রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার মরণ ছোবলে তরুণ প্রজন্ম

ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতাকে পুঁজি করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক নীরব মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে। ‘রিয়েল মানি গেমস’, ‘স্কিল-বেসড ট্রেডিং’ কিংবা ‘ক্রিপ্টো মাইনিং’-এর ছদ্মবেশে ডার্ক ওয়েব এবং বিভিন্ন অবরুদ্ধ সাইট থেকে পরিচালিত হচ্ছে অবৈধ অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সি স্ক্যাম। রাতারাতি ধনী হওয়ার এই ডিজিটাল মোহে পড়ে প্রতিদিন সর্বস্বান্ত হচ্ছে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তরুণ। সম্প্রতি দেশের সাইবার বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে উঠে আসছে অপরাধের এই ভয়াবহ চিত্র।

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

  • ৫০ লাখের বেশি তরুন অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোতে আসক্ত
  • প্রতি মাসে বিদেশে পাচার হচ্ছে কোটি কোটি টাকা

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতাকে পুঁজি করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক নীরব মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে। ‘রিয়েল মানি গেমস’, ‘স্কিল-বেসড ট্রেডিং’ কিংবা ‘ক্রিপ্টো মাইনিং’-এর ছদ্মবেশে ডার্ক ওয়েব এবং বিভিন্ন অবরুদ্ধ সাইট থেকে পরিচালিত হচ্ছে অবৈধ অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সি স্ক্যাম। রাতারাতি ধনী হওয়ার এই ডিজিটাল মোহে পড়ে প্রতিদিন সর্বস্বান্ত হচ্ছে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তরুণ। সম্প্রতি দেশের সাইবার বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে উঠে আসছে অপরাধের এই ভয়াবহ চিত্র।

অপরাধীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডিপ-ফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে জনপ্রিয় দেশী-বিদেশী সেলিব্রিটি ও ক্রিকেটারদের ভুয়া ভিডিও তৈরি করে এই জুয়ার প্রচার চালিয়ে প্রথম দিকে সামান্য কিছু লাভ দিয়ে লোভের মুখে ফেলে। পরে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করলেই প্ল্যাটফর্মগুলো উইথড্রাল লক করে দেয় অথবা ক্রিপ্টো স্ক্যামের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অ্যাকাউন্ট শূন্য করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ডার্ক ওয়েব থেকে সংগৃহীত ম্যালওয়্যারযুক্ত এপিকে ফাইল ডাউনলোড করিয়ে তরুণদের ব্যক্তিগত ও ব্যাংকিং তথ্যও চুরি করা হচ্ছে।

ডার্ক ওয়েবের এই জুয়া বা স্ক্যাম অ্যাপগুলো মোবাইলে ইনস্টল করার সময় ব্যবহারকারীর অজান্তেই গ্যালারি, কন্টাক্ট লিস্ট এবং মেসেজের অ্যাক্সেস নিয়ে নেয়। পরে তরুণদের ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে বা পরিবারের কাছে ফাঁসের হুমকি দিয়ে নতুন করে বড় অঙ্কের টাকা দাবি বা ব্ল্যাকমেইল করা হয়। এই অ্যাপগুলোর মাধ্যমে ফোনে ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে ব্যবহারকারীর মোবাইল ব্যাংকিং পাসওয়ার্ড, ওটিপি এবং ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের তথ্য চুরি করে অ্যাকাউন্ট শূন্য করে দেয়া হয়।

এই বিষয়ে কথা হয় বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাব্বিরের সাথে। তিনি বলেন, অনলাইনে ঘরে বসে লাখ টাকা আয় করার একটি বিজ্ঞাপন দেখি। তাদের সাথে যোগাযোগ করলে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কথা বললেও পরে দেখি এগুলো জুয়ার সাইট। শুরুতে ৫০০ টাকা বিনিয়োগ করে কয়েক হাজার টাকা আয় করলেও পরে অনেক টাকা হারাতে হয়। পরিবার জানতো আমি ফ্রিল্যান্সিং করি।

