ঈদ মানেই সাধারণত পরিবারে ফেরা, শেকড়ে ফিরে যাওয়া। প্রিয়জনদের সাথে নামাজ, সেমাই, হাসি-আড্ডা সব মিলিয়ে ঈদ এক আবেগঘন উৎসব। তবে এই চেনা ছবির বাইরে রয়েছে আরেকটি বাস্তবতা। এবার সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত শতাধিক শিক্ষার্থী, যারা পরিবারের সান্নিধ্য থেকে দূরে থেকে ঈদ উদযাপন করেছেন ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলোতে।
ঈদকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে প্রতিবছরই বাড়ি ফেরার হিড়িক পড়ে। বাস, ট্রেন ও লঞ্চঘাটে উপচে পড়া ভিড়, টিকিটের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া ভাড়া, সব মিলিয়ে এক কঠিন যাত্রাপথ পাড়ি দিতে হয় ঘরমুখো মানুষকে। কিন্তু এই স্রোতে ভেসে যেতে পারেন না অনেক শিক্ষার্থী। দেশের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়ি ফেরা হয়ে ওঠে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ফলে ইচ্ছা থাকলেও তারা থেকে যেতে বাধ্য হন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেই।
ঈদের ছুটিতে আবাসিক হলগুলোর চিত্রও হয়ে ওঠে একেবারে ভিন্ন। সারা বছর যেখানে প্রাণের উচ্ছ্বাসে মুখর থাকে কক্ষ ও করিডোর, ছুটির সময় সেখানে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। পরিচিত কোলাহল হারিয়ে গিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক ধরনের শূন্যতা।
হলে থেকে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ঈদে বাড়ি ফেরা যেন বাড়তি চাপের কারণ। যাতায়াত খরচ, বাড়তি ভাড়া এবং ঈদের অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে তা অনেক সময় সাধ্যের বাইরে চলে যায়। তাই পরিবারের ওপর চাপ না বাড়িয়ে অনেকেই স্বেচ্ছায় থেকে যান হলে।
অন্য দিকে, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের প্রস্তুতিও বড় ভূমিকা রাখছে। বিসিএস, ব্যাংক চাকরি বা করপোরেট খাতের প্রস্তুতি, আসন্ন পরীক্ষা কিংবা গবেষণার কাজ- এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য দীর্ঘ ছুটি কাটানো সম্ভব হয় না। ঈদের ছুটিকেও তারা কাজে লাগাতে চান নিজেদের গড়ে তোলার লক্ষ্যে।
সূর্য সেন হলের এক শিক্ষার্থী সুমন বলেন, ‘এবার আর বাড়িতে যাওয়া হচ্ছে না। বাড়ি অনেক দূরে, যাতায়াতটা বেশ ঝামেলার। ঈদের সময় ভাড়া বেড়ে যায়, টিকিটও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে হলে বন্ধুদের সাথে ঈদ কাটানোর অভিজ্ঞতাটাও আলাদা। পরিবারের জন্য মন খারাপ হয়; কিন্তু এখানেও একটা অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হয়।’
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান রাফি বলেন, ‘মা মারা যাওয়ার পর থেকে ঈদের আনন্দ অনেকটাই বদলে গেছে। হলে এটা আমার পঞ্চম ঈদ। বাড়িতে গেলে মায়ের কথা বেশি মনে পড়ে, তাই হলে থাকাই স্বস্তি লাগে।
ঈদের দিনটিও তাদের জন্য ভিন্ন আবহে কাটে। সকালে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নামাজ আদায় করেন। এরপর হলেই ছোট পরিসরে আয়োজন- বন্ধুদের সাথে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা আর পরিবারের সাথে ফোনালাপেই সীমাবদ্ধ থাকে দিনের আনন্দ।
তবে এই নিঃসঙ্গতার মধ্যেও থেমে নেই স্বপ্ন। প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে একটাই লক্ষ্য- নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। আজকের এই ত্যাগকেই তারা ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা বলছেন এমন অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে আরো শক্ত করে তোলে।



