অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পুঁজিবাজারের পতন কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে সংশ্লিষ্টদের নেয়া একের পর এক উদ্যোগ কোনো ফল দিচ্ছে না। রোববার দেশের দুই পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ দরপতনের পর সোমবারও বড় পতনের মুখে ছিল দেশের দুই পুঁজিবাজার। কিন্তু ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে প্রধান সূচকটি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালে নামমাত্র উন্নতি ঘটে সূচকটির। কিন্তু একইদিন চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে সবক’টি সূচকেরই বড় ধরনের অবনতি ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার দিনের শুরুতে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটলেও টানা বিক্রয়চাপের মুখে পতন দিয়েই লেনদেন শেষ করে দুই পুঁজিবাজার।
এ দিকে বাজার পরিস্থিতি উত্তরণে ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) পক্ষ থেকে নেয়া উদ্যোগ আবারো ব্যর্থ হয়েছে। গতকাল সকাল ১১টা থেকে ডিবিএর পক্ষ থেকে ডিএসইর ব্রোকারদের সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করে করণীয় নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু তাদের এ উদ্যোগও বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারেনি। বৈঠকের খবরে দিনের শুরুতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটির ৬০ পয়েন্টের বেশি উন্নতি ঘটলেও বৈঠকে কোনো ইতিবাচক সমাধান না আসায় বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয়। এতে গতকাল দিনশেষে ডিএসইর সব সূচকের পতন ঘটে। এর আগে গত ৩১ আগষ্ট একইভাবে সব স্টেক হোল্ডারকে নিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের উপস্থিতিতে পুঁজিবাজারের সঙ্কট নিরসনে উন্মুক্ত আলোচনার উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীতে টানা তিন দিন দুই পুঁজিবাজার সূচকের কিছুটা উন্নতি ঘটলেও চলতি সপ্তাহের শুরুতে বড় ধরনের পতনের শিকার হয় দুই পুঁজিবাজার। সোমবারও লেনদেনের শুরু থেকে বিক্রয়চাপের অস্থির ছিল বাজারগুলো। একই ধারাবাহিকতায় গতকাল আবারো পতন ঘটে ডিএসই সূচকের।
বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুঁজিবাজারকে তার নিজস্ব গতিতেই চলতে দেয়া উচিত। বাজার পরিস্থিতি উন্নতিকল্পে নেয়া সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ সাময়িকভাবে বাজারকে ভালো দেখানো যায় কিন্তু তা টেকসই হতে পারে না। একমাত্র বিনিয়োগকারীদের সচেতনতাই বাজারের অস্বাভাবিক পতন থামাতে পারে। বিনিয়োগকারীদেরই বুঝতে হবে আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে বিক্রয়চাপ বাড়িয়ে দিলে লোকসান গুনতে হয় তাদেরই। এর দায় কেউই নেবে না। তাই নিজেদের পুঁজি রক্ষা করতে হলে আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করে দেয়া কোনো সমাধান নয়। বরং বাজার খারাপ থাকলে শেয়ার ধরে রেখে ভালো সময়ের অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি গতকাল ২৮ দশমিক ১০ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ৫৬৭ দশমিক ৪২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৫৩৯ দশমিক ৩২ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬৫ ও ৫ দশমিক ০১ পয়েন্ট। তবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সূচকগুলো এদিন নামমাত্র উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এখানে সিএসই সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৮ দশমিক ২১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩৫ ও দশমিক ১২ পয়েন্ট।
ডিএসইর লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিনের শুরুতে বাজারটির প্রধান সূচকটি পাঁচ হাজার ৫৬৭ দশমিক ৪২ পয়েন্ট থেকে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৬২৮ দশমিক ৬৩ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৬১ দশমিক ২১ পয়েন্ট। লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিও ফান্ডগুলোর হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া প্রায় সবক’টিরই এ সময় মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়। এর পরই বিক্রয়চাপের শুরু। বেলা ১২টার পর বিক্রয়চাপ আরো তীব্র আকার ধারণ করে। দিনের বাকি সময় আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাজারটি। এ সময় বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানি ও ফান্ডের প্রায় ৭২ শতাংশই দরপতনের শিকার হয়। লেনদেন হওয়া ৩৯৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৮৩টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২৫২টি। অপরিবর্তিত ছিল ৬১টির দর।
পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ বাজারের সঙ্কট নিরসনে বারবার ব্যর্থ হওয়ায় হতাশা ক্রমশ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের মাঝে। তারা মনে করেন, ডিবিএ ও ডিএসই কর্তৃপক্ষ এর আগেও বাজার পরিস্থিতির উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এগুলো কোনোটাই তেমন কাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনেনি। সাময়িকভাবে বাজার পরিস্থিতি উন্নত হলেও দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক পতন থামাতে তা ব্যর্থ হয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও দুই পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা। কারণ নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিনিয়োগকারীদের নানাভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বাজার যখন টানা পতনের শিকার হচ্ছিল তখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কারো কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। তারা মনে করেন, এভাবে আরো ক’দিন চললে বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে আবার মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি এনভয় টেক্সটাইলস। ২৭ কোটি ৬২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় এ দিন। ২৫ কোটি ৯ লাখ টাকায় ৫১ লাখ ৯৮ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে একই খাতের মালেক স্পিনিং উঠে আসে দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, আইপিডিসি, সায়হাম কটন মিলস, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, সায়হাম টেক্সটাইলস, ডেফডিল কম্পিউটার, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স ও বাংলাদেশ ন্যাশন্যাল ইন্স্যুরেন্স।



