পাচারের অর্থ উদ্ধারে বিদেশী লিগ্যাল ফার্মে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশীয় তদন্ত কাঠামো, যৌথ টাস্কফোর্স ও আইনগত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এবার নতুন কৌশলে আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে নামছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রথমবারের মতো বিদেশী আন্তর্জাতিক লিগ্যাল ফার্ম নিয়োগের মাধ্যমে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে মামলা পরিচালনা করে সম্পদ জব্দ ও অর্থ উদ্ধার করা হবে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

হাসিনা পরিবার, এস আলম, বড় ব্যবসায়ী গ্রুপসহ ১১টির বিরুদ্ধে সম্পদ জব্দে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া

বিদেশে পাচার হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে ফেরাতে দীর্ঘদিন ধরে নানা উদ্যোগ নিয়েও কাক্সিক্ষত সাফল্য পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশীয় তদন্ত কাঠামো, যৌথ টাস্কফোর্স ও আইনগত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এবার নতুন কৌশলে আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে নামছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রথমবারের মতো বিদেশী আন্তর্জাতিক লিগ্যাল ফার্ম নিয়োগের মাধ্যমে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে মামলা পরিচালনা করে সম্পদ জব্দ ও অর্থ উদ্ধার করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ সংক্রান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এ উদ্যোগের আওতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও পরিবারের সদস্যরা, আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপসহ ১১টি প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।

নীরব কিন্তু গভীর জাতীয় সঙ্কট

অর্থপাচার বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক নীরব কিন্তু গভীর সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমিয়ে দেয় না- বরং ব্যাংকিং শৃঙ্খলা, আর্থিক সুশাসন, কর রাজস্ব এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এই অঙ্ক দেশের জিডিপির বড় একটি অংশের সমান। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী, বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এবং ক্ষমতাসংলগ্ন ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিদেশে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানেও একই চিত্র উঠে এসেছে।

বড় নাম, বড় অঙ্ক, বড় প্রভাব

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আলোচিত ‘ব্যাংক ডাকাত’ হিসেবে পরিচিত এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। পাশাপাশি শেখ পরিবার, শিকদার গ্রুপ, নজরুল ইসলাম মজুমদার, বেক্সিমকো গ্রুপ, সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদ, ওরিয়ন গ্রুপসহ মোট ১১টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম তদন্ত তালিকায় এসেছে।

তদন্তে যেসব পদ্ধতি চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- শেল কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর; ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং; ভুয়া আমদানি-রফতানি বিল; ঋণখেলাপির আড়ালে বিদেশে টাকা সরানো; ট্রেড বেসড মানি লন্ডারিং (টিবিএমএল) ও অফশোর ব্যাংকিং চ্যানেল।

এসব অর্থ সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ বা জমা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যৌথ তদন্ত টিম : কাঠামো ছিল, কার্যকারিতা ছিল না

পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক আগে একটি জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম (জেআইটি) গঠন করে। এতে যুক্ত ছিল- বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), সিআইডি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। এর উদ্দেশ্য ছিল সমন্বিত অনুসন্ধান, তথ্য বিনিময় ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু বাস্তবে এই টিম কাক্সিক্ষত ফল দিতে পারেনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত ও বাস্তব সমস্যা কাজ করেছে- প্রথমত, আন্তর্জাতিক আইনগত জটিলতা: এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক আদালত, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি (এমএলএটি) প্রয়োজন হয়। অনেক দেশের সাথে বাংলাদেশের কার্যকর চুক্তি নেই। দ্বিতীয়ত, প্রমাণ সংকট : শেল কোম্পানি ও বেনামি অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত মালিকানা প্রমাণ করা কঠিন। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাব : অভিযুক্তদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তদন্তে গতি আসেনি। চতুর্থত, কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতি : আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ফরেনসিক তদন্ত পরিচালনায় দেশীয় সংস্থাগুলোর দক্ষতা সীমিত।

