএনপি জোটকে সমর্থন জানিয়েছেন।
এলাকাভিত্তিক হিসাবে শহরের ভোটারদের মধ্যে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে। শহরে ৪৬ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে এবং ৪২ শতাংশ জামায়াতকে সমর্থন করেছেন। অপর দিকে গ্রামাঞ্চলে জামায়াত এগিয়ে। ৪৫ শতাংশ গ্রামীণ ভোটার জামায়াতের পক্ষে, আর বিএনপির পক্ষে ৪৩ শতাংশ।
ধর্ম, বয়স ও শিক্ষায় বিভাজন : ধর্মভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলাম ধর্মের ভোটারদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ জামায়াতকে এবং ৪৩ শতাংশ বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছেন। খ্রিষ্টান ধর্মের ভোটারদের মধ্যেও জামায়াতের সমর্থন তুলনামূলক বেশি। বিপরীতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ বিএনপিকে এবং ২৮ শতাংশ জামায়াতকে সমর্থন করেছেন। বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ৩৪ শতাংশ এবং জামায়াত ১০ শতাংশ ভোট।
বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৮-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ জামায়াতকে এবং ৩৮ শতাংশ বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছেন। ৩০-৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ বিএনপি এবং ৪২ শতাংশ জামায়াতের পক্ষে। ৪৫-৫৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বিএনপি ৪৮ শতাংশ এবং জামায়াত ৪০ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়সীদের মধ্যে বিএনপি ৪৪ শতাংশ ও জামায়াত ৪২ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে।
শিক্ষিতদের মধ্যে এগিয়ে জামায়াত : শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন ভোটারদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ বিএনপি এবং ৩৯ শতাংশ জামায়াতকে সমর্থন করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষায়ও বিএনপি এগিয়ে। তবে উচ্চ মাধ্যমিক, গ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে জামায়াতের সমর্থন বেশি। মাধ্যমিকে ৪৮ শতাংশ এবং গ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শ্রেণীতে ৫১ শতাংশ ভোট জামায়াতের পক্ষে।
সমর্থনের পেছনের কারণ ও চূড়ান্ত চিত্র : বিএনপি জোটের প্রতি সমর্থনের প্রধান কারণ হিসেবে ৮৪ শতাংশ মানুষ দলটির দেশ পরিচালনার অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। অন্য দিকে জামায়াতের প্রতি সমর্থনের প্রধান কারণ হিসেবে ভোটাররা সততা ও দুর্নীতি করার মনোভাব কম বলে উল্লেখ করেছেন।
সবমিলিয়ে এই প্রাক-নির্বাচনী জরিপ বলছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ভোটের ব্যবধান অতি সামান্য, আসনের হিসাবেও কোনো দল নিশ্চিতভাবে এগিয়ে নেই। ফলে শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক কৌশল, জোট সমীকরণ ও মাঠের প্রচারণাই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাষ্ট্রক্ষমতা।
আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহীন বলেন, বিগত ৫টি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়ে তারা যে জরিপ করেছিলেন তার বেশির ভাগই প্রতিফলিত হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনের এই জরিপের যদিও ব্যাপকতা আরো বেশি, তবুও এখন পর্যন্ত মাঠের তথ্য এরকমই এসেছে।



