কেন আমরা ভয় পেতে ভালোবাসি : সিনেমার মনস্তাত্ত্বিক রূপ

আমরা যখন পর্দার ভয়ঙ্কর সব দৃশ্য দেখি, আমাদের শরীর জৈবিকভাবে বিপদের প্রতিক্রিয়া দেখায় হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ হয়। কিন্তু অবচেতন মনে আমাদের যুক্তি বলে যে আমরা আসলে নিরাপদ। বিপদের এই চরম উত্তেজনা এবং বাস্তব নিরাপত্তার এই মিশেল আমাদের এক ধরনের রোমাঞ্চকর আনন্দ দেয়। এটি অনেকটা আগুনের শিখা নিয়ে খেলা করার মতো, যেখানে রোমাঞ্চ আছে কিন্তু পুড়ে যাওয়ার ভয় নেই।

সাকিবুল হাসান
Printed Edition

সিনেমা হলের অন্ধকারে বসে যখন আমরা আতঙ্কে কুঁকড়ে যাই বা ভয়ে চোখ ঢেকে ফেলি, তখন মনে এক অদ্ভুত দ্বিধা জাগে কেন আমরা নিজের ইচ্ছায় এমন অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা বেছে নিই? কেন মানুষ টাকা খরচ করে ভয় কিনতে চায়? মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে ‘প্রোটেক্টিভ ফ্রেম’ বা মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাকবচের মধ্যে। আমরা যখন পর্দার ভয়ঙ্কর সব দৃশ্য দেখি, আমাদের শরীর জৈবিকভাবে বিপদের প্রতিক্রিয়া দেখায় হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ হয়। কিন্তু অবচেতন মনে আমাদের যুক্তি বলে যে আমরা আসলে নিরাপদ। বিপদের এই চরম উত্তেজনা এবং বাস্তব নিরাপত্তার এই মিশেল আমাদের এক ধরনের রোমাঞ্চকর আনন্দ দেয়। এটি অনেকটা আগুনের শিখা নিয়ে খেলা করার মতো, যেখানে রোমাঞ্চ আছে কিন্তু পুড়ে যাওয়ার ভয় নেই। ভয়ের সিনেমার এই সফর শুরু হয়েছিল ১৯২২ সালের ‘নসফেরাডু’র মতো নির্বাক চলচ্চিত্রের হাত ধরে, যেখানে ভয়ের উৎস ছিল কেবল অদ্ভুত সব অবয়ব আর ছায়ার খেলা। এরপর ত্রিশের দশকে ইউনিভার্সাল স্টুডিওর দানবরা ‘ড্রাকুলা’ ও ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-পর্দায় রাজত্ব শুরু করে। এই দানবগুলো ছিল ট্র্যাজিক হিরোর মতো, যাদের প্রতি ভয়ের পাশাপাশি দর্শকদের মায়াও জাগত। ষাটের দশকে কিংবদন্তি পরিচালক অ্যালফ্রেড হিচকক ‘সাইকো’ (১৯৬০) সিনেমার মাধ্যমে ভয়ের সংজ্ঞাই পাল্টে দিলেন। তিনি দেখালেন, আসল আতঙ্ক কোনো অতিপ্রাকৃত রাক্ষস নয়; বরং আপনার পাশের বাড়ির কোনো সাধারণ চেহারার মানুষও হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তী সময়ে ‘মিডসোমার’ বা ‘গেট আউট’-এর মতো মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়।

ভয়কে যখন একদম মনের গহিনে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ আসে, তখন রমান পোলানস্কি বা স্ট্যানলি কুব্রিকের নাম চলে আসে অনিবার্যভাবে। পোলানস্কির ‘রোজমেরিস বেবি’ (১৯৬৮) কোনো ভূত বা শয়তান দেখানোর ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি গর্ভবতী একজন নারীর একাকিত্ব, নিরাপত্তাহীনতা এবং তার চারপাশের প্রিয়জনদের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলার এক নিদারুণ গল্প। অন্যদিকে, কুব্রিকের ‘দ্য শাইনিং’ (১৯৮০) দেখায় কীভাবে বিচ্ছিন্নতা একটি সুস্থ মানুষকে উন্মাদনার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এখানে ভয় কেবল অশরীরী আত্মায় নয়; বরং মানুষের নিজের মনের ভঙ্গুরতায়। সমসাময়িক সিনেমা যেমন ‘দ্য বাবডুক’ (২০১৪) বা ‘হেরিডিটারি’ (২০১৮)-তে এই ধারাটি আরো স্পষ্ট। এখানে দানবরা আসলে মানুষের দীর্ঘদিনের চেপে রাখা শোক, বিষণœতা বা বংশপরম্পরায় বয়ে চলা মানসিক ট্রমার রূপক।

আরব বিশ্বের সিনেমার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে ভয়ের বিবর্তন ছিল বেশ বিচিত্র। পঞ্চাশের দশকে ‘হারাম আলাইক’-এর মতো সিনেমায় কমেডিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হতো, কারণ সরাসরি ভয় দেখানোর মতো কারিগরি সক্ষমতা বা সাহসের তখন অভাব ছিল। আশির দশকে ‘আল-ইন্স ওয়াল জিন’-এর মতো সিনেমাগুলো মানুষের ধর্মীয় সংস্কার ও অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। বর্তমানে অবশ্য অনেক সিনেমা হলিউডের ‘জাম্প-স্কেয়ার’ ফর্মুলা নকল করে বৈশ্বিক রূপ পাওয়ার চেষ্টা করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব সংস্কৃতিকে ছাপিয়ে যায়। তবে তিউনিসীয় সিনেমা ‘দাশরা’ বাস্তব জীবনের রুক্ষতাকে ভয়ের অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে এক অনন্য ছাপ রেখেছে। ভয়ের এই বিবর্তন এখন এক নতুন দিগন্তের দিকে মোড় নিচ্ছে, যাকে বলা যায় ‘অ্যালগরিদমিক হরর’। প্রযুক্তি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (বিআর) এবং এআই আপনার হার্ট রেট বা চোখের মণির নড়াচড়া ট্র্যাক করবে। এর ফলে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত ভয়ের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে তাকে আলাদাভাবে আতঙ্কিত করার পরিবেশ তৈরি করা হবে। আমরা এখন আর স্রেফ দর্শক থাকব না, হয়ে উঠব এক ডিজিটাল ল্যাবরেটরির গিনিপিগ, যেখানে প্রতিটি আতঙ্ক হবে আমাদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা।