এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে পাহাড়তলী পর্যন্ত বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইন ব্রডগেজে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হচ্ছে আগামী নভেম্বরে। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির জন্য এডিবির সাথে ঋণচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে। ঠিকাদার নিয়োগের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শেষ করে নভেম্বরে প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আসাদুল হক।
তিনি জানান, বহুল প্রত্যাশিত এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ আরো দ্রুত, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন হবে। একই সাথে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে সক্ষমতা বাড়বে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে তিন হাজার ৭১১ কোটি টাকার বেশি। বাকি সাত হাজার ৮৬ কোটি টাকা এডিবির ঋণসহায়তা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।
প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে ষোলশহর এবং ষোলশহর থেকে চট্টগ্রাম স্টেশন হয়ে পাহাড়তলী পর্যন্ত বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করা হবে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ইতোমধ্যে ডুয়েলগেজে নির্মিত হওয়ায় চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশে ব্রডগেজ চালু হলে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ব্রডগেজ ট্রেন পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ-দুই ধরনের ট্রেন চলাচলের উপযোগী ব্যবস্থা থাকলেও চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশ মিটারগেজ হওয়ায় ব্রডগেজ ট্রেন চলাচল করতে পারে না। এ কারণে ঢাকা-কক্সবাজার রেল যোগাযোগের পূর্ণ সুফল পেতে চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশের উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়তলী থেকে ঝাউতলা পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন বাইপাস ট্র্যাক নির্মাণ করা হবে। চট্টগ্রামের ষোলশহর থেকে কালুরঘাট নতুন রেলসেতুর সংযোগস্থল পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল ট্র্যাক এবং গুমদণ্ডী থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া তিনটি রেলস্টেশন পুনর্নির্মাণ এবং ১৪টি স্টেশন সংস্কার করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় মোট ৬২ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার মিটারগেজ ট্র্যাককে ডুয়েলগেজে রূপান্তর ও নতুন ট্র্যাক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে গুমদণ্ডী-দোহাজারী মেইনলাইন ২৯ দশমিক ৩২ কিলোমিটার এবং পাহাড়তলী-ঝাউতলা বাইপাস, লুপ ও অন্যান্য লাইন ১০ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার। পাশাপাশি পাঁচটি স্টেশনে কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলকিং ও আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া প্রকল্পে ২০টি বড় ও ৬৮টি ছোট সেতু পুনর্নির্মাণ এবং তিনটি রেল ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক (ডিই) লোকোমোটিভও কেনা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের গতি বাড়ার পাশাপাশি রেলপথের সেকশনাল ক্যাপাসিটি দৈনিক ২৬ জোড়া ট্রেনে উন্নীত হবে। পাহাড়তলী-ঝাউতলা বাইপাস চালু হলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী ট্রেনকে চট্টগ্রাম স্টেশনে প্রবেশ করে আবার বের হতে হবে না। এতে প্রায় এক ঘণ্টা রানিং টাইম সাশ্রয় হতে পারে। একই সাথে চট্টগ্রাম-দোহাজারী হয়ে কক্সবাজারে উচ্চগতির ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেসসহ ঢাকা ও সিলেট থেকে সরাসরি ট্রেন পরিচালনার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ উন্নয়নের সাথে কালুরঘাটে নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতু নির্মাণকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। পুরনো কালুরঘাট সেতুর রেলপথের লোড সক্ষমতা বাড়িয়ে বর্তমানে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও নিরাপদ রেল যোগাযোগের জন্য নতুন সেতু নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।
অন্য দিকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের রেল যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বাড়বে। বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বড় মাদার ভেসেল ভেড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং আমদানি-রফতানি, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাড়বে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দোহাজারী-পাহাড়তলী রেলপথ ব্রডগেজে উন্নীত হলে এ অঞ্চলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।



