দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কট

বিপর্যস্ত জনজীবন ও শিক্ষা খাত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition

লোডশেডিংয়ে স্থবির শিল্প-ব্যবসা

দেশের বিভিন্ন জেলায় তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শিল্প-কারখানা, তাঁতশিল্প, কৃষি উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময় এ সঙ্কট চরম দুর্ভোগে ফেলেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

শফিউল আযম, বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, ঘন ঘন লোডশেডিং, ডিজেল সঙ্কট এবং তাঁত উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিতে পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প মারাত্মক সঙ্কটে পড়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রায় দেড় লাখ বিদ্যুৎ চালিত (পাওয়ার লুম) তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় পাঁচ লাখ ক্ষুদ্র তাঁতি, শ্রমিক ও জোগালী বেকার হয়ে পড়েছেন।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ একসময় দেশের অন্যতম তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা ছিল। ২০০৩ সালের জরিপে দুই জেলায় প্রায় তিন লাখ তাঁতের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে বিদ্যুৎ সঙ্কট ও ব্যয়বৃদ্ধির কারণে অধিকাংশ তাঁত কারখানা বন্ধের পথে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তাঁত পল্লীগুলোতে আগের মতো উৎপাদনের শব্দ নেই। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কাজ বন্ধ থাকছে, শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। ফলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেক মালিক লোকসান এড়াতে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন।

তাঁত মালিকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালাতে হয়, কিন্তু ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও সঙ্কটে তা সম্ভব হচ্ছে না। একটি জেনারেটর চালাতে কয়েক ঘণ্টায় ১০-১২ লিটার ডিজেল লাগে, এতে অতিরিক্ত ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সুতা, রংসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদিত কাপড়ের বাজারমূল্য কমে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শ্রমিকরা জানান, আগে দিনে তিন-চারটি শাড়ি তৈরি করা গেলেও এখন এক-দুইটিও করা কঠিন। আয় কমে যাওয়ায় পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকেই কাজের সন্ধানে ঢাকাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাড়ি জমিয়েছেন, কেউবা বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

মো: নূরুল ইসলাম, চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতাধীন চাটমোহর উপজেলায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। ভ্যাপসা গরমের সাথে লোডশেডিং ও মশার উপদ্রবে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দিনে ছয়-সাতবার এবং রাতে চার-পাঁচবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। গত কয়েক দিনে পৌর এলাকায়ও দিনে-রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং আরো বেশি। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে, পাশাপাশি ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও বিঘœ ঘটছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। থানা বাজার এলাকার গার্মেন্ট ব্যবসায়ী হুমায়ন আহম্মেদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে ক্রেতারা দোকানে আসে না। ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ বালুচর এলাকার মুদিখানা ব্যবসায়ী আবুল হোসেন জানান, ‘এই গরমে বিদ্যুৎ ছাড়া বসে থাকা যায় না, বেচাকেনাও কমে গেছে।’

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত লোডশেডিং কমিয়ে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক।

বকশীগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের বকশীগঞ্জে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চলমান এসএসসি পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ সঙ্কট আরো তীব্র হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘœ ঘটছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৭৪ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২২ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ মিলছে মাত্র ৭ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, আর গ্রামাঞ্চলে তা ১৭-১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করতে হচ্ছে। বগারচর ইউনিয়নের শিক্ষার্থী মাসুদা খাতুন বলেন, ‘পরীক্ষার মধ্যে এমন লোডশেডিংয়ে পড়াশোনা করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।’ চর আইরমারি এলাকার এসএসসি পরীক্ষার্থী খায়রুল ইসলাম জানায়, ‘সন্ধ্যা হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়, অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকে না।’

বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে বিদ্যুৎ সঙ্কটে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরাও বিপাকে পড়েছেন। সেচচালক রফিকুল বলেন, ‘মোটর চালু করলেও পানি মাঠে পৌঁছানোর আগেই বিদ্যুৎ চলে যায়।’ কৃষক কালু মিয়া জানান, ‘যেখানে এক ঘণ্টা সেচে কাজ হওয়ার কথা, সেখানে তিন ঘণ্টাতেও হচ্ছে না।’

মনিরুজ্জামান সুমন, দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, চলমান এসএসসি পরীক্ষার মধ্যেই চুয়াডাঙ্গার দর্শনা ও দামুড়হুদা উপজেলায় তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘বিদ্যুৎ যায় না, মাঝে মাঝে আসে’ এমন পরিস্থিতিতে লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। তীব্র তাপদাহের মধ্যে বিদ্যুতের এই অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থী, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

জেলায় টানা কয়েক দিন ধরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করছে। এর মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে পরীক্ষার্থীদের। অভিভাবক আয়শা হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মোমবাতি জ্বালিয়ে কি পড়াশোনা সম্ভব?’ শিক্ষার্থী সামিউল সোয়াদ জানায়, ‘রাতে বিদ্যুৎ থাকে না, আবার গভীর রাতে আসে, এভাবে পড়াশোনা করা কঠিন।’

কৃষি খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বোরো মৌসুমের শেষ সময়ে প্রয়োজনীয় সেচ দিতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। কেউ ডিজেল চালিত পাম্প ব্যবহার করলেও জ্বালানি সঙ্কট ও ব্যয় বৃদ্ধিতে তা চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। কৃষক মনিরুজ্জামান ধীরু বলেন, ‘এ সময়ে পানি না পেলে ফলন মারাত্মক কমে যাবে।’

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে অবস্থিত খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চার দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতার কারণে ২২ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। তবে ২৩ এপ্রিল ভর্তি কার্যক্রম চালু থাকবে। ২৬ এপ্রিল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মে পুনরায় শুরু হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় গ্রিড ও নিজস্ব পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বিশ্ববিদ্যালয়, খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, নার্সিং কলেজ এবং ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে হাসপাতালের কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ দিকে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁত শিল্পসমৃদ্ধ এ অঞ্চলে দীর্ঘসময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আবাসিক ছাত্র-ছাত্রীদের হলসহ ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সঙ্কট অব্যাহত থাকলে ছুটির মেয়াদ আরো বাড়তে পারে।

আতিকুর রহমান (ঝালকাঠি) সংবাদদাতা জানান, ঝালকাঠি জেলায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সদর, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলাজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, দিনে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০ মেগাওয়াট, যা সন্ধ্যার পর বেড়ে ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। তবে সরবরাহ কম থাকায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ৩৩ কেভি স্ক্যাডা সিস্টেমে লোড নিয়ন্ত্রণ হওয়ায় স্থানীয়ভাবে অনেক সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয় না।

ওজোপাডিকোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, কোনো ফিডারে ১০ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬ থেকে ৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি পূরণে রোটেশন ভিত্তিতে লোডশেডিং করা হচ্ছে। রাজাপুর উপজেলায় ১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র সাড়ে ৩ মেগাওয়াট।

ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এসএসসি পরীক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার জানায়, বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। একই অভিযোগ করেন আরেক পরীক্ষার্থী রাকিব হোসেনও।

ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চাপে। ঝালকাঠি শহরের ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে দোকান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে, ক্রেতাও কমে যাচ্ছে। অন্য দিকে ইজিবাইক চালকেরা ব্যাটারি চার্জ দিতে না পেরে আয় কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরিশাল অঞ্চলের গ্রিডে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও কম বরাদ্দের কারণে প্রতি দিন ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে এ সঙ্কট আরো ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।