সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

জাতীয় নির্বাচনের আগে বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা খুন

Printed Edition

এস এম মিন্টু

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্র্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের দিন চাঞ্চল্যকর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে খুনিরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সারা দেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। গত সোমবার রাতে চট্টগ্রামে গুলি করে হত্যা করা হয় সম্প্রতি বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সমর্থক ও রাউজানের একটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জানে আলম সিকদারকে। গতকাল দুপুরে গাজীপুর মহানগর জোগিতলা এলাকায় পুরনো মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে এনসিপি কর্মী হাবিব চৌধুরীকে (২৫) লক্ষ্য করে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। অল্পের জন্য তিনি রা পেয়েছেন। গত বুধবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের কাজীপাড়া এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আজিজুর রহমান মুসাব্বির নামে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ (৪২) নামে আরো একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়াও গতকাল সকালে কুমিল্লায় সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিেেপ এক যাত্রী আহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে কুমিল্লার ময়নামতি রেলস্টেশনের আউটারে সকালে এ ঘটনা ঘটে।

সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের পরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, ওই যাত্রীকে তাৎণিক প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তবে তিনি শঙ্কামুক্ত।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সহিংসতা, বিভিন্ন ভবনে হামলাসহ বিভিন্ন সহিংসতা ও ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপশি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে (তফসিলের পর) নির্বাচনী সহিংসতার ৫৪টি ঘটনায় তিনজন নিহত এবং ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন।

২০২৫ সালে সারা দেশে ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছে। আর এতে আহত হয়েছে সাড়ে সাত হাজারেও বেশি মানুষ। এই সময়ে সহিংসতা, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে অন্তত ১৬৮ জন।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র মতে, গত বছর সারা দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ মাসে বিভিন্ন থানায় তিন হাজার ৫০৯টি হত্যা মামলা করা হয়। গত বছর দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচনের তফসিলের পর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দু’টি ঘটেছে। তিনি বলেন, গতকাল এনসিপি কর্মীকে গুলি ও গত পরশু তেজগাঁওয়ে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা খুন হয়েছেন এটা কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়। অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী সরকারের আমলে ১৫ বছরেও অপরাধ কমাতে পারেনি। প্রতিদিনই ছয় থেকে সাতটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। সহসাই অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। প্রতি বছরই বিভিন্ন কারণে চার হাজারের বেশি খুনের ঘটনা ঘটে। পুলিশ অনেককেই আইনের আওতায় এনেছে।

আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কোনো সহিংসতা বা খুনোখুনি হলে এটা রাজনৈতিক দলগুলোকেই সমাধান করতে হবে। কারণ আগামী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহিংসতা বা খুনোখুনি বাড়লে এর প্রভাব নির্বাচনে গিয়ে পড়বে। এখনই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এসব ঘটনা এড়াতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচন চ্যালেঞ্জিংয়ের মধ্যে পড়বে। তিনি আশাবাদী বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো কোনো সহিংসতা ছাড়াই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দেবে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ মাসে এসব অপরাধের ঘটনায় ৩৬ হাজার ৩১৫টি মামলা করা হয়। এতে একই সময়ের মধ্যে আগের বছরের তুলনায় তিন হাজার ২১টি মামলা বেশি হয়।

ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য মতে, গত বছরের প্রথম ১০ মাসের প্রতি মাসে প্রায় ২০টি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অনেক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। অন্য ঘটনাগুলোর বিষয়ে তদন্ত চলছে।

নির্বাচন বিশ্লেষক মুনির খান বলেন, তফসিল ঘোষণার পরই নির্বাচনের মাঠে বিভিন্ন ধরনের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করে। এই সময়ে তাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও সমঝোতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। এর পেছনে যে এক রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে অনেকসময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ব্যবহার করে থাকে, যা নির্বাচনের মাঠের পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যে ধরনের একটি নির্বাচন উপযোগী পরিবেশ এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশা করছি, সবাই যে পরিস্থিতি আশা করছে, তা তৈরি হচ্ছে না। কারণ এখানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর কারণেই সেই ইতিবাচক বা প্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না। সে েেত্র আসলে যে অভিযানগুলো পরিচালিত হচ্ছে, অনেক অপরাধী গ্রেফতার করা হচ্ছে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও যে অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে, যে ধরনের অপরাধের ভয়াবহতা বা গুরুতর অপরাধ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি, সেগুলো যারা সৃষ্টি করছে বা সংঘটিত করছে, তারা বাইরে থেকে যাচ্ছে কোন বিবেচনায়, সেই প্রশ্নটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের পর খুনিরা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে বলে যে কথা বলা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতে যেন কোনো অপরাধী অপরাধ করে পালিযে যেতে না পারে।