এক ছাতার নিচে আসছে শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • অগ্রাধিকার পাবে শিক্ষা সংস্কারের ১২ দফা বাস্তবায়ন

  • ৭২ ঘণ্টার বেশি আটকে থাকবে না কোনো ফাইল

দীর্ঘদিনের কাঠামোগত জটিলতা দূর করতে এক ছাতার নিচে আসছে শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে দায়িত্ব নেয়ার পর শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দু’জনকে দেয়ার পর যৌথভাবে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। একই সাথে শিক্ষা প্রসার ও শিক্ষা সেক্টরের অসাড়তা দূর করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১২ দফা পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তারা। সম্প্রতি যৌথ এক সংবাদ সম্মেলনে তারা দু’জনেই জানিয়েছেন শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত জটিলতা দূর করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একীভূত হয়ে কাজ করবে। বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ এক ছাতার নিচে কাজ করবে। দীর্ঘদিনের শিক্ষা অভিযোগ কাটিয়ে এখন থেকে শিক্ষা খাতকে শুধুমাত্র ‘খরচের খাত’ হিসাবে নয়, বরং মানবসম্পদের মূল কারখানা এবং জাতিগঠনের ‘প্রধান প্রকল্প’ হিসাবে দেখবে বলেও জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রী।

প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া ববি হাজ্জাজ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সরকারের শিক্ষা সেক্টরে অগ্রাধিকার দেয়া ১২ দফার এজেন্ডার মধ্যে রয়েছে-বাজেটের ‘এনভেলপ’ বৃদ্ধি, উন্নয়ন বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার : মিড-ডে মিল, আধুনিক ল্যাব এবং নারীশিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব : শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল পাঠ-পরিকল্পনা ও লার্নিং এভিডেন্স ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু। এ ছাড়া বহুভাষিক বাংলাদেশ : বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী তৃতীয় ভাষা (আরবি, চীনা, জাপানি বা ফরাসি) শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ইনোভেশন স্পেস : প্রতিটি উপজেলায় স্কুলে ‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার’ স্থাপন, খেলাধুলা বাধ্যতামূলক : মানসিক ও শারীরিক বিকাশে মাধ্যমিক স্তরের টাইমটেবিলে স্পোর্টস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত করা, পরীক্ষাপদ্ধতির সংস্কার : মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে আইটেম ব্যাংক ও লার্নিং ট্রাজেক্টরির মাধ্যমে দক্ষতা পরিমাপ, শিক্ষায় মানদণ্ড নির্ধারণ : সাধারণ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষার বৈচিত্র্য বজায় রেখে ‘ন্যূনতম শিখন মান’ এক করা, ব্রিজ কোর্স : এক শিক্ষা ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার পথ (স্কিল ক্রেডিট) সুগম করার কথাও বলা হয়েছে পরিকল্পনায়। একই সাথে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা : বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘জ্ঞান প্রতিষ্ঠানে’ রূপান্তরের লক্ষ্যে স্টুডেন্ট লোন ও ইনোভেশন গ্র্যান্ট প্রদান এবং পাবলিক ড্যাশবোর্ড : মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসিক ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি ও ক্লাসঘণ্টার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

এসব বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন মনে করেন শিক্ষা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হলেও অতীতে দুই মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে কাজ করায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। আমি নিজে প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে (২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত) প্রাইমারি শিক্ষাকে ক্লাস ওয়ান থেকে এইট পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং পরবর্তী স্তর পুনর্গঠনের চিন্তা থাকলেও দুই মন্ত্রণালয়ের বিভাজনের কারণে তা কার্যকর করা যায়নি। বর্তমানে দুই মন্ত্রণালয় একই ছাতার নিচে কাজ করবে জানিয়ে তিনি বলেন, একীভূত হয়ে কাজ করার ফলে ফাইল নিষ্পত্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়াও সহজ হবে। আমাদের দুই মন্ত্রণালয়ে কোনো ফাইল ৭২ ঘণ্টার বেশি আটকে থাকবে না। দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা এই নীতিতেই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি বলেন, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা যৌথভাবে তদারকি করায় শিক্ষা প্রশাসনে সমন্বয় বাড়বে।

বর্তমান সরকারের শিক্ষা সেক্টরের এমন সমন্বিত উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শিক্ষা সেক্টরের বিশিষ্টজনরা। তারা মনে করেন দেশের শিক্ষা খাত সংস্কারে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে শিক্ষার মানোন্নয়ন, বাজেট বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত সংস্কারে ১২ দফা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার ঘোষণাও দিয়েছেন দুই মন্ত্রী। তবে বিগত সরকারের আমলে শিক্ষায় অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা কারণে খাদের কিনারে রেখে যাওয়া এ খাতকে পুনরুদ্ধারে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, শিক্ষা খাতে উন্নয়নের জন্য শুধু কয়েকটি টার্গেট ঘোষণা করলেই হবে না। এতে স্থায়ী ও কার্যকর সামাজিক পরিবর্তন আনতে হবে। সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা করতে হবে।

শিক্ষাবিদগণ মনে করেন, একটি যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার জন্য পঞ্চবার্ষিক সামগ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার। এ ছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মধ্যে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ধারণ, কারিকুলাম নতুন করে লেখার পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়নের দিকে গুরুত্ব দেয়া, প্রতি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করাসহ স্কুল, উপজেলা, জেলা ও অধিদফতর পর্যায়ে এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকরব্যবস্থা নিতে হবে। এসব কাজ করতে হলে গতানুগতিক প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। কারণ, অতীতে বিদ্যমান কাঠামো দিয়ে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায়নি। একটি দক্ষ ও স্বাধীন টাস্কফোর্স জরুরি বিষয়গুলো চিহ্নিত করে সরকারের কাছে বাস্তবসম্মত সুপারিশ দিতে পারে।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম মনে করেন বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নেয়া হয়েছিল। সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহারের বিষয়গুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করা উচিত। এতে বাস্তবমুখী ও দীর্ঘস্থায়ী একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. এম জসিম উদ্দিন জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে ১২ দফা এজেন্ডা উপস্থাপন করেছে, আমি তাকে স্বাগত জানাই। এটি নিঃসন্দেহে শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতির জন্য একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার ওপর আরো বেশি জোর দেয়া অত্যন্ত জরুরি। সবার জন্য অনার্স, মাস্টার্স বা পিএইচডি বাধ্যতামূলক নয়। যারা উচ্চশিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহী এবং সত্যিকার অর্থে মেধা ও সক্ষমতা রাখে, তারাই উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অধিক কার্যকর হতে পারে। এই জায়গায় কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনিক্যাল ট্রেড ও আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ে আমরা ভোকেশনাল স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারি। এর মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে। এই মানবসম্পদ একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নে (ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও কাজ করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশেও আমরা যদি বৃহৎ পরিসরে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী প্রস্তুত করতে পারি, বিশেষ করে আইটি ও প্রযুক্তি খাত, তাহলে আমরা দক্ষ শ্রমশক্তি (স্কিলড লেবার) বিদেশে রফতানি করতে পারব। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে।