জুলাই খুনিদের পক্ষে সাফাইয়ে ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে ট্রাইব্যুনাল

জুলাই-আগস্ট গণহত্যার দুই বছর পার হতে না হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারাধীন অপরাধীদের পক্ষে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ‘সাফাই বয়ান’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে গণহত্যাকারীদের পক্ষে চালানো এই ধরনের প্রচার-প্রচারণা ও অনুষ্ঠানমালার ওপর কড়া নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্ত ও চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা করা হলে ট্রাইব্যুনাল আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছে।

আলমগীর কবির
Printed Edition
  • ইউটিউব-ফেসবুক পর্যবেক্ষণ চলছে
  • বিচারে প্রভাব ফেলছে সাফাই বয়ান

জুলাই-আগস্ট গণহত্যার দুই বছর পার হতে না হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারাধীন অপরাধীদের পক্ষে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ‘সাফাই বয়ান’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে গণহত্যাকারীদের পক্ষে চালানো এই ধরনের প্রচার-প্রচারণা ও অনুষ্ঠানমালার ওপর কড়া নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্ত ও চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা করা হলে ট্রাইব্যুনাল আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছে।

গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এসব কথা বলেন।

আলাপকালে ক্ষোভ প্রকাশ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের দুই বছর হতে না হতেই আমাদের এখন কিছু বুদ্ধিজীবী আর সাংবাদিক বন্ধু বের হয়েছেন। তারা বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জুলাই গণহত্যাকারীদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার অনুষ্ঠান করছেন। অথচ এতগুলো মানুষ যে শহীদ হলো, তা নিয়ে তাদের ইউটিউব চ্যানেলে কোনো নিন্দা বা কথা বলতে আমরা খুব একটা দেখি না।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো এ-জাতীয় ন্যারেটিভকে বিচার প্রক্রিয়ার জন্য হুমকিস্বরূপ উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘যারা গণহত্যাকারী, তাদের পক্ষে নানানভাবে ইনিয়ে-বিনিয়ে অনুষ্ঠান করে তারা ভিউ বাড়াচ্ছেন। তারা যখন এ-জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করে সাফাই গান, সেটি কিন্তু এক অর্থে আমাদের বিচার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে। কারণ নিরপেক্ষ তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে এ-জাতীয় ন্যারেটিভ তৈরি হলে মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যায়, যা চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।’

এটি বাকস্বাধীনতার ওপর কোনো হস্তক্ষেপ হবে কি না, এমন প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করে বলেন, ‘এখানে কোনো বাকস্বাধীনতা থামানোর প্রশ্নই আসে না। আমরা স্পষ্ট বলছি যে, জুলাইয়ের দুই বছর পার হতে না হতেই আপনারা যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার চলমান, তাদের পক্ষে বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে সাফাই গাইছেন। এটা আইনত ও নৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা আমাদের ভাবার বিষয়।’

এ দিকে জুলাই খুনিদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নিলে বাকস্বাধীনতা ক্ষুণœ হবে কি না এমন প্রশ্নে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আইন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, স্বাধীনতা মানেই স্বেচ্ছাচারিতা নয়; বরং আইনের মধ্যে থেকেই কথা বলতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সংবিধানে বলা হয়েছে ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে, অথবা আদালত-অবমাননা, মানহানি কিংবা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনার ক্ষেত্রে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার; এবং (খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলো।’

আইনবিদদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলেও তা কোনো পরম অধিকার নয়; বরং নিম্নলিখিত বিশেষ স্বার্থে আইন দ্বারা এর ওপর যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যেতে পারে : রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষা; আদালত অবমাননা ও মানহানি রোধ; শালীনতা বা নৈতিকতা বজায় রাখা; অপরাধে প্ররোচনা বন্ধ করা; বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা-সংক্রান্ত আইনি আলোচনায় এটি সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত সাংবিধানিক বিধান। ফলে চলমান কোনো গুরুতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা বা অপরাধীদের পক্ষে সাফাই গেয়ে জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার পরিপন্থী অবস্থান নেয়া বাকস্বাধীনতার আওতাভুক্ত হতে পারে না।

২১ তারিখে শাপলা চত্বরসহ একাধিক ঘটনার ফর্মাল চার্জ

আলাপচারিতার শেষপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের নতুন চার্জ গঠনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে একটি বড় অগ্রগতির খবর জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের নতুন ১১ থেকে ১২টি চার্জ নিয়ে কাজ চলছে। এর মধ্যে ঐতিহাসিক শাপলা চত্বরের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আমরা আগামী ২১ তারিখে এই সবগুলোর তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার আশা করছি। রিপোর্টগুলো ইতোমধ্যে আমাদের হাতে চলে এসেছে এবং অনেকগুলোর ফর্মাল চার্জও চূড়ান্তভাবে রেডি (প্রস্তুত) করা হয়েছে।’

তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমরা আশা করছি আগামী ২১ তারিখেই ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব ফর্মাল চার্জ দাখিল করতে পারব। ওই দিনই এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সাংবাদিকদের সামনে ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।’

শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যুবার্ষিকীতে ট্রাইব্যুনালের শ্রদ্ধা

আজ ১৬ জুলাই, ২০২৪ সালের এই দিনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে শহীদ হয়েছিলেন। তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম শহীদ আবু সাঈদকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে আত্মবিসর্জনের একটি মূর্ত প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করেন।

নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে তিনি শহীদ আবু সাঈদের হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচারের নেপথ্য কাহিনী তুলে ধরেন। আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শহীদ আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে যখন পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তার বিশ্বাস ছিল যে এভাবে থাকলে তাকে কেউ গুলি করবে না; কিন্তু সামনে যারা ছিল, তারা হায়েনার মতো তার ওপর গুলি বর্ষণ করে তার বুক ঝাঁঝরা করে দেয়।’

তৎকালীন সময়ে এই হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দেয়ার এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তাকে যখন হাসপাতালে নেয়া হলো, তখন তৎকালীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সুরতহাল ও পোস্টমর্টেমে একটি বিকৃত রিপোর্ট দিলো। সেখানে বলা হলো- ঘাড় বা মাথায় আঘাতজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে! গুলির বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে গোপন করা হয়েছিল। সে দিন এই মিথ্যা ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে আমাদের ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল স্যাটেলাইট টিভি এনটিভির একটি লাইভ ফুটেজ। আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে সে দিনকার সাহসী সাংবাদিক এ কে এম মাইনুল হকের অবদান স্মরণ করি।

তিনি আরো বলেন, ওই ফুটেজটি না থাকলে আজ শহীদ আবু সাঈদের বিচারটি আমরা সঠিকভাবে করতে পারতাম কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এই মামলার বিচারের ক্ষেত্রে প্রধান সহায়কের ভূমিকা পালন করেছে সেই ফুটেজ।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম মনে করেন, ওই ফুটেজটি কেবল বিচারেই সহায়তা করেনি; বরং আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এই ফুটেজ যখন ছড়িয়ে পড়ল, তখনই প্রথমবারের মতো সারা দেশের মানুষের মনে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলো, যা পরবর্তী সময়ে গণবিস্ফোরণে রূপ নেয় এবং সরকারের পতন ঘটায়। ওই ফুটেজটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ইতোমধ্যে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত হয়েছে।’

তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের ট্রাইব্যুনাল জাজমেন্টে (রায়ে) বিস্তারিতভাবে এই ফুটেজ নিয়ে আলোচনা করেছেন, সাংবাদিক মাইনুল হককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং আদালতে এই ফুটেজের সাক্ষ্যগত মূল্যকে গুরুত্বের সাথে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এটি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার একটি চিরন্তন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’