এর ফলে জেআইটি কাগুজে কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

নতুন কৌশল : বিদেশী লিগ্যাল ফার্ম

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক এবার আন্তর্জাতিক লিগ্যাল ফার্মের দ্বারস্থ হচ্ছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়েছে, তাদেরকে বিদেশী আইন সংস্থার সাথে চুক্তি করতে বলা হবে। এসব লিগ্যাল ফার্ম সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে মামলা করে- সম্পদ শনাক্ত করবে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করবে, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করবে, করপোরেট কাঠামো ভেঙে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করবে এবং আদালতের মাধ্যমে অর্থ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ফেরত আনবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হবে ‘নো উইন, নো ফি’ মডেলে।

‘নো উইন, নো ফি’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই মডেলে আগাম কোনো আইনি খরচ দিতে হবে না। অর্থ উদ্ধার হলে তার একটি অংশ ফি হিসেবে পাবে লিগ্যাল ফার্ম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে- রাষ্ট্রের আর্থিক ঝুঁকি কমে, আন্তর্জাতিক মানের আইনজীবী ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ যুক্ত হয়, রাজনৈতিক চাপমুক্ত পেশাদার মামলা পরিচালনা সম্ভব হয় এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই টেকসই হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশীয় কাঠামো দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থপাচার মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব। বিদেশী লিগ্যাল ফার্ম ছাড়া এই অর্থ ফেরত আনা বাস্তবসম্মত নয়।’

ব্যাংকগুলোর দায় ও জবাবদিহি

এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাংকগুলোকেও দায়বদ্ধ করা। যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাচার হয়েছে, তাদেরকে লিগ্যাল ফার্ম নিয়োগে বাধ্য করা হবে। অর্থাৎ, দায় শুধু পাচারকারীর নয়, মধ্যস্থতাকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও।

বিশ্লেষকদের মতে, এতে ভবিষ্যতে- মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (এএমএল) ব্যবস্থা কঠোর হবে, কেওয়াইসি নীতিমালা শক্তিশালী হবে এবং ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নজরদারি বাড়বে।

সামনে দীর্ঘ আইনি লড়াই

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় নীতিগত মোড়। এটি কেবল অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নয়- রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি শক্ত বার্তা : অর্থপাচার আর সহ্য করা হবে না। তবে বাস্তবতা হলো, এই লড়াই দীর্ঘ, জটিল ও বহুমাত্রিক। আন্তর্জাতিক আদালত, বহুজাতিক আইনি কাঠামো ও প্রমাণ সংগ্রহ- সব মিলিয়ে এটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে নজির স্থাপন করতে পারে। অন্যথায়, এটি আরেকটি উচ্চাকাক্সক্ষী পরিকল্পনা হিসেবেই কাগজে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থেকে যাবে।

অর্থপাচার: নীরব অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ

অর্থপাচারের সামগ্রিক চিত্র সূচক - আনুমানিক পরিমাণ

গত ১৫ বছরে পাচার (সিপিডি অনুমান) - ২৮ লাখ কোটি টাকা

জিডিপির অনুপাতে - প্রায় ৬০-৭০% সমতুল্য

সন্দেহভাজন গ্রুপ/ব্যক্তি - ১১টি

সম্ভাব্য গন্তব্য দেশ - ৭+

প্রাথমিক টার্গেট - সম্পদ শনাক্ত, ফ্রিজ, জব্দ, ফেরত

বড় নাম, বড় অঙ্ক, বড় প্রভাব

সন্দেহভাজন প্রধান গোষ্ঠী (তদন্তসূত্রে)

ক্রম. ব্যক্তি/গ্রুপ - অভিযোগের ধরন - সম্ভাব্য পদ্ধতি

১ . শেখ পরিবার (হাসিনা-রেহানা সংশ্লিষ্ট)- প্রভাব খাটিয়ে অর্থ স্থানান্তর -অফশোর হোল্ডিং

২ . এস আলম গ্রুপ -ব্যাংক ঋণনির্ভর পাচার- লোন ডাইভার্সন

৩ . শিকদার গ্রুপ- ঋণ খেলাপি-বিদেশে বিনিয়োগ- শেল কোম্পানি

৪ . নজরুল ইসলাম মজুমদার সংশ্লিষ্ট - ব্যাংকিং লেনদেন- টিবিএমএল

৫ . বেক্সিমকো গ্রুপ- ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং- ওভার ইনভয়েস

৬ . ওরিয়ন গ্রুপ- প্রকল্প অর্থ স্থানান্তর -অফশোর ফান্ড

৭-১১. অন্যান্য - তদন্তাধীন- বহুমাত্রিক