আরফাত বিপ্লব, চট্টগ্রাম ব্যুরো
বাংলাদেশ পর্যটকের মৃত্যু কোনো নতুন ঘটনা নয়। দিন দিন এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও পার্বত্য চট্টগ্রামে লাশের মিছিল থামছেই না। গত এক দশকে এসব এলাকায় ঘুরতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক পর্যটক।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, উদ্ধারকর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে পর্যটকদের অসচেতনতা, নিষেধাজ্ঞা অমান্য, ঝুঁকি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব। গত এক দশকে শুধু কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতেই অন্তত ৬৪ থেকে ৬৮ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক পর্যটক পাহাড়ি ঝরনা, নদী, নৌকাভ্রমণ ও দুর্গম পর্যটন এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছেন জাওয়াদ-উল ইসলাম মাহিয়ানের (২৪)। বান্দরবানের থানচিতে সাঙ্গু নদীর উত্তাল স্রোতে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ পর্যটক মাহিয়ানের লাশ দুই দিন পর উদ্ধার হয়েছে। গতকাল সকালে তিন্দুমুখ ও রাজাপাথর এলাকার মাঝামাঝি স্থান থেকে তার লাশ উদ্ধার করে বিজিবি। তরুণ এই পর্যটকের মৃত্যু আবারো সামনে নিয়ে এসেছে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা; বাংলাদেশের পাহাড়, নদী, ঝরনা ও সমুদ্রকেন্দ্রিক পর্যটনে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
জানা গেছে, গত শুক্রবার ১৩ জন পর্যটকের একটি দল তিন্দু বাজার থেকে দু’টি নৌকায় করে রেমাক্রীর উদ্দেশে রওনা হন। রাজাপাথর এলাকায় পৌঁছার পর সাঙ্গু নদীর তীব্র স্রোতের মুখে একটি নৌকা ডুবে যায়। সাত আরোহীর মধ্যে ছয়জন তীরে উঠতে সক্ষম হলেও জাওয়াদ-উল ইসলাম মাহিয়ান নিখোঁজ হন। অবশেষে রোববার সকালে তার লাশ উদ্ধার হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে মৃত্যুর ঘটনাই সবচেয়ে বেশি। সি-সেইফ লাইফগার্ড প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে গত এক দশকে অন্তত ৬৪ থেকে ৬৮ জন পর্যটক সমুদ্রে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে ৭৯৫ থেকে ৮০৭ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। লাইফগার্ডদের মতে, বেশির ভাগ মৃত্যুর কারণ রিপ কারেন্ট বা সাগরের ভেতরের অদৃশ্য স্রোত। পর্যটকরা গভীরতা বুঝতে না পেরে কিংবা সতর্ক সঙ্কেত উপেক্ষা করে পানিতে নেমে পড়েন। অনেক সময় লাইফগার্ডবিহীন এলাকাতেও গোসল করেন। গত বছর ও চলতি বছরেও একাধিক পর্যটক সাগরে ডুবে মারা গেছেন। শুধু এক বছরেই সৈকতে গোসল করতে গিয়ে ১২ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টর।
এ ছাড়া উত্তর চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডের খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, কমলদহ, রূপসীসহ বিভিন্ন ঝরনা এখন দেশের জনপ্রিয় অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন গন্তব্য। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের পর থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ঝরনায় অন্তত ১২ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ডুবে মৃত্যু, পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়া এবং পাহাড়ি ঢলে ভেসে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিও ধারণের জন্য অনেক পর্যটক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে উঠে যান। কেউ কেউ বর্ষার সময় নিষিদ্ধ এলাকায়ও প্রবেশ করেন।
আবার রাঙ্গামাটির বিখ্যাত কাপ্তাই হ্রদে নৌভ্রমণের সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার না করা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, প্রতিকূল আবহাওয়ায় নৌকা চালানো এবং পাহাড়ি ঝরনায় নিরাপত্তা না মানার কারণে প্রায় প্রতি বছরই দুর্ঘটনা ঘটছে।
কেন বাড়ছে দুর্ঘটনা?
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ একসাথে কাজ করছে। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক পর্যটনের বিস্তার। অনেকেই নিরাপত্তার চেয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, বর্ষাকালে পাহাড়ি এলাকা ভ্রমণের ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। পাহাড়ি নদী বা ঝরনার আচরণ সমতলের নদীর মতো নয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে পানির উচ্চতা কয়েক ফুট বেড়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, অনেক পর্যটনকেন্দ্রে এখনো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত গাইডের অভাব রয়েছে। চতুর্থত, কিছু ট্যুর অপারেটর ও নৌযানচালক আর্থিক লাভের জন্য ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পর্যটকদের নিয়ে যান। উদ্ধারকর্মীদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা পর্যটকদের একাংশের মানসিকতা। সি-সেইফ প্রকল্পের কর্মীরা বলছেন, প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটককে সতর্ক করার পরও তারা বিপজ্জনক এলাকায় নেমে পড়েন। অনেকেই মনে করেন, তারা সাঁতার জানেন, তাই কোনো ঝুঁকি নেই। কিন্তু সাগরের রিপ কারেন্ট কিংবা পাহাড়ি নদীর স্রোত সাধারণ সাঁতারের দক্ষতাকে মুহূর্তেই অকার্যকর করে দিতে পারে।



