আরটি
পারমাণবিক যুদ্ধের ভয় বিশ্ব ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে পারমাণবিক প্রতিরোধের যে মূল শক্তি, তা শিথিল হয়ে পড়ছে। এখন আর শুধু বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞের ঝুঁকি নয় বরং পারমাণবিক যুদ্ধের মতো ভয়াবহ ঘটনাও মানুষের কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে প্রধান পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক পারমাণবিক প্রতিরোধ বিশ্বকে এক ধরনের স্থায়িত্ব ও পূর্বাভাসের সুযোগ দিয়েছে। বিগত শতকের মধ্যভাগ থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই পারমাণবিক শক্তি। তৎকালীন প্রধান ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে মূলত নিজেদেরও সংযত রেখেছিল। তারা স্পষ্ট অনুধাবন করতে পেরেছিল, মাত্রাতিরিক্ত ভূরাজনৈতিক দুঃসাহস চরম ও অগ্রহণযোগ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাস্তবে যা ছিল একে অপরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়ার সক্ষমতা, তাকেই তারা কূটনীতির ভাষায় ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। এই শক্তির ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করেই সে সময় নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও চুক্তি গড়ে ওঠে। কিন্তু সমস্ত আলোচনা ও কূটনৈতিক ভাষার অন্তরালে মূল চালিকাশক্তি ছিল একটাই; পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার প্রত্যক্ষ সঙ্ঘাতের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কিত ভয়। দুঃখজনকভাবে, আজকের বিশ্বে সেই সুসংগঠিত ব্যবস্থাটি চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
অনেকের মতে, এই সঙ্কটের প্রধান কারণই হলো ভয়ের অন্তর্ধান। বর্তমান রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণী বা নীতিনির্ধারকরা আর মনেই করেন না যে বাস্তবে একটি পারমাণবিক যুদ্ধ সংঘটিত হতে পারে। আর এই ধারণার ফলেই ইউক্রেন সঙ্ঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা কিংবা সম্ভাব্য এশীয় সঙ্কটে এক ধরনের চরম দায়িত্বহীনতা দেখা যাচ্ছে। এর একটি স্বাভাবিক সমাধান হিসেবে মনে করা হতে পারে যে, পারমাণবিক যুদ্ধ কতখানি লোমহর্ষক হতে পারে তা বিশ্বকে আবারো স্মরণ করিয়ে দেয়া। ভয় পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হলে রাষ্ট্রগুলো হয়তো পুনরায় সংযত হবে এবং নতুন নিয়মকানুন তৈরিতে আলোচনার টেবিলে ফিরবে। বাহ্যিকভাবে এই যুক্তিটি যুক্তিযুক্ত মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক চরম বিপদ।
যদি সত্যি সত্যি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তবে কী ঘটবে? দু’টি পরিস্থিতির সূচনা হতে পারে। প্রথমত, মানবজাতি দীর্ঘ আট দশক ধরে যে সর্বাত্মক ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা করে আসছে, ঠিক তেমন এক অপূরণীয় ক্ষতি ও ধ্বংস নেমে আসবে। দ্বিতীয়ত, যা সম্পূর্ণ বিপরীত; ভয়াবহ ধ্বংসলীলা নিশ্চিতভাবেই ঘটবে, কিন্তু তাতে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে না এবং এই অস্ত্রের ব্যবহার যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়কেও গ্যারান্টি দেবে না। যদি দ্বিতীয় পরিস্থিতিটি ঘটে, তবে পারমাণবিক অস্ত্র তার রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধের রূপটি হারিয়ে ফেলবে। এটি তখন রাজনৈতিক বাধার বদলে কেবল যুদ্ধের সাধারণ অস্ত্রের মতো আরেকটি অত্যন্ত শক্তিশালী মারণাস্ত্রে পরিণত হবে। তখন প্রশ্ন ওঠে, এতে কি ভয় ফিরে আসবে? নাকি রাষ্ট্রগুলো রণক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য আরো কার্যকর ও উন্নত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠবে? আজকের চরম বেপরোয়া পরিবেশ বিবেচনা করলে এই দুই সম্ভাবনার যেকোনোটিই ঘটে যাওয়া সম্ভব।