বিভিন্ন কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টো স্ক্যামে বিপুল পরিমাণ টাকা হারিয়ে এবং ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে দেশের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এই জুয়া ও স্ক্যামের টাকা লেনদেন হয় ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে টাকা হারানোর পর তরুণরা তীব্র অপরাধবোধ, হতাশা ও মানসিক ট্রমার শিকার হয়। এই আসক্তির কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ ও ক্লাসে অনুপস্থিতি, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া এবং মাঝপথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন জুয়া বা এই ক্রিপ্টো ট্রেডিং কোনো ভাগ্যের খেলা নয়, এটি প্রযুক্তির আবরণে তৈরি নিখুঁত ফাঁদ। ডার্ক ওয়েবের আড়ালে থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সি স্ক্যামগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারী কখনোই শেষ পর্যন্ত জিততে না পারে। অভিভাবক পর্যায়ে সন্তানদের ইন্টারনেট এবং ফোনের অতিরিক্ত আসক্তি পর্যবেক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি। কেবল আইন প্রয়োগ করে বা ওয়েবসাইট ব্লক করে এই সমস্যার শতভাগ সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ডার্ক ওয়েব ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের কারণে অপরাধীরা বারবার তাদের আইপি ও ডোমেইন পরিবর্তন করে ফেলে। তরুণদের এই ধ্বংসাত্মক পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পরিবারের নজরদারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ অনলাইন জুয়া এবং অবৈধ ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মের ফাঁদে আটকে আছেন, যার বেশির ভাগেরই বয়স ১৬ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। পুলিশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দল (বিএফআইইউ) চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই জুয়া ও ক্রিপ্টো লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগে এক হাজার ১০০টিরও বেশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এজেন্ট অ্যাকাউন্ট এবং বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করেছে।

গত ১৪ মে রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকা থেকে ছয় জন চীনা নাগরিকসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তারা মূলত ডার্ক ওয়েবের এনক্রিপ্টেড নেটওয়ার্ক এবং ভিপিএন ব্যবহার করে বাংলাদেশে জুয়ার অ্যাপ পরিচালনা করছিল। একই মাসে সিআইডির অভিযানে আন্তর্জাতিক জুয়া চক্রের মূল হোতাসহ আটজনকে গ্রেফতার করা হয়। সিআইডির তদন্তে জানা যায়, এই চক্রটি শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেই প্রতিদিন এক কোটি ৮০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা অবৈধভাবে লেনদেন করছিল। ডার্ক ওয়েবের পিটুপি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা সমমূল্যের ইউএসডিটি, বিটকয়েন বা ট্রন বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে, বেশ কয়েকটি চক্র দেশের নামীদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিং ও অনলাইন ক্যাসিনোর অ্যাপ ছড়াচ্ছে। এমনকি এর পেছনে আন্তর্জাতিক ও বিদেশী চক্রের মদদ রয়েছে। তরুণ সমাজ এই মরণনেশায় জড়িয়ে পাড়ার মহল্লায় চুরির প্রবণতা ও পারিবারিক অশান্তি বাড়াচ্ছে। সাইবার স্পেসে বা অনলাইনে যেকোনো ধরনের জুয়া খেলা, পরিচালনা করা, অ্যাপ বা পোর্টাল তৈরি এবং এর বিজ্ঞাপন প্রচার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধীদের সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।

সিআইডির মিডিয়া বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানান, আমাদের সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট সার্বক্ষণিক সাইবার পেট্রোলিং চালাচ্ছে। মে এর প্রথম দুই সপ্তাহেই আমরা ১১৬টি অনলাইন জুয়া ও বেটিং ওয়েবসাইটের তালিকা তৈরি করে বিটিআরসিকে ব্লক করার জন্য পাঠিয়েছি। ডার্ক ওয়েব বা ভিপিএন ব্যবহার করে যারা ভাবছে পার পেয়ে যাবে, তাদের মনে রাখা উচিত আমাদের ট্র্যাকিং সক্ষমতা এখন আন্তর্জাতিক মানের। অবৈধ ডিজিটাল হুন্ডি এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের টাকা বাইরে পাচার করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এই বিষয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, বর্তমান প্রজন্ম অনলাইন গেমের প্রতি বেশি আসক্ত হওয়ার কারণ হচ্ছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা। অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি থাকে যে খেলোয়াড় মাঝে মধ্যে জেতে, ফলে সে মনে করে আবার খেললে আরো লাভ হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদের কারণে মানুষ বারবার টাকা বিনিয়োগ করে এবং শেষ পর্যন্ত বড় অঙ্কের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। দ্রুত ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষা, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক প্রভাব মানুষকে জুয়ার দিকে টানে। বিজ্ঞাপন ও সোস্যাল মিডিয়ার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে জুয়াকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়।

অনলাইন গেম ও জুয়া বন্ধের পদক্ষেপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অবৈধ অনলাইন জুয়া সাইটগুলো বন্ধ করা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ করা জরুরি। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে।