মিত্রদের ১৬ আসনের ৮টিতেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সাথে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাশা ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে মিত্রদের জন্য বিএনপি ছাড় দিয়েছে মাত্র ১৬টি আসন। এর মধ্যেও কয়েকটি আসনে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। মিত্রদের জন্য ছেড়ে দেয়া আটটি আসনে বিএনপির পদে থাকা নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যদিও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় বিএনপি তাদের বহিষ্কার করেছে। তবু বহিষ্কৃত এসব নেতার সক্রিয় উপস্থিতিতে ভোটের মাঠে অস্বস্তিতে পড়েছেন মিত্র দলের প্রার্থীরা। ফলে আসন সমঝোতার এই বাস্তবতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

বিএনপির সাথে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর অভিযোগ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এসেও জোটসঙ্গীদের বিষয়টি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে সমাধান করতে পারেনি বিএনপি। গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, “নির্বাচন সামনে এলে নির্বাচনকেন্দ্রিক জোট গড়ে ওঠে, একটি মেরুকরণ তৈরি হয়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিএনপির সাথে জোটসঙ্গীদের আসন সমঝোতা খুব ভালো হয়নি। এতে অনেক অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়েছে এবং একটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বও নিশ্চয়ই রয়েছে। খুব অল্প সংখ্যক আসনেই সমঝোতা হয়েছে। অসন্তুষ্টি থাকলেও সেটি নিয়েই আমরা নির্বাচনে আছি।”

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের প্রার্থী জোনায়েদ সাকি বলেন, “আমরা দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে যুগপৎ ধারায় কাজ করছি। সেই প্রক্রিয়ায় বিভিন্নভাবে সমঝোতা হয়েছে। তবে যেসব আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে, সেখানে এখনো কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। আশা করি বিএনপি দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করবে। মোটাদাগে আমরা এখনো একটি ইতিবাচক অবস্থানে আছি।”

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর নয়া দিগন্তকে বলেন, “আমরা দু-একটি আসনের জন্য রাজনীতি করিনি কিংবা এমপি হওয়ার জন্য আন্দোলন করিনি। তবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে, দলটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গেলে একটি জাতীয় সরকার গঠন করবে। ফলে যেসব রাজনৈতিক দল আসন সমঝোতায় বঞ্চিত হয়েছে কিংবা প্রত্যাশামতো আসন পায়নি, তারা জোট সরকার গঠনের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ পাবে। সম্ভবত এ কারণেই আসন সমঝোতা নিয়ে ক্ষোভ খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না। তারপরও আমাদের জন্য কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতি এখনো রয়েছে।”

ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সাথে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা অন্তত ১১টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আসন সমঝোতায় কার্যত কেউই প্রত্যাশিত ছাড় পাননি। অভিন্ন সুরে তারা বলেন, যুগপৎ আন্দোলনে প্রত্যেক দল ও নেতা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। মিত্র দল ও নেতার সংখ্যা অনেক, অথচ আসনের সংখ্যা সীমিত। সে বিবেচনায় বিএনপি এবার বিভিন্ন উপায়ে ১৬টি আসন ছাড় দিয়েছে। কিন্তু বঞ্চিত তালিকায় থাকা অনেক নেতারই নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনে জয়লাভের সক্ষমতা রয়েছে।

তবে আসন সমঝোতা নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা তাদের আশ্বস্ত করেছেন, দলটি ক্ষমতায় গেলে জাতীয় সরকার গঠনসহ বিভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে মিত্রদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। এই আশ্বাসের কারণেই অনেক মিত্র দল ও নেতা বিএনপি এবং দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছেন। তারা আশা করছেন, জাতীয় সরকার কিংবা সংসদের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে তাদের অংশগ্রহণ ও মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, “আমরা শুরু থেকেই জাতীয় সরকারের কথা বলে আসছি। যাদের সাথে আমাদের রাজনৈতিক ঐকমত্য রয়েছে, তাদের নিয়েই সরকার গঠন করব। মিত্রদের সেখানে কিভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে।”

তিনি আরো বলেন, “আমরা মিত্রদের যথাযথ মূল্যায়নের চেষ্টা করেছি। আরো অনেক আসন ছাড় দেয়া যেত। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের আরপিও অনুযায়ী মিত্রদের নিজ নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হচ্ছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। এই কারণে কেউ কেউ আমাদের দলে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন, আবার কেউ কেউ নিজ দলের প্রতীকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এসব বিষয় নিয়ে নির্বাচন শেষে মিত্রদের সাথে আরো আলোচনা হবে।”

উল্লেখ্য, ২০২৩ সাল থেকেই বিএনপি ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে ফ্যাসিস্টবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠন করবে। রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের রূপরেখাতেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফায় বলা হয়েছে, বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ‘উচ্চকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা’ গঠন করা হবে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সরকারের এই ধারণার কথা তুলে ধরেছেন। সেখানে কারা এবং কোন ভিত্তিতে স্থান পাবেন, সে বিষয়টিও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের সাথে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বৈঠক ও আসন সমঝোতা আলোচনায় মনোনয়নবঞ্চিত মিত্র নেতাদের জাতীয় সরকার ও উচ্চকক্ষে অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি। সম্প্রতি গুলশানে বিএনপির কার্যালয়ে মনোনয়নবঞ্চিত মিত্র নেতাদের সাথে দলটির হাইকমান্ডের ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।